ভারত অধিকৃত কাশ্মীরে চলমান বিক্ষোভ দমনে ভারতীয় বাহিনীর ছোড়া ছররা গুলিতে আহতদের ৫শতাধিকের বয়স ২০ বছরের নিচে। তাদের বেশিরভাগই স্কুল-কলেজের ছাত্র/ছাত্রী এবং তাদের আক্রান্ত চোখের দৃষ্টি ফিরে পাওয়া অনেকটাই অনিশ্চিত বলে জানিয়েছেন ডাক্তাররা।

হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী, ছররায় আহত মোট ১০৬৫ জনকে শ্রীনগরের শ্রী মহারাজা হরি সিং হাসপাতালে এবং শের-ই-কাশ্মীর মেডিকেল সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫২৩ জনই ২০ বছরের নিচে।

kashmir boy

এছাড়াও, ১০১ জনের বয়স ১৫ বছরের নিচে এবং ছররায় আহত সবচেয়ে ছোট শিশুটির বয়স ৪ বছর।

হাসপাতালের ডাক্তাররা এ ঘটনাকে একটি দুঃখজনক পরিস্থিতির প্রমাণ বলে বর্ণনা করেন।

শ্রী মহারাজা হরি সিং হাসপাতালের একজন ডাক্তার বলেন, ‘আহতদের অধিকাংশই ২০ বছরের কম বয়সী। মারাত্মক আঘাতের কারণে তাদের অধিকাংশরই চোখ নষ্ট হওয়ার পথে।’

গত ১০৭ দিনের মতো কাশ্মীরে বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। গত ৮ জুলাই হিজবুল মোজাহিদিনি কমান্ডার বুরহান ওয়ানি ভারতীয় বাহিনীর গুলিতে নিহত হলে সমগ্র কাশ্মীর জুড়ে এ বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

ডাক্তাররা জানান, ‘ছররা গুলিতে চোখে আঘাত প্রাপ্তদের মধ্যে আরো ৩৭০ জনের বয়স ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সের মধ্যে। তাদের মধ্যেও অনেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী রয়েছে।’

এসব আহতদের আরোগ্যলাভের জন্য এক বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে বলে তারা জানিয়েছেন।

শ্রী মহারাজা হরি সিং হাসপাতালের একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ বলেন ‘চোখে আঘাত প্রাপ্তদের একাধিকবার সার্জারি অপারেশন করতে হয়েছে। রোগীদের চোখের সংক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য কিছু জরুরি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।’

তিনি আরো জানান, এসব আহতরা শিগগিরই নিয়মিত কোনো কার্যকলাপে অংশ নিতে পারবে না।

আহতের মধ্যে অন্তত ৫০ জন উভয় চোখেই মারাত্মক আঘাত পেয়েছেন। ডাক্তারদের ভয়, ছররায় আহতদের অধিকাংশই আর স্কুলে ফিরে যেতে পারবেনা।

কাশ্মিরে প্রাণঘাতী ‘পেলেট গান’ ব্যবহার না করতে আদালতের নির্দেশ:

এর আগে, ভারতীয় আগ্রাসনের শিকার কাশ্মিরে ‘পেলেট গান’ বা ছররা গুলি চালানো বন্দুক ব্যবহার না করতে আদেশ দিয়েছিলো হাইকোর্ট।

জম্মু-কাশ্মির হাইকোর্ট বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে পেলেট গানের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়া উচিত। এক জনস্বার্থ মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতির সমন্বিত বেঞ্চ জানায়, ‘কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লোকসভায় বলেছেন, পেলেট গানের বিকল্প খুঁজতে এক বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হবে। পেলেট গানের ব্যবহার বন্ধ করতে এই বিবৃতিই যথেষ্ট হওয়া উচিত।’

জম্মু-কাশ্মির হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এন পল বসন্ত কুমার এবং বিচারপতি মুজাফফর হোসেন আতাহারের সমন্বিত বেঞ্চ জানায়, “স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংয়ের ওই বিবৃতিতে এটাও স্পষ্ট যে, পেলেট গান হল প্রাণঘাতী।”

কার্যত সরকারপক্ষকে অভিযুক্ত করে নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে চোখে আঘাত লাগা একটি শিশুর ছবি দেখিয়ে আদালত কঠোর মন্তব্যে জানায়, “যখন কারো দৃষ্টি শক্তি চলে যায়, সে সবকিছু হারিয়ে ফেলে। কোনো সংবেদনশীল মানুষ এই ছবি সহ্য করতে পারবেন না। এতো পাঁচ বছরের একটি বাচ্চা। ওকে নিশ্চয় পাথর ছোঁড়ায় অভিযুক্ত করা যায় না!”

আদালত শান্ত এলাকায় কারফিউ শিথিল করে মানুষজনের খাদ্য সরবরাহ সুনিশ্চিত করতে এবং ওষুধপত্রের দোকান খোলা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিলেও এর বাস্তবয়ন হয়নি।

উল্লেখ্য, ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের জনপ্রিয় স্বাধীনতাকামী নেতা বুরহান ওয়ানির (২২) মৃত্যুকে কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে চলছে ভয়াবহ সহিংসতা। অব্যাহত রয়েছে জরুরী অবস্থা।

ইতোমধ্যেই ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন অর্ধশতাধিক কাশ্মীরের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনকারী। সর্বশেষ ওই এলাকার গণমাধ্যমও বন্ধ করে দিয়েছে ভারত সরকার।

800x480_IMAGE58868236

অন্যান্য আন্দোলনের মতো ওয়ানির মৃত্যুর পরও রাস্তায় নেমে এসেছে কাশ্মিরের তরুণ সমাজ। নিজেদের কথাগুলো তারা ছড়িয়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে।

ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি, ইন্টারনেট এবং টেলিফোন সেবা বন্ধ করে দেয়াসহ নানা বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন কাশ্মিরি তরুণেরা। প্রশ্ন হচ্ছে, তরুণরা কেন নিজেদের জীবনবাজি রেখে চালিয়ে যাচ্ছে আন্দোলন। এই প্রশ্নের উত্তর জানিয়েছেন কাশ্মীরের বিভিন্ন পেশার কয়েকজন তরুণ।

২৩ বছর বয়সী ক্রিকেটার সামির আহমদ ভাট বলেন, ‘আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে তাদের প্রতি পাথর ছুড়তে। তারা আমাদের উসকে দিচ্ছে। যতক্ষণ তারা আমাদের ওপর তাদের নৃশংসতা বন্ধ না করবে আমি পাথর ছুড়ে যাবো।’

হতাশাগ্রস্ত এই তরুণ আরো বলেন, ‘আজ আমি যাদের সঙ্গে আছি, আমি জানি না কাল তারা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে শহীদ হয়ে যাবেন কি না। তারা কেন আমাদের গুলি করে? দেশের অন্য জায়গায় আন্দোলন হলে জলকামান ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করা হয়। আর কাশ্মিরে ব্যবহার করা হয় বুলেট।

গত ১০৭ দিন ধরে চলতে থাকা এই আন্দোলনে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে চোখ হারিয়েছেন বহুসংখ্যক মানুষ।

এছাড়াও ৫শতাধিক কাশ্মীরি তরুণ শীক্ষার্থীর চোখ নষ্ট হওয়ার পথে। মারাত্মকভাবে আহত হয়ে হাসপাতালে দিন কাটাচ্ছেন সহস্রাধিক লোক।'

সূত্র: গ্রেটার কাশ্মীর

এসএম