মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মোট ২০ টি অভিযোগ আনেন রাষ্ট্রপক্ষ।
এর মধ্যে ২ দুইটি অভিযোগে তাকে গত ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মৃত্যুদন্ড প্রদান করে। অন্য ৬ টি অভিযোগে সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
বাকি ১২ টি অভিযোগে তাকে খালাস দেওয়া হয়। সুপ্রিমকোর্টের ৫০ কার্যদিবসে আপিল শুনানির পর ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ৮ টি অভিযোগের ভিত্তিতে চুড়ান্ত রায় প্রদান করেছে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ।
বুধবার প্রধান বিচারপতি মো: মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের আপিল বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে সকাল ১০টা ৭ মিনিটে সংক্ষিপ্তভাবে এ রায় দেন। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা,বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা,বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
আপিলে ৩ অভিযোগে আমৃত্য কারাদন্ড: আপিল বিভাগের আজকের রায়ে সাঈদীকে ১০,১৬ ও ১৯ নং অভিযোগে আমৃত্য কারাদন্ড প্রদান করেছেন।
১০ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে,২ জুন ১৯৭১ সাল সকাল ১০টার দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে তার সশস্ত্র সহযোগীরা ইন্দুরকানি থানার উমেদপুর গ্রামের হিন্দুপাড়ার হানা দিয়ে ২৫টি ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এসব বাড়ির মালিকেরা হলেন, চিত্তরঞ্জন তালুকদার, হরেণ ঠাকুর, অনিল মণ্ডল, বিসা বালি, সুকাবালি, সতিশ বালা প্রমুখ। সাঈদীর ইন্ধনে তার সহযোগীরা বিসা বালিকে নারকেল গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে হত্যা করে।এই অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল কিন্তু কোন সাজা দেয়নি আপিল বিভাগ এই অভিযোগে তাকে আমৃত্য কারাদন্ড দিয়েছেন।
১৬ নং অভিযোগে বলা হয়েছে, সাঈদীর নেতৃত্বে ১০-১২ জনের রাজাকার দল পারেরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ি থেকে তার তিন বোন মহামায়া, অন্ন রানী ও কমলা রানীকে ধরে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যায়।
সেখানে তিন দিন ধরে ধর্ষণ করে পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।এই অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল কিন্তু আপিল বিভাগ এই অভিযোগে আমৃত্য কারাদন্ড দিয়েছেন।
১৯ নং অভিযোগে বলা হয়েছে,সাঈদী প্রভাব খাটিয়ে পারেরহাটসহ অন্য গ্রামের ১০০-১৫০ জন হিন্দুকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তর করে। তাদের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে বাধ্য করতো। এই অভিযোগেও ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল কিন্তু আপিল বিভাগ এই অভিযোগে আমৃত্য কারাদন্ড দিয়েছেন।
যে অভিযোগে ১২ বছর কারাদন্ড:
সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত ৮ নম্বর অভিযোগে অংশ বিশেষে খালাস ও অংশ বিশেষে ১২ বছর কারাদন্ড প্রদান করেছে।
এই অভিযোগে বলা হয়েছে,১৯৭১ সালের ৮ মে বেলা ৩টায় সাঈদীর নেতৃত্বে তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়তায় সদর থানার চিতলিয়া গ্রামের মানিক পসারির বাড়িতে হানা দিয়ে তার ভাই মফিজ উদ্দিন এবং ইব্রাহিমকেসহ দুই ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যান।
সেখানে পাঁচটি বাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।সেনা ক্যাম্পে ফেরার পথে সাঈদীর প্ররোচণায় ইব্রাহিমকে হত্যা করে লাশ ব্রিজের কাছে ফেলে দেয়া হয়।মফিজকে ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করা হয়।
পরে সাঈদী ও অন্যদের আগুনে পারেরহাট বন্দরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।এই অভিযোগে অবশ্য ট্রাইব্যুনাল সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেছিল।
যে অভিযোগে ১০ বছর কারাদন্ড: ৭ নং অভিযোগে সাঈদীকে ১০ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে।
এই অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ৮ মে ১৯৭১ সালে বেলা দেড়টায় সাঈদী তার সশস্ত্র সাঙ্গপাঙ্গ ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে সদর থানার ভাদুরিয়া গ্রামের নুরুল ইসলাম খানের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম সেলিমের বাড়িতে হানা দেন।
সেখানে নুরুল ইসলাম খানকে আওয়ামী লীগ নেতা হিসাবে চিনিয়ে দেন সাঈদী। পরে তিনি তাকে আটক করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেন, যারা তাকে নির্যাতন করে।
যে ৩ অভিযোগে খালাস পেলেন: সাঈদীকে বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনীত ৬,১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ৭ মে সাঈদীর নেতৃত্বে একদল শান্তি কমিটির সদস্য পিরোজপুর সদরের পারেরহাটে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ওই এলাকায় স্বাগত জানান।
তাদেরকে পারেরহাট বাজারে নিয়ে এসে সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতা, হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন এবং স্বাধীনতার স্বপক্ষের মানুষদের বাড়িঘর ও দোকান পাট চিনিয়ে দেন সাঈদী। পরে সাঈদী অন্যান্যদের সঙ্গে এ সকল বাড়ি ও দোকানে হানা দিয়ে মূল্যবান সম্পদ লুট করে। যার মধ্যে সেখানে মুকুন্দ লাল সাহার দোকান থেকে বাইশ সের স্বর্ণ ও রৌপ্য লুট করেন সাঈদী।
১১ নং অভিযোগে বলা হয়েছে,২জুন সাঈদীর নেতৃত্বে শান্তি কমিটি ইন্দুরকানি থানার টেংরাখালী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে যান।
সেখানে সাঈদী তার বড় ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদারকে ধরে নির্যাতন করেন। এরপর সাঈদী নগদ টাকা, অলঙ্কারাদি ও মূল্যবান জিনিস নিয়ে যান।
১৪ নং অভিযোগে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সাঈদীর নেতৃত্বে ৫০-৬০ জনের একটি রাজাকার বাহিনী হোগলাবুনিয়ার হিন্দুপাড়ায় যায়। রাজাকারদের আগমন দেখে গ্রামের অধিকাংশ হিন্দু নারী পালিয়ে যান।
কিন্তু মধুসূদন ঘরামীর স্ত্রী শেফালী ঘরামী ঘর থেকে বের হতে পারেননি। তখন সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকাররা তাকে ধর্ষণ করেন। এর ফলে স্বাধীনতার পর তিনি একটি কন্যা সন্তান প্রসব করেন। এ নিয়ে গ্রামে বিভিন্ন কথা ওঠায় শেফালী ঘরামী দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন। পরে এই হিন্দুপাড়ার ঘরে আগুন দেওয়া হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল প্রতিক্রিয়া:
রায় ঘোষণার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজ কাযালয়ে সাংবাদিকদের বলেছেন,সাঈদীর মামলায় রিভিউ চলবে না। আব্দুল কাদের মোল্লার রায়ের মধ্য দিয়ে আপনারা দেখেছেন এসব মামলায় রিভিউ চলে না।
আরও বলেন,এ রায়ে আমরা সন্তোষ প্রকাশ করতে পারছি না। তবে সব মামলার রায়তো আর পছন্দমতো হবে না। পূর্ণাঙ্গ রায়ের সার্টিফাইট কপি হাতে পাওয়ার পর আমরা পরবর্তী আইনী পদক্ষেপে যাবো।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে জবাবে মাহবুবে আলম বলেন,কনডেম সেলে নয়,মাওলানা সাঈদীকে এখন আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশ প্রাপ্তদের সেলেই রাখা হবে। মাওলানা সাঈদীকে এখন থেকে নারী নির্যাতনকারী ও ধর্ষণকারী হিসেবে বেঁচে থাকতে হবে। ওয়াজ মাহফিল করলেও এ রায়ের মাধ্যমে সাঈদীর মুখোস উন্মোচিত হয়েছে।
উল্লেখ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত (২০১৩) বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদন্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। সাঈদীর বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগে চার্জ গঠন করেছিল ট্রাইব্যুনাল।
এরমধ্যে ৮টি অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং ১২টিতে তাকে খালাস দেয়া হয়। এ রায়ের বিরুদ্ধে ২৮ মার্চ সাঈদী ও রাষ্ট্রপক্ষ পৃথক দু’টি আপিল দাখিল করে। যে সব অভিযোগ থেকে সাঈদীকে খালাস দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল সে অভিযোগ গুলোতে আপিলে দন্ডের আর্জি জানিয়েছিল রাষ্ট্রপক্ষ।
ঢাকা, কেএ,১৭ সেপ্টেম্বর, টাইমনিউজবিডি.কম, এসএইচ





