আমেরিকার আাসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজ দলের সিনিয়র সদস্যদের মধ্যেও দেখা দিয়েছে আতংক।

চলতি বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনে এরই মধ্যে সাত রাজ্যে জয়লাভের (seven-state victory) মধ্য দিয়ে ট্রাম্প যখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে তখনই তার নিজ দলের সিনিয়র রিপাবলিকানদের কাছ থেকে এমন বিরুপ প্রতিক্রিয়া আসলো।

এরইমধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে রিপাবলিকান দলের এককপ্রার্থী (unifier)হিসেবে ঘোষণা করলেও দলটির অভিজ্ঞ ও খ্যাতিসম্পন্ন রাজনীতিকরা জোরালোভাবে তার বিরোধীতা করে চলছেন।

এমনকি রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম স্থানীয় সময় বুধবার দলকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আসন্ন নভেম্বরের নির্বাচনে ট্রাম্পের পরাজয় ঘটবে।

অপরদিকে অবসরপ্রাপ্ত নিউরোসার্জন বেন কার্সন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের দৌড়ে নিজের দুর্বল পারফরমেন্সের পটভূমিতে এই প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।

স্থানীয় সময় বুধবার এক বিবৃতিতে এই প্রার্থী বলেন, আসন্ন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের প্রচারণায় তিনি সামনে অগ্রসর হবার মতো কোন পথ (no path forward) দেখতে পাচ্ছেন না। আর সে কারণে বৃহস্পতিবারের টেলিভিশন বিতর্কে অংশগ্রহণ না করারও ঘোষণা দেন বেন কার্সন।

এদিকে, সাবেক রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনি বলেছেন, বৃহস্পতিবার তিনি এক বক্তব্য দিবেন এবং সেখানে ট্রাম্পকে চ্যালেঞ্জ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রাজনীতির বাইরে একজন সফল ব্যবসায়ী (businessman) ট্রাম্পকে তীব্র ভাষায় আক্রমন করে মিট রমনি আরও বলেন, অভিবাসনের মতো ইস্যুগুলোতে তার কঠোর অবস্থান (hardline stance) রিপাবলিকান দলের মূলনীতির একেবারে বাইরে।

এদিকে তথাকথিত সুপার টুয়েসডে’তে (Super Tuesday) ট্রাম্পের বিজয়ের ফলে হোয়াইট হাউস দখলের লড়াইয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেটিক প্রার্থীর বিপরীতে রিপাবলিকান প্রার্থী হিসেবে তার মনোনয়নপ্রাপ্তির রাস্তা এখন বলতে গেলে প্রায় নিস্কন্টক।

কারণ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর প্রাথমিক দৌড়ে এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ এ পর্যন্ত চারটি রাজ্যে (states) এবং ফ্লোরিডার সিনেটর মার্কো রুবিও শুধুমাত্র মিনেসোতা রাজ্যে জয়লাভ করেছেন। নিচের চার্টে দুই দলের প্রার্থীদের প্রাথমিক লড়াইয়ের সবশেষ চিত্র দেখানো হলো:

এদিকে, হাউস স্পিকার পল রায়ান ও দক্ষিণ ক্যারোলিনার সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামসহ বেশ কয়েকজন দলীয় নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বিতর্কিত রাজনৈতিক নীতি ও অবস্থানের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য অব্যাহত রেখেছেন।

ট্রাম্পকে নিয়ে সবশেষ বিতর্ক ওঠে “কু ক্লাক্স ক্লান (Ku Klux Klan)” বা সংক্ষেপে কেকেকে (KKK) হিসেবে কুখ্যাত শেতাঙ্গবাদী বর্ণবিদ্বেষী ডেভিড ডিউককে স্পষ্টভাষায় পরিত্যাগ করতে না পারাকে ঘিরে। এমনকি এই বর্ণবিদ্বেষী বিতর্কিত ডেভিড ডিউক ডোনাল্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন।

অবশ্য এর পরিণতি আঁচ করতে পেরে পরে ট্রাম্প পরবর্তীতে বলেন, অতীতে বিভিন্ন সময়ে নানা উপলক্ষ্যে তিনি ডিউককে অসমর্থন করে নিজের অবস্থান পরিস্কার করেছেন।

স্পিকার পল রায়ান অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে শীর্ষ আবাসন টাইকুন (real estate mogul) ট্রাম্পকে অসর্মন করে বলেন, বর্ণবিদ্বেষের ওপর গড়ে ওঠা কোন দল বা শক্তিকে তারা কিছুতেই সমর্থন করতে পারেন না। মানুষের সহজাত অবস্থানকে আঘাত করার মতো অবস্থানের দিকে তারা রিপাবলিকান দলকে নিয়ে যেতে পারেন না।

বিষয়টিকে আরও পরিস্কার করে রিপাবলিকান সিনেটর ও সংখ্যাধিক্য নেতা (majority leader) মিটচ ম্যাককনেল বলেন, আমি বিষয়টি একেবারে খোলাসা করে বলতে চাই, সিনেটে রিপাবলিকানরা ডেভিড ডিউক ও কেকেকে এবং তার বর্ণবিদ্বেষকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করেন।

এমনই পটভূমিতে প্রভাবশালী কংগ্র্রেসম্যান পেটার কিং কৌতুক করে বলেন, ট্রাম্প যদি প্রার্থী হন তাহলে তিনি রাজনীতি ছেড়ে দিবেন।

অপরদিকে মার্কো রুবিও স্থানীয় সময় মঙ্গলবার এক বক্তৃতায় ট্রাম্পের প্রতি ইঙ্গিত করে আরও বলেন, অপ্রত্যাশিতভাবেই রিপাবলিকান শিবির এই সাবেক রিয়েলিটি টিবি তারকাকে সমর্থন দিয়েছে।

তিনি বলেন, সামনে অগ্রসর হবার মতো আর কাউকে পাওয়া গেলে এখনও তাকে ঘিরেই সবাই স্বত:স্ফুর্তভাবে এগিয়ে যাবে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেটি কখনই হবে না।

এদিকে, আমেরিকার প্রভাবশালী ইংরেজি দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, রিপাবলিকান দলের দাতাদের (donors) কয়েকটি গ্রুপ এরই মধ্যে ট্রাম্প-বিরোধী প্লাটফরমকে দাড় করাতে অর্থ বা ফান্ড সংগ্রহে নেমে পড়েছেন।

এমনকি, আমেরিকার সাংবাদিকদের প্রভাবশালী ও অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান “সেন্টার ফর পাবলিক ইন্টিগ্রিটি (The Center for Public Integrity)-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, খোদ রিপাবলিকানদের মধ্যেই ট্রাম্পবিরোধী মনোভাব এতটাই জোরালো হয়েছে যে সুপার টুয়েসডে’র লড়াইয়ের প্রাককালে ট্রাম্পের প্রচারাভিযানের বিরুদ্ধে অন্তত সাড়ে আট হাজার বিজ্ঞাপণ প্রচার করা হয়েছে।

এদিকে, রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম রিপাবলিকানদের সতর্ক করে দিয়ে আরও বলেন, ট্রাম্পকে দলের মনোনয়ন দেয়া হলে তিনি ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের কাছে হেরে যাবেন।

এক্ষেত্রে টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজই হতে পারেন একমাত্র বিকল্প প্রার্থী যার মাধ্যমে ট্রামকে জব্দ করা যাবে-এমন মন্তব্য করে গ্রাহাম আরও বলেন, তবে, সেটা আদৌ করা যাবে কিনা তা নিয়ে তার যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।

উল্লেখ্য, আসন্ন নির্বাচনে আমেরিকার বর্তমান ক্ষমতাসীন ডেমোক্রটিক দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বাছাইয়ের প্রাথমিক দৌড়ে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও সাতটি রাজ্যে জয়লাভ করে নিজের অবস্থানের জনান দিয়েছেন। তার সাথে বেশ দুর্বল অবস্থান নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বার্নি স্যান্ডারস। (সূত্র: বিবিসি, আল-জাজিরা ও ইন্টারনেট)