কথাটি বলেছিলেন এসপি বাবুল আক্তার। ২০০৫ সালে পুলিশে যোগদানের পর ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত মোট ১১ বছরের চাকুরি জীবনের সিংহভাগই তিনি পার করেছেন চট্টগ্রামে। এখানেই তিনি কাটিয়েছেন চাকরি জীবনের আটটি বছর। এরই মধ্যে বিয়ে করেছেন, দুই সন্তানেরও বাবা হয়েছেন। চাকুরিতে পদোন্নতিসহ বাবুল আক্তারের অসংখ্য মধুর স্মৃতি রয়েছে চট্টগ্রামকে ঘিরে। আর সে কারণেই তিনি পদোন্নতি পেয়ে ঢাকায় বদলি হওয়ার খবরে আবেগমিশ্রিত ভাষায় চট্টগ্রামের প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা জানিয়েছিলেন।
মাত্র এক সপ্তাহ আগে গত ৩০শে মে রাত ১১টা ৯ মিনিটে বাবুল আক্তার তার ফেসবুকে দেয়া স্ট্যাটাসে আরও অনেক কথাই বলেছিলেন। সৎ, নির্ভীক ও কাজ পাগল এই পুলিশ কর্মকর্তা পরবর্তী জীবনে চট্টগ্রামকে কতটা মিস করতেন তা নিয়ে সংশয় থাকলেও এখন যে তিনি সত্যিই চট্টগ্রামকে মিস করবেন তাতে কোন সন্দেহ নেই। প্রিয়তমা স্ত্রীর নির্মম হত্যাকাণ্ড কি ভুলতে পারবেন তিনি? চট্টগ্রামকে যেভাবে স্মৃতির পাতায় মধুময় করে রাখতে চেয়েছিলেন তা কি আর সম্ভব হবে? নিজের প্রিয় দুই সন্তানের জন্মস্থানেই যে নিজের স্ত্রীকে চির বিদায় জানাতে হবে-এটা কি জানতেন বাবুল আক্তার?
টাইমনিউজবিডির পাঠকদের জন্য বাবুল আক্তারের সেই ফেসবুক স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো:

“২০০৮ সালের মার্চে র্যাব হতে বদলী হয়ে সিএমপিতে (চট্টগ্রাম মেট্রপলিটন পুলিশ) আসি। এরপর কোতোয়ালী জোন, হাটহাজারী সার্কেল, কক্সবাজার জেলা ঘুরে আবারও সিএমপিতে। শান্তিরক্ষা মিশন থেকে ফিরে আবার সিএমপিতেই। চট্টগ্রাম অঞ্চলেই চাকরি করাকালীন সময়ে আমার দুটি সন্তানের জন্ম হয়েছে। এখানে থেকেই পদোন্নতি পেয়েছি।
কাজ করতে গিয়ে সহযোগিতা পেয়েছি সহকর্মী, জনপ্রতিনিধি, সংবাদকর্মী ও সাধারণ মানুষের। তাদের সকলের কাছেই কৃতজ্ঞ। চেষ্টা করেছি সর্বদা সততা ও ন্যায়ের সাথে কাজ করতে, সত্যের পক্ষে থাকতে। তবে পুলিশের চাকরিতে সকলকে সন্তষ্ট করা সম্ভব নয়। হয় অভিযোগপত্র না হয় চুড়ান্ত রিপোর্ট। এর মাঝামাঝি কোন অবস্থানে থাকার সুযোগ নেই। সে কারণে অনেকের বিরাগভাজন হয়ে থাকতে পারি। তবে এতটুকু বলতে পারি নিজ স্বার্থের জন্য কিছু করিনি। ক্ষমা চাইছি কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে।
সিএমপি থেকে বিদায় নিচ্ছি। জনস্বার্থে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে সংযুক্ত হবার আদেশ হয়েছে। যেখানেই থাকি মিস করবো প্রিয় চট্টগ্রামকে। মিস করবো চট্টগ্রামের মানুষদের, যাদের ভালোবাসা আমার কর্মজীবনের প্রেরণা। আমার জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী এই চট্টগ্রাম।
জীবনের আটটি বছর কেটেছে ভালোলাগার চট্টগ্রামে। আবার দেখা হবে । শুভকামনা সকলের জন্য।”
পুলিশের এই চৌকস, পরিশ্রমী ও সাহসী কর্মকর্তার চোখকে ফাঁকি দেয়া অনেক সময়ই সম্ভব হতো না অপরাধীদের। জঙ্গী ও সন্ত্রাসীদের জন্য মূর্তিমান আতংক বাবুল আক্তার সমাজে বিদ্যমান অপরাপর অপরাধীদের বিরুদ্ধেও ছিলেন সমানভাবে সোচ্চার।

মাত্র দুই সপ্তাহ আগে গত ২১শে মে রাত ১২টা ১১মিনিটে ফেসবুকে দেয়া তার আরেক স্ট্যাটাসই তার প্রমাণ। তিনি তার স্ট্যাটাসের শিরোনাম দিয়েছিলেন “সংবর্ধনার ফাঁদে”। স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরছি:
“এস.এস.সি পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবার পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক জিপিএ ৫ পাওয়া কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবধর্না দেবার হিড়িক পড়ে যায়। যদি ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহ কিংবা প্রেরণা দেবার জন্য সংবর্ধনার আয়োজন করা হয় তাহলে অবশ্যই সেটি প্রশংসার দাবীদার। তবে, কোচিং সেন্টার ও কলেজগুলোর সংবর্ধনা দেবার মাঝে অনেকক্ষেত্রেই লুকিয়ে থাকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য।
এ বিষয়ে গত বছর কয়েকটি অভিযোগ পেয়েছিলাম। কোন এক কলেজ কৃতি ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে আয়োজন করেছিল বেশ জমকালো সংবর্ধনা অনুষ্ঠান। ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের উপহার সামগ্রী। শর্ত মোতাবেক সংবর্ধনায় অংশগ্রহনের পূর্বে মার্কসীট বা নাম-রোল নম্বর জমা দিতে হয়েছিল আয়োজক কর্তৃপক্ষের কাছে।
যখন সারাদেশে কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন গ্রহন শুরু হয়েছিল তখন ঐ সংবর্ধনা প্রদানকারী কলেজ বা কোচিং কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রীদের হয়ে অনলাইনে নিজেদের মালিকানাধীন কলেজকে প্রথম পছন্দ নির্বাচন করে আবেদন করে দেয়। কারণ তাদের কাছে ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনীয় বৃত্তান্ত তো রয়েই গিয়েছিল। আর শিক্ষার্থীরা যখন অনলাইনে আবেদন করতে যায় তখন সেই আবেদন আর গৃহিত হয়নি। নিরুপায় হয়ে ঐ ছাত্রছাত্রীদের পড়তে হয়েছে অপছন্দের কলেজে অত্যধিক টিউশন ফি দিয়ে।
যদি কোন কলেজ কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠান এধরনের প্রতারনার আশ্রয় নেয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহনের সুযোগ রয়েছে।”
গত ১৪ই মার্চ এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বাবুল আক্তার লিখেছিলেন: “নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন ধরনের প্রতারণায় নেমেছে প্রতারকচক্র।এসব চক্রের লোকেরা, কখনও নিজেকে বিভিন্ন প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট হিসেবে বা তাদের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিয়ে, আবার কখনওবা সংবাদকর্মীর পরিচয়ে সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে দলীয় কার্যালয়ে ভাল রিপোর্ট পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।”

বাবুল আক্তারের এক বিচিত্র জীবন। সব সময়ই তিনি মানুষের পাশে থেকেছেন। চেষ্টা করেছেন সাধ্যমতো উপকার করার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় দিবসে তিনি ওই দিবসের সাথে সম্পর্কিত তার জীবনের নানা ঘটনা শেয়ার করতেন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। গত ৮ই মার্চ তার পোস্ট করা এমনই একটি স্ট্যাটাস হুবহু তুলে ধরছি:
“২০১৫ সালের শুরুর দিকের ঘটনা। তখন আমি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সাউথ সুদানের মালাকাল স্টেটে কমিউনিটি পুলিশিং অফিসার হিসেবে কাজ করতাম। মাঝে মাঝে আমাদের রাতের বেলায় জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত শরণার্থী শিবিরে পেট্রোল ডিউটি করতে হত। এসব শরণার্থী শিবিরগুলোকে POC বা Protection Of Civilians বলা হয়।
এক রাতে আমরা চারজন নাইট পেট্রোলে বের হয়েছি। আমার সঙ্গে ছিলেন একজন ইথিওপিয়ার, একজন ঘানার ও আরেকজন জিম্বাবুয়ের পুলিশ অফিসার। অন্ধকার রাত। গাড়ী চালিয়ে পেট্রল করছি। আমাদের দেশের মত সেখানে কোন ড্রাইভার নেই । নিজেদেরেই গাড়ী চালাতে হয়। তখন ঘড়ির কাটা প্রায় আড়াইটাই ছুঁই ছুঁই করছে।
পিওসি’র ভেতর দিয়ে গাড়ী চালিয়ে যাচ্ছি। উচ্চু নিচু মাটির রাস্তা। আস্তে আস্তে গাড়ী চালাচ্ছিলাম।হঠাৎ গাড়ীর হেডলাইটের আলোয় লক্ষ্য করলাম দূরে কেউ একজন রাস্তার পাশে শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে এমনটি দেখা যায়। মদ খেয়ে কেউ পড়ে থাকে। কাছে এসে দেখলাম একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা।
গাড়ী থেকে দ্রুত নেমে মহিলাটির কাছে গেলাম। অর্ধ্ উলঙ্গ অবস্থায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন তিনি । পাশে সদ্যজাত একটি শিশু ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে। এ ধরনের একটি দৃশ্য দেখার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। আমাদের সাথে ঐ রাতে কোন নারী অফিসার ও ছিলেন না। নিজেদের খুব অসহায় মনে হচ্ছিল। পুরো চাকরী জীবনে নিজেকে কখনো এমন অসহায় মনে হয়নি।
আমি আর ইথিওপিয়ান অফিসার মহিলার পাশে রইলাম। আর অন্য দুজন অফিসারকে পাঠালাম গাড়ী নিয়ে ইন্ডিয়ান হাসপাতালে। কোন নার্স্ বা ডাক্তারকে নিয়ে আসার জন্য। স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার জন্য ইন্ডিয়ান আর্মির একটা মেডিক্যাল টিম এখানে কাজ করে।
যুদ্ধবিধ্বস্থ দেশে পিওসি তে আশ্রয়প্রার্থীদের পরিবারের অনেকেই হয়তো যুদ্ধে মারা গেছেন অথবা কোন কারণে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। এই মহিলার ও পরিবারে কোন পুরুষ সদস্য ছিল না। সবাই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন। তাই প্রসব বেদনা উঠলে তিনি নিজেই হেঁটে হেঁটে হাসপাতালের দিকে রওয়ানা হয়েছিলেন। পথিমধ্যেই ঘটে এ ঘটনা।
অসহায় মহিলাকে সামনে রেখে দাড়িয়ে আছি আমরা। অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হয় না। একটি নাম না জানা পাখি ডেকে উঠল, মনে হলো যেন আমাদের অসহায়ত্বকে ভেংচী কাটল। প্রায় ১৫/২০ মিনিটের মাথায় একজন ইন্ডিয়ান নার্সকে নিয়ে আমাদের অপর দুই অফিসার হাজির হলেন। তিনি সব দেখে নিশ্চিত করলেন মা-বাচ্চা দুজনই আপাতত ঠিক আছে। স্বস্তি পেলাম, ধরাধরি করে মা ও শিশুকে গাড়িতে তুললাম।
হাসপাতালে এনে নাড়ি কেটে ধুলো মাখা নবজাতককে পরিষ্কার করা হলো। ততক্ষণে শুশ্রুষা পেয়ে বাচ্চার মাও জেগে উঠেছে। তার সদ্যজাত পুত্রসন্তানটিকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ আর মুক্তির কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মহিলা । চোখের কোনা আদ্র হয়ে উঠল, হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এলাম। রাত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। আকাশের কোলে ঢলে পড়েছে চাঁদ।
আজ বিশ্ব নারী দিবস। সকল নারীর জন্য শুভকামনা। জয় হোক নারীত্বের, সব নারী পাক নিরাপদ মাতৃত্বের অধিকার।”
এই সাহসী পুলিশ কর্মকর্তার জীবনে অর্জনও কম নয়। অল্প সময়ে পেয়েছেন অনেক পুরস্কার, অনেক খ্যাতি ও কাজের স্বীকৃতি। এর মধ্যে রয়েছে-রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক পিপিএম (সেবা) (২০০৮), ২০০৯ পিপিএম (সাহসিকতা), ২০১০ সালে আইজিপি ব্যাজ, ২০১১ সালে পুলিশের সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল পুরস্কার বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল (সাহসিকতা)। সর্বশেষ বেসরকারি পর্যায়ে ২০১২ সালে সিঙ্গার-চ্যানেল আই (সাহসিকতা) পুরস্কার লাভ করেছেন বাবুল আক্তার। আর এর মধ্যে চার-চারবার অর্জন করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জের সেরা সহকারী পুলিশ সুপারের মর্যাদা।

কিন্তু জীবনের সবচেয়ে নির্মম পুরস্কারটি পেলেন বাবুল আক্তার গত ৫ই জুন। আর সেটি হলো নিজের দুই প্রিয় সন্তানের জননীর বিধ্বস্ত লাশ। ধুলোমলিন আর রক্তে মাখা প্রিয়তমা স্ত্রীর এই লাশ বাবুল আক্তারের কোন কাজের স্বীকৃতি সেই প্রশ্নই হয়তো তাকে সারাজীবন তাড়া করে ফিরবে। এ নিয়ে হয়তো কোনদিন তিনি লিখবেন। সে অপেক্ষাতেই থাকলাম।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের ব্যস্ততম এলাকা জিইসি মোড়ে রবিবার (৫ই জুন ২০১৬) প্রকাশ্য দিবালোকে বহু মানুষের সামনে পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খাতুন ওরফে মিতু আক্তারকে (৩২)নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে গুলি ও ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা মিতুকে হত্যা করে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।
সকাল ৭টার দিকে বাসা থেকে ১০০ গজ দূরত্বে নগরীর পাঁচলাইশ থানার জিইসি মোড়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ সময় সৌভাগ্যবশত তার ছেলে মাহির আক্তার দৌড়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। এ টার্গেট কিলিংয়ে দুর্বৃত্তরা সময় নেয় মাত্র ৪০ থেকে ৫০ সেকেন্ড।
লাল রক্তের মাঝে হিজাব পরিহিতা মিতুর নিস্পাপ মুখখানি দেখে যে কারো চোখে পানি এসে যাবে। এমন এক মমতাময়ী মাকে কেউ তারই সন্তানের সামনে এভাবে হত্যা করতে পারে এটা ভাবতেও যেন হৃদয় শিউরে উঠে। কিন্তু সেই ঘটনাই ঘটলো শত শত মানুষের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে। প্রতিনিয়ত গুম, খুন ও নিস্পাপ মানুষের রক্তে রঞ্জিত এই বাংলাদেশে এমন নৃশংসতা আর কতকাল চলবে? এর শেষ কোথায়? এ জন্য কে দায়ী?
কেবি





