নিলুফা বেগম। থাকেন সাভারের রাজাশন এলাকার পলোয়ানপাড়ায়। স্বামী আর এক সন্তান নিয়ে তার সংসার। তার স্বপ্ন ছিল একমাত্র সন্তান রিফাত পাটওয়ারীকে (১০) ভালো স্কুলে লেখাপড়া করিয়ে মানুষের মতো মানুষ করবে। কিন্তু রানা প্লাজার ধসে তার সেই স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।

এখন ছেলের লেখাপড়া তো দূরের কথা, দুই বেলা দু’মুঠো ভাত ঠিকমতো খেতেও পায় না তারা। নিলুফা বেগম বলেন, তিনি রানা প্লাজার পঞ্চম তলায় ফ্যান্টম অ্যাপারেলসে কাজ করতেন। ভবন ধসে পড়ার সাড়ে ৯ ঘণ্টা পর উদ্ধারকারীরা তাকে উদ্ধার করে।

পিলারের নিচে চাপা পড়ে তার ডান পা অকেজো হয়ে গেছে। বিভিন্ন হাসপাতালে ৯ মাসের বেশি চিকিৎসা করিয়েছেন তিনি। চিকিৎসকরা তার ডান পা কেটে ফেলতে চাইলে তিনি সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তা কাটতে দেননি।

নিলুফা বলেন, সরকারের তরফ থেকে বিভিন্ন মেয়াদে তিন লাখ ৩০ হাজার টাকা ও সাধারণ জনগণ এবং অন্যান্য জায়গা থেকে আরও এক লাখ ৪৫ হাজার টাকাসহ মোট ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা পেয়েছেন। কিন্তু তার চিকিৎসায় খরচ করতে হয়েছে সাড়ে চার লাখ টাকা।

তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছি না। পায়ের ব্যথায় রাতে ঘুমাতে পারি না। এখন মনে হচ্ছে পা কেটে ফেললেই ভালো হতো। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সরকার যে টাকা দিয়েছে তা ফেরত নিয়ে যাক। তবুও আমার পা-টা ভালো করে দিক। কষ্টের কথা বলতে গিয়ে নিলুফা কেঁদে ফেলেন।

কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, স্বপ্ন ছিল একমাত্র ছেলেকে ভালো স্কুলে লেখাপড়া করাবো। কিন্তু এখন বাড়ির পাশে ‘বর্ণমালা’ নামে একটি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে সে। গত তিন মাস যাবৎ স্কুলের বেতন, কোচিং ফি বাকি পড়েছে। টাকার অভাবে দিতে পারছি না। ছেলের বাবা তৌহিদুল ইসলাম রিকশা চালিয়ে যা রোজগার করেন তা দিয়ে লেখাপড়া করাবো, সংসার চালাবো, নাকি নিজের পায়ের চিকিৎসা করাবো।

আশরাফুল ইসলাম সুজন (৩২)। কাজ করতেন রানা প্লাজার ষষ্ঠতলায় ইথার টেক্স কারখানায়। ভবন ধসে পড়ার দিন সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে উদ্ধারকারীরা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। শেষে সাভার সিআরপিতে চিকিৎসা করিয়েছেন তিনি।

আশরাফুল ইসলাম সুজন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, সরকারিভাবে ও বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে সাড়ে ৭ লাখ টাকা পেয়েছি। প্রথমে ফ্রি চিকিৎসা পেলেও হাসপাতাল থেকে রিলিজ করার পরে আবার হাসপাতালে রিকিৎসার জন্য গেলে টাকা দাবি করে। তবে টাকার অভাবে তিনি চিকিৎসা করাতে পারছেন না বলে জানান।

ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে আশরাফুল বলেন, প্রথমে মাথায় আঘাত পেয়ে পড়ে গিয়ে বাম হাতের ভিতরে রড ঢুকে বেরিয়ে যায়। পরে ভবনের একটি ভিম ভেঙে বাম পায়ের ওপর পড়ে। সে থেকেই বাম পা একেবারেই অচল। স্ক্র্যাচ ব্যবহার করে চলতে হচ্ছে। তিনি বলেন, হাসপাতাল থেকে বাসায় আসার পর আর কেউ খোঁজ নেয়নি।

স্ত্রী, দুই সন্তান আশামনি (১০) ও আব্দুল্লাহ আল মামুনকে (১৯ মাস) নিয়ে তার সংসার। থাকের সাভার পৌর এলাকার রেডিও কলোনির ভাটপাড়া মহল্লায়। মেয়ে আশামনি বাড়ির পাশে ভাটপাড়া মডেল স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ছে। কিন্তু টাকার অভাবে মেয়ের স্কুলের বেতন দিতে পারছি না। এমনকি স্কুলের একটি ‘ডায়েরি’ এখন পর্যন্ত কিনে দিতে পারিনি।

বাড়ির পাশে ছোট্ট একটি মুদি দোকান দিয়ে খুবই কষ্টে তাদের সংসার চলছে বলেও জানান তিনি। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজার বহুতল ভবন ধসে ১১ শতাধিক লোক নিহত হয়। আহত হয় অসংখ্য শ্রমিক।

এমআর