ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আকাশ দখল তথা এয়ারলাইন্সের প্রতিযোগিতা শুরু হতে যাচ্ছে।

ইরান এরইমধ্যে ঘোষণা করেছে, তারা বিভিন্ন মডেলের অন্তত ৫০০ বাণিজ্যিক বিমান কেনার চেষ্টা করছে যার জন্য মোট খরচ হবে প্রায় ৫,০০০ কোটি ডলার। বিপুল অংকের এই বিনিয়োগের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যেমন শুরু হবে ‘অর্থনৈতিক লড়াই’ তেমনি শুরু হবে পারস্য উপসাগরের আকাশের দখল নিয়ে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’। ইরানের বিমান বহরে বর্তমানে ২৪৮টি বিমান রয়েছে যেগুলো গড়ে প্রায় ২০ বছরের বেশি পুরনো। বিনিয়োগ সফল হলে ইরানের বিমান বহর হয়ে উঠবে এই অঞ্চলের ‘সুপারক্যারিয়ার’।

গত ১৬ জানুয়ারি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরপরই ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি সর্বপ্রথম ইউরোপের তিনটি দেশ সফর করেছেন। দেশ তিনটি হচ্ছে ফ্রান্স, ইতালি ও ভ্যাটিক্যান সিটি। এর মধ্যে ২৮ জানুয়ারি ফ্রান্স সফরের সময় দেশটির বিমান কোম্পানি এয়ারবাসের সঙ্গে বিমান কেনার বিষয়ে চুক্তি হয়েছে। চুক্তি অনুসারে ইরানকে এয়ারবাস কোম্পানি ১১৮টি বিমান সরবরাহ করবে। এর পাশাপাশি গত পহেলা ফেব্রুয়ারি ইরান ঘোষণা করেছে, ইউরোপীয় কোম্পানি এটিআর’র কাছ থেকে আরো ৪০টি বিমান কেনা হবে। ইরানের পরিবহন উপমন্ত্রী আসগর ফাখরিয়েহ কাশান এ তথ্য দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, “চুক্তির বিষয়ে আমরা ইতালি ও ফ্রান্সে কথা বলেছি এবং চুক্তি চূড়ান্ত করতে এটিআর’র কর্মকর্তারা কয়েকদিনের মধ্যে তেহরান আসবেন।”

তিনি জানান, কোম্পানিটির কাছ থেকে টারবোপ্রপ বিমান কেনা হবে। এটিআর হচ্ছে ফ্রান্সভিত্তিক একটি বিমান প্রস্তুতকারক কোম্পানি যাতে ফ্রান্সের এয়ারবাস ও ইতালির ফিনমেকানিকা কোম্পানির যৌথ মালিকানা রয়েছে।

ইরানের এই তৎপরতার কারণে বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন- ইরান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে নিজেকে দুবাইয়ের মতো সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।

ফ্রান্সের এয়ারবাস হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জেটলাইনার এবং এ কোম্পানির বিমান পারস্য উপসাগরের অন্য দেশগুলোও ব্যবহার করে থাকে। প্রথম ধাপেই এয়ারবাস কেনার বিষয়টি পছন্দ করে ইরান হয়ত এ বার্তা দিতে চেয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা থাকলেও তেহরানের গুরুত্ব উপেক্ষা করা যাবে না।

এ সম্পর্কে ইরানের পরিবহনমন্ত্রী আব্বাস আখুন্দি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “নিশ্চয় এটি আমাদের ঐতিহাসিক অবস্থান। আমরা সবসময় এ অঞ্চলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি কেন্দ্র হিসেবে ছিলাম।”

বিমানখাতে ইরানের বিপুল বিনিয়োগের কারণে আরেকটি কৌশলের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সেটি হচ্ছে- আন্তর্জাতিক মানের বিমান যোগাযোগের কেন্দ্রস্থল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তেহরানের সামনে যদিও কিছু সামাজিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে তারপরও আঞ্চলিক দেশগুলোর পাশাপাশি ইরান তার যোগাযোগ শিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

এ সম্পর্কে ইরানের জাতীয় এয়ারলাইন্স ‘ইরান এয়ার’র চেয়ারম্যান ফরহাদ পারভারেশের বরাত দিয়ে রয়টার্স একটি প্রতিবেদন করেছে। এত পারভারেশ বলেন, “আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের এয়ারলাইন্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিল। সে কারণে আমরা আবার আমাদের পরিপূর্ণ ভূমিকা পালনের চেষ্টা করব।”

ফ্রান্স ও অন্য দেশের সঙ্গে করা চুক্তির আওতায় যেসব বিমান আসবে তার সবই যে ইরানের জাতীয় এয়ারলাইন্সে ব্যবহার করা হবে তা নয়; তারপরও জাতীয় পতাকাবাহী ইরান এয়ারকে যে প্রাধান্য দেয়া হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

হ্যা, ইরান চাইলেই দ্রুত আন্তর্জাতিক অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে আগে তেহরানকে সবার আগে বিমানের অভ্যন্তরীণ ব্যস্ত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। এর পাশাপাশি ইরান অভিমুখী পর্যটন ও বাণিজ্যের ব্যস্ততা গড়ে তুলতে হবে অনেক বেশি।

পারভারেশ রয়টার্সকে বলেছেন, “ফ্রান্সের সঙ্গে যে চুক্তি হয়েছে সে চুক্তির আওতায় এয়ারবাসের চালান এসে পৌঁছাতে সময় লাগবে আরো অন্তত পাঁচ বছর। তার আগে আমাদেরকে তেহরানের ইমাম খোমেনী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সংস্কার ও বিস্তারের কাজ ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।”

ইরানি মার্কেটে বিদেশিদের নজর:

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আরব দেশগুলো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও স্মার্ট বিমানসেবা গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে দুবাইভিত্তিক এমিরেটস এয়ারলাইন্সের কথা না বললেই নয়। এটি যেমন কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তেমনি বিশ্বের দুই তৃতীয়াংশ জনগণের কাছাকাছি দুবাইয়ের অবস্থান যেখান থেকে চার হতে আট ঘণ্টার মধ্যে তাদের নিজ নিজ দেশে পৌঁছে দেয়া সম্ভব। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এ বিমান সেবার সামনে এখন একমাত্র মারাত্মক চ্যালেঞ্জ তুর্কি এয়ারলাইন্স। কিন্তু ইরান স্বল্প ও দীর্ঘপাল্লার বিমান কেনার যে চুক্তি করেছে তাতে মনে হচ্ছে তুরস্ক সে চ্যালেঞ্জ থেকে দ্রুতই ছিটকে পড়বে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, গত মাসে তেহরানে আন্তর্জাতিক বিমান গবেষণা বিষয়ক থিংকট্যাংক CAPA’র সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাতে বিশ্বের বহু দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
ইরানের বিমান যোগাযোগ গড়ে তোলা সম্পর্কে CAPA’র চেয়ারম্যান পিটার হার্বিসন বলেন, “পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে আরব দেশগুলো কার্যকরভাবে যে বিমানসেবা নেটওয়ার্কে গড়ে তুলেছে তাতে অবশ্যই অংশ নিতে চায় ইরান এয়ার। ভৌগোলিকভাবে ইরান খুব চমৎকার অবস্থানে রয়েছে। অবশ্যই আমরা চাইব কয়েক বছর মধ্যে ইরান সে পর্যায়ে চলে আসুক কিন্তু সত্যিকার অর্থে সে পর্যায়ে যেতে অন্তত ১০ বছর লাগবে।”

এর আগেই ইরানকে হয়ত নিজের মার্কেটে প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হবে। কারণ বিদেশি এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলো আট কোটি জনসংখ্যার দেশ ইরানে আসার বিষয়ে দৃষ্টি দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন এসোসিয়েশন IATA ধারণা করছে, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রীর সংখ্যা ২০৩৪ সালের মধ্যে এখনকার চেয়ে তিনগুণেরও বেশি বেড়ে চার কোটি ৪০ লাখে দাঁড়াবে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ বিমানযাত্রীর সংখ্যা এক কোটি ২০ লাখ।

তেহরানে অনুষ্ঠিত CAPA সম্মেলনে বিমান লিজ প্রদানকারী কোম্পানি অ্যাভোলোনের স্ট্র্যাটেজি চিফ ডিক ফোর্সবার্গ বলেছেন, “ইরানের এয়ারলাইন্সগুলো যখন তাদের সক্ষমতা বাড়াবে তখন পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিমানবন্দরের ভিড় এড়াতে আঞ্চলিক বিমান কোম্পানিগুলোর অনেকেই এদিকে চলে আসবে।” তখন তাদের মোকাবেলা করা ইরানের বিমান সংস্থাগুলোর জন্য বেশ কঠিন হবে। CAPA বলছে, এখনই বিদেশি ২৮টি এয়ারলাইন্স ইরানে কাজ করছে এবং নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় আরো অনেকে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

CAPA’র এ বক্তব্যের জবাবে ইরান এয়ারের চেয়ারম্যান পারভারেশ বলেছেন, “প্রতিযোগিতা করার বিষয়ে আমরা মোটেই ভীত নই। বেশিরভাগ এয়ারলাইন্সের সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং কোনো ধরনের সমস্যা নেই। আমি মনে করি, ইরানি জনগণের বেশিরভাগই প্রধানত চাইবে ইরান এয়ার ব্যবহার করতে।”

পারভারেশ আরো জানিয়েছেন, ইরান এয়ার শিগগিরি কানাডার টরেন্টো শহরে বিমানের ফ্লাইট চালু করবে। এ শহরে অন্তত ৫০ হাজার ইরানি নাগরিকের বসবাস রয়েছে।

বিমান যোগাযোগের নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ইরানের এই উচ্চাভিলাসি পরিকল্পনা সম্পর্কে এ অঞ্চলের প্রধান দুই বিমান কোম্পানি এমিরেটস ও কাতার এয়ারওয়েজ কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে।

তবে আবুধাবির কোম্পানি ইতিহাদ বলেছে, তারা সবসময় প্রতিযোগিতাকে স্বাগত জানায়। এখন শুধু অপেক্ষার পালা- ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর তেহরান কতটা দক্ষতার সঙ্গে এ খাতে বিনিয়োগ করতে পারে এবং ইরানকে কতটা যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে করতে সক্ষম হয়। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না- ইরানকে এ শিল্পে উন্নত অবস্থান তৈরি করতে হলে যেমন বিশাল দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে তেমনি বিদেশিদের জন্যও বিরাট একটা অংশের ছাড় দিতে হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরানের রাষ্ট্রীয় নীতি কী হবে তা অবশ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে।

এমএম