সহকর্মী প্রেমিক নির্ঝর সিনহা রওনকের সঙ্গে অভিমান করে আত্মহত্যার ঘোষণা দিয়েছিলেন উদীয়মান মডেল সাবিরা হোসেন। সদা প্রফুল্ল মেয়েটির ফেসবুকে দেয়া ভিডিও দেখে শিহরিত হয়েছিলেন অনেকেই। অস্থির মেয়েটিকে শান্ত করতে কত চেষ্টাই না করেছিলেন তার বন্ধু ও শুভাকাঙ্খীরা!

মাথা ঠাণ্ডা রেখে শান্ত হওয়ার অনুরোধে জানিয়ে আত্মহত্যার মতো পথ থেকে সরে আসার জন্য সাবিরাকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন তার ফেসবুকের বন্ধুরা।

সাবিরার মতো এমন সদা হাস্য মেয়েটির মনে যে এত অশান্তি দানা বেঁধেছিল তা জানতে পেরে অনেকেই আবার বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন।

সাবিরার কাছের বন্ধুদের কেউ কেউ তাকে বলেছিলেন একটু অপেক্ষা করো প্লিজ, এমন কিছু করো না। হয়তো বন্ধুরা ছুটে যাচ্ছিলেন সাবিরার বাসায়। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস, শত চেষ্টায়ও বাঁচানো গেল না ক্ষণজন্মা মেয়েটিকে।

বাবা-মায়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে, জীবনের বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে-কত শতভাবেই না চেষ্টা করেছিলেন সাবিরাকে আত্মহত্যার পথ থেকে সরে দাঁড়াতে। কিন্তু আধুনিকতার নামে উচ্ছন্নে যাওয়া সমাজের কাছ থেকে পাওয়া ব্যথার ক্ষতটা এরই মধ্যে এতটাই ক্যান্সারে পরিণত হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত সাবিরাকে আর ফেরত পেল না তার স্বজনরা।

টাইমনিউজিবিডির পাঠকদের জন্য সাবিরার ফেসবুকে দেয়া বন্ধুদের কমেন্টস থেকে কয়েকটি তুলে ধরা হলো:

সাজ্জাদ আহমেদ: “What are you doing? Stop!!” অর্থাৎ “তুমি কি করছো? থামো!!”

আব্দুল্লাহ আল সোহান: “Sabira what r u doing yrrr....??? 2mr theke ata asha kora jay na....forget it..... u'll be ok dear...” অর্থাৎ- “সাবিরা তুমি এটা কি করছো? তোমার কাছ থেকে এটা আশা করা যায় না। এটা ভুলে যাও... সব ঠিক হয়ে যাবে বন্ধু।”

মিমি ফিসতিন: “Ki kortesis aguli? Pagol hoye gesis?? Video delete kor taratari” অর্থাৎ “কি করতেছিস এগুলো? পাগল হয়ে গেছিস? ভিডিও তাড়াতাড়ি মুছে ফেল।”

অ্যালেক্স মাহমুদ: “R delete kore lab nai ... 6houre hoy gayse ..” আর মুছে ফেলে লাভ নাই...ছয় ঘণ্টা পার হয়ে গেছে এরই মধ্যে।”

ইসরাত তন্বি: “শান্ত হও মেয়ে। তোমার কি হয়েছে? যে মানুষটির তোমার জন্য অনুভূতি নাই, তোমার কষ্টে কষ্ট পায় না, তোমার ভালোবাসার মূল্য দেয় না, ওই ধরনের মানুষের জন্য তুমি মরতে যাচ্ছো? ওই মানুষটার সাথে তোমার সম্পর্ক কয়দিনের? নিশ্চয়ই তোমার আব্বু-আম্মুর থেকে বেশিদিনের নয়। যেই বাবা-মা তোমাকে বড় করছে, ভালোবাসা দিয়েছে তাদের জন্য তুমি এই উপহার রাখলা? একটা ছেলে যার কাছে তোমার গুরুত্ব নাই, তার জন্য তুমি তোমার জীবন এইভাবে খারাপ করবা? এমন বোকামি করো না। এটা জীবন, কোন খেলার মাঠ নয়।”

শামীমা খান মাহী: “প্লিজ কেউ আমাকে আসল খবরটি দিবে, প্লিজ।”

ইলিয়াস হোসেন: “সে আর নেই, সে মারা গেছে।”

শামীমা খান মাহী: “প্লিজ আপনি কি আসলেই জানেন? এটা অসম্ভব। আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।”

অধরা চৌধুরী: “শান্ত হও মেয়ে। এমন করো না। দয়া করে বলো, তুমি কি জীবিত আছো? প্লিজ একবার বলো। তোর চোখের সেই হাসি দেখার অপেক্ষায় আছি, প্লিজ।”

নুসরাত জাহান খান নিপা: “এটা কি করলা তুমি? এইটা কোনোদিনই ভাবতে পারিনাই আমি যে তুমি এই কাজ করবা। কত স্ট্রং একটা মেয়ে তুমি। কত খারাপ পরিস্থিতি আগে ফেস করে আসছো, আর আজকে এভাবে হার মেনে নিলা? একটাবার আমার সাথে শেয়ার করতা। আমি কি বলবো কিছুই বুঝতে পারতেছি না।”

খান সামির: “একটা বাজে মানুষের জন্য এভাবে নিজেকে ত্যাগ করা মোটেই উচিত হয়নি। সত্যি খুব খারাপ লাগল ভিডিওটা দেখে। জীবনটা এতটা ছোট নয় যে খুব সহজে হার মানতে হবে। উচিত হয়নি। মেয়েটা যতবারই তার পেটে ছুরি ঢুকাতে চাইছে ততবারই আমার বুক কেঁপে উঠছে। মেয়েটা আবেগের কাছে হার মেনেই নিল। আল্লাহ আর কেউ যেন এমন না হয়।”

সামাজিক অবক্ষয়, বিজাতীয় অপসংস্কৃতির সয়লাব, ধর্মীয় অনুশাসনের ব্যবহার না থাকার কারণে সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে অশ্লীলতা ও পরকীয়া ও প্রেমের নামে চরিত্র হননের ঘটনা।

পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মায়ের কোল পর্যন্ত হয়ে পড়েছে অশান্ত। দেখতে হচ্ছে মায়ের হাতে সন্তান খুন এবং সন্তানের হাতে বাবা-মা হত্যার মতো লোমহর্ষক সব ঘটনা। আর এরই ধারাবাহিকতায় সবশেষ দেখা গেল উদীয়মান মডেল সাবিরার আত্মহত্যা।

এসব ঘটনায়ও বিবেকের চোখ খুলবে না মানুষের? কালবিলম্ব না করে এ থেকে সবাই শিক্ষা নিবেন, পিতা-মাতারা তাদের সন্তানদের সম্পর্কে আরও সজাগ হবেন এবং আকাশ সংস্কৃতির নামে অশ্লীলতায় পরিপূর্ণ বিজাতীয় সংস্কৃতি বন্ধে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে এগিয়ে আসবেন-এটাই সবার কামনা।

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে মিরপুরের রূপনগরে সাবলেটের বাসায় ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল গান বাংলার মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ ও মডেল সাবিরা হোসাইন । আত্মহত্যার কিছু পূর্বেই তিনি নিজ মোবাইলে সেলফি মুডে ৯ মিনিটের একটি ভিডিওটি ধারণ করেছেন সাবিরা।

ভিডিওটিতে একটি ছুরি হাতে সাবিরাকে বারবার পেটে ও গলায় চাপ দিতে দেখা যায়। কিন্তু ব্যর্থ হওয়ায় তিনি বলেন, 'আমি ব্যর্থ, আপাতত। এবার পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।'

ফেসবুক স্ট্যাটাসে নির্ঝর সিনহা রওনক নামের সহকর্মী ও প্রেমিক আলোকচিত্রীকে উদ্দেশ্য করে সাবিরা হোসাইন লিখেন, 'আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। এটা তোমার ছোট ভাইকে বলছি। সে আমাকে যা ইচ্ছে বলেছে। আর বেস্ট পার্ট হলো- প্রত্যয় আমাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। আর আমার প্রশ্ন হলো তোমার কী একটুও খারাপ লাগেনি?'

নির্ঝরকে উদ্দেশ্য করে তিনি লিখেন, 'আমাকে যখন তখন ব্যবহার করবা, শারীরিক সম্পর্ক করবা আর এসব সহ্য করে যাব এটা তো কোনো কথা না! আমিও ভালোবাসার টানে চলে আসবো তাও না, বিয়ের কথা বললে তোমার পরিবারের সমস্যা থাকে আর শারীরিক সম্পর্কের বেলায় সব ঠিক! এটা আমি আর সহ্য করতে পারছি না। এখন আমি আত্মহত্যা করছি শুধু তোমার জন্য।'

কেবি