সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমান অভিযান শুরুর পর তুরস্ক সরকার মারাত্মকভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। ন্যাটো জোটের একমাত্র মুসলিম সদস্য এ দেশটি দিন দিন পরিস্থিতি অনেক জটিল পর্যায়ে নিয়ে গেছে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন। বিমান অভিযান চলার সময় তুরস্ক গত ২৪ নভেম্বর রাশিয়ার একটি সুখোই-২৪ বোমারু বিমান ভূপাতিত করে। এ ঘটনার মধ্যদিয়ে তুরস্ক ও রাশিয়ার মধ্যে মারাত্মক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, অনেকেই ধারনা করছেন- দেশ দুটির মধ্যে যেকোনো সময় যুদ্ধ শুরু হতে পারে। বহু বিশ্লেষক বলছেন, বিমান ভূপাতিত করার মধ্যদিয়ে যে উত্তেজনা এ পর্যায়ে আনা হয়েছে তা খুব জরুরি কিছু ছিল না। অনেকে এও বলছেন, তুর্কি সরকার গায়ে পড়ে রাশিয়ার সঙ্গে গোলমাল করতে গেছে। অনেকে বলছেন, ন্যাটোর উসকানিতে তুরস্ক রাশিয়ার বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিয়েছে।

রাশিয়া বলেছে, সিরিয়া থেকে উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস যে তেল পাচার করছে সেই তেল কিনে নিচ্ছে তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের পরিবারের লোকজন। সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমান হামলার কারণে আইএস’র তেল সরবরাহ করার ট্যাংকার ও ট্রাক ধ্বংস হওয়ায় এ তেল-বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়েছে। তেল পাচার কমে যাওয়ায় বা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দু পক্ষই অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে। এতেই ক্ষিপ্ত হয়ে তুরস্ক রুশ বিমান ভূপাতিত করেছে।

বিমান ভুপাতিত করার পর রাশিয়া তুরস্কেরর বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। জবাবে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগান মস্কোকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আগুন নিয়ে খেলবেন না’। এ বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি কী রাশিয়াকে তুরস্কের সামরিক শক্তির ভয় দেখিয়েছেন? রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনি সামরিক শক্তি নয় বরং ন্যাটো জোটের ভয় দেখিয়েছেন।

যাহোক, দু দেশের মধ্যকার টানাপড়েনের অবস্থা যখন এমন, তখন রুশ-তুরস্ক সামরিক সংঘাতের আশংকা খানিকটা জোরদার হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ নিয়ে নানা রকম আলোচনা চলছে। এ অবস্থায় অনেকেই জানতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন- কার সামরিক শক্তি কতটা? এ বিষয়ে খোদ রাশিয়ার বার্তা সংস্থা স্পুৎনিক একটি চিত্র তুলে ধরেছে। Global Firepower Indexএর তথ্যের ভিত্তিতে স্পুৎনিক দু দেশের সামরিক শক্তির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেছে।

র‍্যাংক: Global Firepower Indexএর তথ্য অনুযায়ী সামরিক শক্তিতে রাশিয়া হচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান শক্তি। এক নম্বরে রয়েছে আমেরিকা। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের অবস্থান হচ্ছে ১০ নম্বরে।

জনশক্তি: সামরিক সংঘাত শুরু হলে রাশিয়া যুদ্ধের জন্য ছয় কোটি ৯০ লাখ মানুষ জড়ো করতে পারবে; সেখানে তুরস্ক পারবে চার কোটি ১০ লাখ লোক যোগাড় করতে। রাশিয়ার মোট সক্রিয় সেনা সংখ্যা সাত লাখ ৬৬ হাজার। অন্যদিকে তুরস্কের সেনা সংখ্যা চার লাখ ১০ হাজার। রাশিয়ার হাতে রয়েছে প্রায় ২৫ লাখ রিজার্ভ সেনা সেখানে তুরস্কের হাতে আছে এক লাখ ৮৬ হাজার।

সামরিক সরঞ্জাম: সামরিক সরঞ্জামের দিক দিয়েও রাশিয়া তুরস্কের চেয়ে অনেক এগিয়ে। রাশিয়ার হাতে রয়েছে ১৫,৩৯৮টি ট্যাংক। এছাড়া, রাশিয়ার আরমাতা ট্যাংক হচ্ছে বিশ্বের সবেচেয়ে শক্তিশালী ও অত্যাধুনিক ট্যাংক। তুরস্কের হাতে আছে ৩,৭৭৮টি ট্যাংক। তুরস্কের হাতে কোনো আরমাতা ট্যাংক নেই। পারসোনেল ক্যারিয়ারও রাশিয়ার কাছে অনেক বেশি রয়েছে।

Global Firepower Indexএর তথ্য অনুসারে রাশিয়ার হাতে রয়েছে ৩১,২৯৮টি পারসোনেল ক্যারিয়ার; সেখানে তুরস্কের হাতে আছে ৭,৫৫০টি ক্যারিয়ার।

সেল্ফ প্রপেল্‌ড আর্টিলারির ক্ষেত্রেও রাশিয়ার অবস্থান অনেক ওপরে। রাশিয়ার হাতে রয়েছে ৫,৯৭২টি সেল্ফ প্রপেল্‌ড আর্টিলারি। তুরস্কের কাছে মাত্র ১,০১৩টি। মাল্টিপল রকেট লাঞ্চার সিস্টেমের দিক থেকেও রাশিয়া অনেক এগিয়ে। রাশিয়ার কাছে রয়েছে ২,৭৯৩টি লাঞ্চার সিস্টেম; তুরস্কের কাছে এ সংখ্যা মাত্র ৮১১।

বিমান শক্তি: সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতে রাশিয়া ও তুরস্কের বিমান শক্তি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। রাশিয়ার হাতে রয়েছে ৩,৪২৯টি বিমান। অন্যদিকে তুরস্কের কাছে আছে ১,০২০টি বিমান। তবে, এর মধ্যে রাশিয়ার কাছে কৌশলগত যেসব দূরপাল্লার বোমারু বিমান রয়েছে তুরস্কের কাছে তা নেই।

বর্তমানে রাশিয়ার হাতে তিন রকমের বোমারু বিমান রয়েছে। এর একটি হলো-দীর্ঘপাল্লার সুপারসনিক টিইউ-১৬০ স্ট্র্যাটেজিক বোমারু বিমান। এ বিমানের গতি শব্দের গতির চেয়ে দ্বিগুণ এবং এর পাল্লা হচ্ছে ১২,০০০ কিলোমিটার। এ বিমান প্রচলিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র অথবা পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করা যায়। বোমারু বিমানের দ্বিতীয়টি হচ্ছে টিইউ-৯৫ এমএস টারবোপ্রপ স্ট্র্যাটেজিক বোমারু বিমান। এগুলোর সর্বোচ্চ গতি প্রতি ঘণ্টায় ৯২০ কিলোমিটার এবং পাল্লা হচ্ছে ১৫,০০০ কিলোমিটার। এ ধরনের বিমান প্রচলিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দ্বারা সজ্জিত করা যায়।

রাশিয়ার হাতে আরেক ধরনের বোমারু বিমান রয়েছে যার নাম হলো টিইউ-২২এমথ্রি সুপারসনিক বোমারু বিমান। এর গতি প্রতি ঘণ্টায় ২,০০০ কিলোমিটার এবং এর পাল্লা হচ্ছে ৬,৮০০ কিলোমিটার।

রাশিয়ার হাতে কয়েক ধরনের অত্যাধুনিক সুখোই জঙ্গিবিমান ও ‘ফিফথ জেনারেশনের টি-৫০ স্টিলথ বিমান রয়েছে যা যেকোনো যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। রাশিয়ার টি-৫০ স্টিলথ জঙ্গিবিমান আমেরিকার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়েছে আগেই। রাশিয়ার কাছে আছে এসইউ-২৪, এসইউ-২৫, এসইউ-২৭, এসইউ-৩০, ফোর্থ জেনারেশন এসইউ-২৭, ফোর্থ জেনারেশন মিগ-২৯ এবং মিগ-৩১ ইন্টারসেপ্টর।

এছাড়া সর্বাধুনিক এসইউ-৩৫ ফোর্থ প্লাস-প্লাস জেনারেশন জঙ্গিবিমান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের হাতে রয়েছে মার্কিন নির্মিত এফ-১৬ জঙ্গিবিমান। এফ-১৬ বিমানের পর আমেরিকা আরো উন্নত ভার্সনের বিমান তৈরি করেছে। তবে সেগুলো তুরস্কের হাতে নেই। তুরস্কের হাতে আরেক ধরনের জঙ্গিবিমান রয়েছে; সেটি হলো এফ-৪ ফ্যান্টম টু।

যুদ্ধের ভেতরে প্রচণ্ড প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে যদি স্থলভাগের কমান্ড সেন্টারগুলো অকেজো হয়ে যায় তাহলে রাশিয়া ‘ডুমসডে প্লেন’ বা ‘কিয়ামত বিমান’ আকাশে উড়িয়ে সামরিক কমান্ড দিতে পারবে। এ বিমান তুরস্কের কাছে নেই। রাশিয়া বাদে শুধুমাত্র আমেরিকার কাছে এ বিমান আছে। রাশিয়ার হাতে রয়েছে ১,০০০ মতো হেলিকপ্টার। তুরস্কের হাতে আছে ৪৪৩টি হেলিকপ্টার।

যুদ্ধজাহাজ: ছোট বড় সব মিলিয়ে রাশিয়ার হাতে রয়েছে ৩৫২টি যুদ্ধজাহাজ। রাশিয়ার হাতে সাবমেরিন রয়েছে ৬৩টি এবং একটি বিমানবাহিনী রণতরী।তুরস্কের হাতে আছে ১৩টি সাবমেরিন কিন্তু কোনো বিমানবাহী রণতরী নেই।

লজিস্টিক্যাল ফ্যাক্টর: রাশিয়া হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম প্রধান তেল উৎপাদনকারী দেশ। সেক্ষেত্রে তুরস্ক পুরোপুরি তেল আমদানিকারক দেশ। সামরিক বাজেটের তুলনমালূক আলোচনায়ও রাশিয়া এগিয়ে। রাশিয়ার সাম্প্রতিক সামরিক বাজেট হচ্ছে ৬০.৪ বিলিয়ন ডলার। তুরস্কে সামরিক বাজেটের পরিমাণ সেখানে ১৮.২ বিলিয়ন ডলার।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রেডিও তেহরান।