“বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ভোগ করছে ভারত, আমেরিকাও”-এই শীরোনামে ভারতের প্রভাবশালী বাংলা দৈনিক আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বাংলাদেশের মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
শুক্রবার (৬ মে ২০১৬) আনন্দবাজার পত্রিকায় এই প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। শীরোনাম দেখে এই খবরটিকেএকটি অনুসন্ধানী প্রতিবদেন হিসেবে গ্রহণ করে আনন্দবাজারের বরাত দিয়ে বাংলাদেশের অনেক গণমাধ্যমেও তাস্থান পেয়েছে।
প্রতিবেদনের ভাষা ও উপস্থাপনার ঢংয়ের মধ্যে রয়েছে বেশ নাটকীয়তা। শুরু থেকে এরখানিকা পড়লেই তা বোঝা যায়।
প্রতিবেদনের শুরু থেকে খানিকটা এরকম: “দরজা জানালা খোলা রেখে এসি চালালে কী লাভ। ঘর ঠান্ডা তো হবেই না। মাঝখান থেকে হু হু করে কারেন্ট পুড়বে। গরম থেকে রেহাই দূর অস্ত্। এমন খামখেয়ালি কাজ মানা যায় না। বাংলাদেশের বাণিজ্যে এমনটাই হচ্ছে। রফতানিতে যত আয় তার চেয়ে ব্যয় বেশি। আয়ের ৮০ শতাংশ ছিদ্রপথে বিদেশে চলে যাচ্ছে।
ঠেকাবে কে! সর্ষের মধ্যেই যে ভূত! অভিযোগের আঙুল কাস্টমস আর ব্যাঙ্ক কর্তাদের দিকে। রফতানি সংস্থার মালিকদের সঙ্গে যোগসাজসে তাঁরা অর্থ নির্গমনের পথ চওড়া করছেন। টাকার বৈভবে আহ্লাদে আটখানা। প্রাপ্য রসদ থেকে বঞ্চিত হয়ে শীর্ণ হচ্ছে দেশের অর্থনীতি।
দোষটা শুধু বাংলাদেশের নয়, যারা নিচ্ছে তাদেরও। কৃষ্ণবর্ণ অর্থের অনুপ্রবেশ বন্ধের দায়িত্ব তারা এড়ায় কী করে। অপরাধ ভারতেরও। সেখানেও চার ফেলে পাচার হওয়া টাকা ঘরে তোলার লোকের অভাব নেই। সরকারি স্তরে কড়া ব্যবস্থা নিয়ে ঠেকানো যাচ্ছে না কেন! ইচ্ছে থাকলেই উপায় হয়। আসলে অর্থস্রাবী আগ্নেয়গিরির লাভা স্রোতের লোভ থেকে উত্তীর্ণ হওয়াটা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এভাবে পাওয়া টাকাটা খারাপ টাকা। খারাপ টাকা ভাল কাজে নয়, খারাপ কাজেই লাগে। সন্ত্রাসীরাও এই টাকার প্রতীক্ষায় থাকে। যে দেশেই তারা থাকুক, তাদের প্রথম লক্ষ্য সে দেশের অর্থনীতির ভিত ভেঙে চুরমার করে নিজেদের ঐশ্বর্য বৃদ্ধি। নাশকতায় সক্রিয় হওয়ার সহজ রাস্তা সেটাই।”
প্রতিবেদনটিকে সবার কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করার জন্য বাংলাদেশের আত্মসাতের টাকা আরও যেসব দেশে পাচার হয় তারওশর্ট লিস্ট বা ক্ষুদেতালিকাওতুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়:
“ভারত ছাড়াও আরও ৩৬টি দেশ বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ভোগ করছে। তার মধ্যে আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, বেলজিয়াম, পোলান্ড, ব্রিটেন, জার্মানি, সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, জাপানও আছে। সুযোগ বুঝে, কালো টাকা আত্মসাতের খেলায় নেমেছে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তাইল্যান্ড, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, রোমানিয়া, তুরস্ক, বেলারুশ, মরিশাস।
বোঝাই যাচ্ছে, টাকা পাচারের র্যাকেট নেহাৎ ছোট নয়। এত বড় চক্র এক দিনে গজায়নি। ধীরে ধীরে ডানা ছড়িয়েছে। এইসব দেশকে সাবধান করার দায়িত্ব বাংলাদেশের। অর্থনৈতিক ক্ষতিটা তাদেরই বইতে হচ্ছে।”
প্রতিবেদনের এই পর্যায়ে এসেই আনন্দবাজার পত্রিকা তার আসল চালটি চেলেছে। বাংলাদেশের সহজ-সরল ও উদাসীন জনগোষ্ঠীর খুব সামান্য সংখ্যকই হয়তো এই কুটচালের বিষয়টি খেয়াল করে থাকবেন বলে আমার ধারণা। প্রতিবেদনের এই পর্যায়ে বলা হয়েছে:
“রফতানি বাণিজ্যে বাংলাদেশের সব থেকে বেশি আয় পোশাক শিল্পে। রফতানির ৮২ শতাংশ তারাই করে। পাচার চক্রে তারাই যুক্ত। পোশাক শিল্পে যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য শুল্ক নেওয়া হয় না। সেখানেও গোলমাল। কম দামে মাল কিনে বেশি দাম দেখানো হয়। অতিরিক্ত টাকাটা ফাঁক গলে চলে যায় বিদেশে।”
এখানে এসেই আসল জায়গায় আঘাত করলো ভারতীয় পত্রিকাটি। কোন ধরনের তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই ও বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের বরাত না দিয়েই সোজাসাপ্টা বলে দিল টাকা পাচার চক্রে শুধু পোশাক শিল্প মালিকরাই জড়িত। বাক্যটির দিকে খেয়াল করুন। বলা হলো: “পাচার চক্রে তারাই যুক্ত”।
দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের এই শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য শুল্ক নেয়া হয় না তাও যেন সহ্য হচ্ছে না আনন্দবাজারের। অর্থাৎ বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের উত্থানের মূল শক্তি অর্থাৎ কম খরচ (সস্তা শ্রমসহ) যাতে বাধা পায় তার সুন্দর ফর্মূলা ঠিক করে দেয়া হলো।
এরপরই আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে বিগত ১০ বছরের পাচারের একটি খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে: “দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৪৯ হাজার ১৩ কোটি ডলার। পরিমাণটা কী ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার মতো? টাকাটা কোথায় কীভাবে খরচ হল সেটাও তো দেখা দরকার। সব রফতানিকারক সংস্থাই যে এ কাজ করছে এমন তো নয়।
অপরাধীদের জেরা করলেই জানা যাবে কোন দেশে কত টাকা যাচ্ছে। কী কাজে লাগছে। বাংলাদেশের ঊর্ধ্বমুখী অর্থনীতিকে টান মেরে নীচে নামানোর চেয়ে জঘন্য কাজ আর কী হতে পারে। যাদের জেলখানার ভেতরে থাকার কথা, তারা বাইরে ঘুরে বেড়ায় কী করে!”
এই প্রতিবেদনের সরল অর্থ দাঁড়ালা-এখন বাংলাদেশ সরকারের উচিত দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের ধরে ধরে আটক করা ও ডিটেনশানে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা। আর এই সুযোগে দেশের তৈরি পোশাক খাত গোল্লায় যাক এবং শূন্যস্থান পূরণে এগিয়ে আসুক আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু দেশের উদ্যোক্তারা।
বিষয়টি বোধগম্য করার জন্য বিগত ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে আমেরিকার কমার্স ডিপার্টমেন্টের (US commerce department) এর অধীন পোশাক খাতে নিয়োজিত টেক্সটাইল এন্ড অ্যাপারেলস (Office of Textiles and Apparels) অফিস থেকে প্রকাশিত জরিপের খানিকটা তুলে ধরতে চাই।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে ১১.৪০ শতাংশ । বিগত ২০১৪ সালের প্রথম ১০ মাসে এই আয় যেখানে ছিল ৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৪,৭২০ কোটি টাকা, সেখানে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে এই আয়ের পরিমান দাঁড়ায় ৪.৮৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৮,৭২০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ বিগত এক বছরে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার। প্রতি ডলারের বিপরীতে ৮০ টাকা করে হিসাব করে এই তথ্য বের করা হয়েছে।আর এই রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই এসেছেপোশাক খাত থেকে।
আমেরিকার ওই জরিপে আরও বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমান বেড়েছে ১১.১৪ শতাংশ।
এই সময়ে বাংলাদেশ আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে আয় করেছে ৪.৬৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৭,২৮০ কোটি টাকা। বিগত ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই আয় ছিল ৪.১৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৩,৫২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিগত ১ বছরে আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত থেকে বাংলাদেশের আয় বেড়েছে প্রায় ৩,৭৬০ কোটি টাকার।
এদিকে, আমেরিকার বাজারে পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের পোশাক রপ্তানির বিষয়ে মার্কিন কমার্স ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে এই রপ্তানি বেড়েছে ৭.৫২ শতাংশ। এই সময়ে ভারত আমেরিকায় ৩.১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৫,২৮০ কোটি টাকার তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে।
বিগত ২০১৪ সালে এর পরিমান ছিল ২.৯৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৩,৫২০ কোটি টাকা।অর্থাৎ আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক খাত থেকে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের আয় প্রায় ১৩,৭৬০ কোটি টাকা বেশি ছিল।
নিশ্চয়ই এটা এখন দিবালোকের মতো বোধগম্য যে ভারত যেকোন মূল্যে এই খাতে বাংলাদেশকে টপকে উপরে উঠতে চায়। তাই এ বিষয়ে সতর্কতার সাথে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
প্রতিযোগিতার এই বিশ্বায়নের যুগে ভারত তার পোশাক খাতকে শক্তিশালী করার জন্য সম্ভাব্য সব উপায় অবলম্বন করবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বাংলাদেশ এইব্যাপারে কতটা সচেতন সেটাই এখন দেখার বিষয়।
কেবি





