'এইডা ওর মনের সমস্য, ছাইড়া দিতে পারলে দিতে পারে কিন্তু দেয় না। গাঁজা ফেন্সিডিল সব কিছুই খায়, সিরিঞ্জও নেয়। এবার দিয়ে তিন বার হইলো এখানে দিছি। কোন লাভ হয় না। এখান থেকে নিয়ে গেলে দুই-তিন দিন ভালো থাকে। পরে আবার শুরু করে।'
কেন্দ্রিয় মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে একমাত্র ছেলে জসিমকে নিতে এসে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন মা জোৎস্না বেগম। ছেলে অতিরিক্তমাত্রায় মাদক গ্রহণ করায় দিয়েছিলেন মাদক নিরাময় কেন্দ্রে। এর আগেও দু’বার দিয়েছেনএখানে। তার ভাষায় ছেলে মাদক নিরাময় কেন্দ্রে থাকলে ভালোই থাকে। তবে এখান থেকে নিয়ে গেলে ক'দিনপর আবার মাদক গ্রহণ শুরু করে।
জোৎস্না বেগম জানান, জসিম বিয়ে করেছে তিন বছর হলো। ছোট একটি মেয়েও আছে তার। একটি সিকিউরিটি কোম্পানীতে কাজ করে সে। সেখান থেকে যে টাকা পায়,তাতেই তার সংসারচলে।
ছেলের মাদকাসক্তির তীব্রতা সম্পর্কে জোৎস্না বেগম টাইমনিউজবিডি'কে আরো জানান, 'ওর বাবা রিক্সা চালায়। মেয়ে আর বউ নিয়ে জসিম আলাদা থাকে। চাকরির টাকা দিয়ে ওর সংসার ভালোভাবে চলে। জসিমের কোন টাকা পয়সা আমাদের লাগে না। তারপরেও ওই টাকা দিয়ে মদ, গাঁজা, ফেন্সিডিল কিনবে। টাকা না থাকলে দেনা হবে,না হয় কিছু বিক্রি করবে।'
মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে নিয়ে যাওয়ার পর তিন থেকে চারদিন ভালো থাকে। পরে সঙ্গ দোষে আবার খাওয়া শুরু করে। গাঁজা, মদ, ফেন্সিডিল খাওয়া অতিরিক্ত পরিমাণে বেড়ে যায়। সিরিঞ্জ নেয়। মাদক না নিতে পারলে উল্টাপাল্টা শুরু করে। বউ সন্তানের কোন খোঁজ রাখে না। একমাত্র ছেলে জসিমের মরণ নেশার কথা বলতে বলতে কেঁদেই ফেললেন মা জোৎস্না বেগম।
শুধু জসিমই নয়। মাদকের এই মরণ ছোবলতরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে এটা পৌঁছে গিয়েছে সমাজের বিভিন্ন স্তরে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ঢাকা অঞ্চলের সহকারি পরিচালক (এডি) মনজুরুল ইসলাম টাইমনিউজবিডি'কে বলেন,গ্রামের থেকে শহরেই মাদকের ব্যাবহার বেশি।কারণ হিসেবে তিনি অতিরিক্ত আধুনিকতাকেইদায়ি করেন।
তার মতে অতিরিক্ত আধুনিকতার ফলে সামাজিকতা বিলীন হয়ে যাচ্ছে। উচ্চ ফ্যামিলির ছেলে মেয়েরা কে কোথায় যাচ্ছে অভিভাবকেরা কোন খোঁজ রাখে না। তাদের টাকা পয়সারও কোন আভাব নেই। ফলে তারা সঙ্গ দোষে খারাপ পথেই টাকা ব্যয় করে।
তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তার ধারণা মাদক সেবনের সাথে নতুন প্রজন্ম, উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীএবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরাই বেশেই জড়িত।
সরেজমিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায় প্রকাশ্যেই চলছে মাদকদ্রব্য বিক্রি ও সেবন। বিশেষ একটি সিন্ডিকেট উক্ত এলাকা মাদকদ্রব্য বিস্তারে কাজ করে যাচ্ছে। সূত্রে জানা যায়, ওই বিশেষ সিন্ডিকেটের পাশাপাশি আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরাও জড়িয়ে পড়ছে ইয়াবা, গাঁজা, মদ, ফেনসিডিল এমনকি হেরোইন সেবন ও কেনা-বেচার। ফলে শিক্ষার্থীরাও দিনদিন মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাবির আশপাশ এলাকার অবস্থা এমনই হয়েছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিন, কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি, টিএসসি, কলাভবন, সায়েন্স এনেক্স ও কার্জন হলে অহরহই মিলছে ফেনসিডিলের বোতল।
জানা যায়, মাদক সেবনের সবচেয়ে বড় স্থান হচ্ছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ক্যাম্পাসের মাদকসেবীদের কাছে সেটি ‘পার্কের গেট’ নামে পরিচিত। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরে লেক, ভাস্কর্য ও বাংলা একাডেমির বিপরীত দিকের স্থানটি ইয়াবা সেবনের নিরাপদ জোনে পরিণত হয়েছে। মাদক সেবনের দ্বিতীয় স্থান চারুকলার বিপরীত দিকের ছবির হাট। ছবিরহাট থেকে শিখা চিরন্তন এলাকা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় মাদক সেবন ও বিক্রি হয়। এছাড়া ক্যাম্পাসের হাকিম চত্বর, মলচত্বর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, মুহসিন হলের মাঠ, ভাস্কর্য এলাকা, জগন্নাথ হলের মাঠ, শহীদ মিনার এলাকায় মাদক কেনাবেচা ও সেবন হয়।
এছাড়া সরেজমিনে দেখা যায়, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে প্রকাশ্যেই চলছে মাদক ছেবন। সন্ধ্যার পর অনেক স্থানে মাদকের হাট বসে। মাদক ব্যবসায়ীদের প্রধান ক্রেতা হলো উঠতি বয়সীরা তথা যুব সমাজ। তারা প্রতিনিয়ত ইয়াবা, ফেন্সিডিল, হেরোইন, গাঁজা ও পেথডিন এ যুব সমাজের কাছে বিক্রি করে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।
জানা গেছে, পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটা স্থানে সন্ধ্যার পর মাদক বিক্রি অনেকটাই ওপেনসিক্রেট হয়ে গেছে। সূত্রাপুর, কদমতলী, গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর ও যাত্রাবাড়ী থানার কিছু স্পটে প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি এবং সেবন করা হয়। এ এলাকায় মাদকের সবচেয়ে বড় স্পট সূত্রাপুর থানার পাশেই রয়েছে। এর মাত্র ১০০ গজ সামনে লোহার পুলের ঢালে ১২টি স্পট আছে। সিলসিলা নামে এক মহিলা এসব স্পট চালায়।
প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকেএখানে হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা ও নেশাজাতীয় ইনজেকশন মেলে। সিটি অয়েল মিলের সামনের বাগানে বসে নেশাখোরদের আড্ডা। ডিস্টিলারি রোডে সন্ধ্যা হলেই ভ্রাম্যমাণ টোকাই নেশার দ্রব্য ফেরি করে বিক্রি করে।
এছাড়া রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন, কারওয়ান বাজার রেল লাইন বস্তি এমনকি সৌন্দর্য মন্ডিত হাতিরঝিলেও চলছে প্রকাশ্যে মাদক সেবন ও রমরমা ব্যাবসা।
মাদকের এই প্রকটতা নির্মুল সম্পর্কে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক (ডিজি) মো. বজলুর রহমান বলেন, ‘রাজধানীসহ সারাদেশে নিয়মিতভাবে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ইয়াবার আগ্রাসন বন্ধ করা। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমরা মিয়ানমার থেকে আসা বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি।
প্রতি বছর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণঅধিদপ্তর একটি বৎসরিক প্রতিবেদন তৈরি করে। যেখানে তাদের অধীনে কি পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার হয়েছে তার একটি জরিপ প্রকাশ করে থাকে। ২০১৪ সালের জরিপে তারা বলছে প্রতিবছরই মাদকের ব্যাবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সাথে উদ্ধারের পরিমানও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণঅধিদপ্তরের ২০১৪ সালের ওই জরিপে বলা হয়েছে এবছর শুধু ইয়াবাই উদ্ধার হয়েছে৬৫ লাখ ১২ হাজার ৮৬৯ পিস। ২০০৮ সালে যার সংখ্যা ছিলো ৩৬ হাজার ৫৪৩ পিস। ইয়াবার এই অবিশ্বাস্য হারে বৃদ্ধি পাওয়া গত সাত বছরের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণঅধিদপ্তরের দেয়া হিসাব মতে,তারা গাঁজা উদ্ধার করেছে ৪ হাজার ৫৫১ কেজি ২৮১ গ্রাম, হেরোইন ৯ কেজি ৫১০ গ্রাম এবং ৩২ হাজার ৯৯০ বোতল ফেন্সিডিল উদ্ধার করেছে।
সরকারি পর্যায়ে চিকিৎসাপ্রাপ্ত মাদকাসক্ত রোগীর পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে,মোট রোগীর সংখ্যা ১০ হাজার ৩৬৪ জন। যার মধ্যে পুরাতন রোগী ৫ হাজার ৩৯৬ জন এবং তার সাথে নতুন যোগ হয়েছে ৪ হাজার ৯৬৮ জন।
এছাড়া ২০১৪ সালে বেসরকারি পর্যায়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসাপ্রাপ্ত মাদকাসক্ত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৯৬৮ জন।
মাদকের প্রকটতা এবং এর প্রতি উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের ঝুঁকে পড়ার কারণ সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধতত্ব (Criminology) বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. জীয়া রহমান টাইমনিউজবিডি'কে বলেন, এর প্রধান কারণহচ্ছে বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের দেশে একটা বড় ধরণের সামাজিক এবং সম্পর্কগত পরিবর্তন আসছে। মাদকের ব্যাবহার এখন আন্তর্জাতিক ভাবে সোস্যাল মিডিয়া এবং ইন্টারনেটে ব্যাপক আকারে প্রকাশ পাচ্ছে। যারফলে তরুণ-তরুণীরা অতিরিক্ত আধুনিকতার আদলে এটাকে গ্রহণ করছে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় তরুণ-তরুণীদের সম্পর্কগত পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন, আগে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে যে প্রেমের সম্পর্ক ছিলো সেটা সামাজিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। এখন সেটাতে জৈবিকতা চলে এসেছে। অতিরিক্ত আধুনিকতা চলে আসার ফলে সম্পর্কগত ভাবে অথবা সঙ্গদোষে তারা মাদক নিচ্ছে।
প্রযুক্তিকে দায়িকরে তিনি বলেন, আমরা ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে তাদের খেলার মাঠ কেড়ে নিচ্ছি। যার ফলে তারা ইন্টারনেটে বসে বিভিন্ন পর্নোগ্রাফী, মাদকের ব্যাবহার দেখছে এবং অগাধ টাকা পয়সা থাকার ফলে তারা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে মেলামেশা করছে। যারফলে তারা মাদকের প্রতি বিভিন্ন ভাবে আসক্ত হচ্ছে।
এটা থেকে প্রতিকারের জন্য মাদক বিরোধীসংগঠন, সামাজিক সংগঠন এবং সরকারের বিভিন্ন সচেতন মূলক উদ্যোগকে আরো বৃদ্ধি করতে হবে বলে তিনি মানে করেন।
তিনি বলেন, আধুনিকতার সাথে তালমিলিয়ে আমাদের সমাজ এগিয়ে যাক এটা আমরা সবাই চাই। তবে আমাদের দেশে এখন একটা অন্তর্বর্তিকালিন সময় পার হচ্ছে। এই সময়টা খুবই খারাপ। নতুন মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নতুন নতুন কর্মপন্থা অবলম্বন করা দরকার। পাশাপাশি সকলের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং ছেলে-মেয়েদের খেলার মাঠের পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতি আকর্ষণবাড়াতে হবে।
এমআর/ এআর





