পৃথিবীতে এখন প্রতিটি স্থান থেকে আমরা অনায়াসে দাবি করি যে, আমরা সভ্য যুগে বাস করি। তবে আমরা কি জানি, আমরা কতটা নিষ্ঠুর, আর প্রশ্রয় দিচ্ছি এই নিষ্ঠুরতাকে!

মায়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিমদের যেভাবে হত্যা করা হচ্ছে এটা একটা বিবেকবান মানুষের কাছে কখনো সহ্য করার মত না। শুধু তা নয়, মায়ানমারের বৌদ্ধ সমাজের এসব লোকেরা রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের নির্যাতন করার মাধ্যমে যে আনন্দ উপভোগ করছে তা সত্যিই ন্যাক্কারজনক।

বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা যায়, কিছু দিন আগে সারিবদ্ধভাবে শিশুদের মাটিতে বিছিয়ে রেখে তার উপর দিয়ে মটরচাইকেল চালিয়ে এইসব নিরীহ শিশুদের হাত ভেঙ্গে দেয়া হচ্ছে। আর এখন সেটা রূপ নিয়েছে গণহত্যায়।

rohingya_595

কোন কারণ ছাড়ায় প্রতিদিন শত শত রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হচ্ছে। তাদের অপরাধ শুধু একটাই, তারা মুসলমান। বলা যেতে পারে পুরু বিশ্বে এখনকার সময়ে মায়ানমারের রোহিঙ্গারা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। এসব নির্যাতনের মাত্রা সভ্য জাতি হিসেবে দাবি করা এই সমাজের কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা।

যদিও আধুনিকতার এই বিশ্বে আজ সবথেকে বেশি নির্যাতিত মুসলিম জাতি। আর এই মুসলিমদের রক্ত যেন পৃথিবীর কম মূল্যের জিনিষের তালিকায় প্রথম। উন্নত এই বিশ্বে আজ নির্যাতিতদের তালিকায় রয়েছে কাশ্মির, ফিলিস্তিন-আফগান-ইরাক-সিরিয়া-লিবিয়া-ইয়েমেন-সুদানবাসীর পাশাপাশি মায়ানমারের মুসলিম রোহিঙ্গারা। যেখানে চলছে মুসলিম নিধনযজ্ঞ।

rohingya-refugees-photo-source-getty-images

ইতিমধ্যে ইসলাম ধর্মকে কটাক্ষ করেও অনেকেই ভিন্ন দেশে গিয়ে রক্ষা পায়। তাদের রক্ষা করার জন্য মানুষের অভাব হয়না। অথচ নিজ দেশে পরবাসী রোহিঙ্গা মুসলিমদের জোর করে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হলেও এ নিয়ে তাদের কোনো প্রতিবাদ নেই।

এই আধুনিক বিশ্বে বাঘ সংরক্ষণের আহ্বানে পত্রিকার শিরোনাম করা হয়, সম্মেলন হয়। কিন্তু সারাবিশ্বে ৫৭টি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশ থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের গণহত্যা থেকে রক্ষা করতে কোনো সম্মেলন হয় না।
১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয় বার্মা সরকার। কয়েকশ বছরের পিতৃভূমিতেই তাদের বলা হচ্ছে অবৈধ অভিবাসী। নিজেদের দেশে তাঁরা বর্তমানে প্রবাসী। এদের রোহিঙ্গা বলতে নারাজ বার্মা সরকার এবং বার্মার বৌদ্ধরা। তারা এদের ডাকে বাঙালি বলে।

rohingya-muslims

সে থেকেই বার্মায় মুসলিমদের গণহত্যা চলে আসছে। প্রায়ই রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রতি কখনো সরকার, কখনো স্থানীয় উগ্র সাম্প্রদায়িক বৌদ্ধরা আবার কখনো উভয়পক্ষ মুসলিম নিধনযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। যখনই নির্যাতনের কিছু চিত্র সামরিক জান্তার জান্তব নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত আলোয় আসে, তখনই এ নিয়ে কিছুটা কথাবার্তা হয়।

একবার চিন্তা করে দেখুন তো হঠাৎ যদি বলা হয় আপনি এ দেশের নাগরিক নন, অন্য কোনো দেশের নাগরিকত্বও নেই আপনার কাছে-তাহলে কেমন লাগবে? বার্মার রোহিঙ্গা মুসলিমদের বর্তমান কোনো মাতৃভূমি নেই।

এতসব মানবাধিকার আর আন্তর্জাতিক সঙ্ঘের যুগে তাদের বাসস্থল রিফিউজি ক্যাম্প! কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা ক্যাম্পগুলো পাহারা দিচ্ছে চেকপোস্ট বসিয়ে বার্মার মিলিটারি। বাঁচার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সার্বক্ষণিক অভাব-বঞ্চনায়, দুঃখ-কষ্টে ও দুর্ভোগে অনিশ্চিত জীবন কেটে যাচ্ছে শরণার্থী শিবিরবাসী রোহিঙ্গাদের।

নিকট প্রতিবেশী এবং ভাতৃপ্রতিম জাতি হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সম্পর্কের ইতিহাস অনেক পুরনো। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গারা আজ আমাদের আশ্রয়প্রার্থী। অথচ ইতিহাসের সুদীর্ঘ পথপরিক্রমায় এই আরাকানি মুসলিমরা আমাদের সাহায্য করে আসছেন।

arakan-1

বার্মার গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী সুচি গত বছর কয়েক দশকের গৃহবন্দিত্ব ঘুচিয়ে মুক্ত দুনিয়ায় পা ফেলেন। তার ত্যাগ আর সংগ্রামের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সারাবিশ্বের মিডিয়া। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে লড়াইয়ের জন্য একেরপর এক তিনি লাভ করছেন নানা আন্তর্জাতিক সম্মাননা।

অথচ গত এক বছরে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দুর্যোগের ঘনঘটা বিরাজ করলেও প্রতিবাদে স্বজাতীয়দের বিরুদ্ধে মুখ খোলেননি তিনি। রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে তার নীরবতার সমালোচনা হয়েছে মুসলিম বিশ্বজুড়ে।

স্বদেশী রোহিঙ্গারাও অসন্তুষ্ট তার প্রতি। এক বাস্তুভিটাহারা রোহিঙ্গা নারী মৌং বলেই ফেলেন, তিনি (সুচি) কোনো কথা বলছেন না, সম্ভবত আরও বেশি বৌদ্ধ ভোট তিনি পেতে চান বলে।

মূলকথা হচ্ছে, আর কত সময় ঘুমন্ত থাকবে বিশ্ব বিবেক? অন্তত এখন হলেও মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর এই অমানবিক নির্যাতন বন্ধে পাশে দাঁড়াক মুসলিম বিশ্ব।

 


এমএনজে