প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি গুয়ামের (Guam) কাছে চারটি ক্ষেপনাস্ত্র (missile) নিক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে উত্তর কোরিয়া। খুব শিগগিরই এই প্রস্তুতি সম্পন্ন হবে বলে দাবি করছে পিয়ংইয়ং। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তীব্র বাকযুদ্ধের মধ্যেই এমন ঘোষণা আসলো কোরিয়ার পক্ষ থেকে।

কোরিয়ার সরকারী সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট কিম জং-উন (Kim Jong-un) অনুমতি দিলে হুয়াসং-১২ (Hwasong-12) নামের ওই রকেটগুলো নিক্ষেপ করা হবে যা জাপানের ওপর দিয়ে উড়ে প্রশান্ত মহাসাগরে পড়বে, যেখান থেকে গুয়াম ঘাঁটি মাত্র ৩০ কিলোমিটার বা ১৭ মাইল দূরে।

এর আগে ভয়াবহ পরিণতি (fire and fury) ভোগ করতে হবে মর্মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তার নিন্দা জানায় উত্তর কোরিয়া। দেশটির পক্ষ থেকে উল্টো আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে “যুক্তিহীন অন্তঃসারশূন্য” (bereft of reason) বলেও আখ্যায়িত করা হয়।

সতর্কবার্তায় আমেরিকা অবশ্য এমনও বলেছে যে তাদের পদক্ষেপ বা অ্যাকশানের পরিণাম এটাই হতে পারে যে উত্তর কোরিয়ার বর্তমান শাসনের অবসান ঘটবে (end of its regime)।

আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাট্টিস (Jim Mattis) উত্তর কোরিয়াকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও এর সহযোগিদের সাথে যে কোন যুদ্ধে পিয়ংইয়ং সম্পূর্ণরুপে পর্যুদস্ত (grossly overmatched) হবে।

গুয়াম দ্বীপে অবস্থানরত বিবিসির সংবাদদাতা রুপার্ট উইংফিল্ড-হাইয়েস (Rupert Wingfield-Hayes) বলেছেন, সেখানকার বাসিন্দারা উত্তর কোরিয়ার হুমকিকে কেবলই বুলিসর্বস্ব (rhetorical) হিসেবেই বিবেচনা করছেন। কারণ তারা বিশ্বাস করেন উত্তর কোরিয়া যদি সত্যিই সেখানে ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করে সেটা হবে দেশটির জন্য আত্মহত্যার শামিল।

উত্তরের পরিকল্পনা কি?

গত বুধবারই প্রথম উত্তর কোরিয়া ঘোষণা দিয়েছিল যে তারা গুয়ামে ক্ষেপনাস্ত্র হামলার পরিকল্পনা করছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই দ্বীপটি মূলত আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বাহিনী ও বোমারু বিমানের একটি কৌশলগত ঘাঁটি এবং এখানে প্রায় ১ লাখ ৬৩ হাজার মানুষের বসতি।

পরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেয়া আরেক বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়া জানায় তাদের সামরিক বাহিনী মধ্য আগস্টের মধ্যে হামলা চালানোর ব্যাপারে সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে ফেলেছে। এখন তারা এটি তাদের নেতা কিম জং উনের কাছে অনুমতির জন্য পাঠাবেন।

সেনাবাহিনীর প্রধান কিম রাক গাইয়ুম (Kim Rak Gyom) এর বরাত দিয়ে উত্তর কোরিয়ার সরকারী বার্তা সংস্থা কেসিনা (KCNA) জানায়, হুয়াসং – ১২ রকেট কোরিয়ান সেনারা নিক্ষেপ করবে যা জাপানের সিমানি (Shimane), হিরোশিমা (Hiroshima) ও কোইচি (Koichi) অঞ্চলের আকাশ দিয়ে যাবে।

সেনাপ্রধান আরো জানান, নিক্ষিপ্ত ক্ষেপনাস্ত্রগুলো ৩৩৫৬.৭ কিলোমিটার অতিক্রম করবে। আর এতে সময় লাগবে ১০৬৫ সেকেন্ড। অর্থাৎ - এই রকেটের গতি হবে প্রতি সেকেন্ডে ৩ কিলোমিটারেরও বেশি। ক্ষেপনাস্ত্রগুলো সাগরের যেখানে গিয়ে পড়বে তা গুয়াম দ্বীপ থেকে মাত্র ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে।

উল্লেখ্য, হুয়াসং -১২ ক্ষেপনাস্ত্র উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব তৈরি মাঝারি ও দূরপাল্লার রকেট। উত্তর কোরিয়া সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই অস্ত্র তৈরি করেছে।

আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া

এদিকে, ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ বিষয়ে বৃহস্পতিবার দেয়া উত্তর কোরিয়ার বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় গুয়াম দ্বীপের গভর্নর এদিয়ে কেলভো (Eddie Calvo) আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, উত্তর কোরিয়া হঠাৎ হঠাৎ অঘটন ঘটাতে পারদর্শী। অতীতেও তারা বহুবার আকস্মিকভাবে ক্ষেপনাস্ত্র উৎক্ষেপণ করেছে।

গভর্নর আরো বলেন, “ আসলে তারা বিষয়টি একটু আগ থেকে বাজিয়ে নিলো যাতে পরবর্তীতে কোন ভুল বোঝাবুঝি না হয়। আমার মনে হয় তারা একটু ভয়ের মধ্যেই আছে”।

এদিকে, জাপান সরকারের মুখপাত্র ইয়োশিহাইড সুগা (Yoshihide Suga) এক বিবৃতিতে বলেন, পিয়ংইয়ংয়ের এই তৎপরতা আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে। এটা জাপানের নিরাপত্তার জন্য যেমন হুমকি তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

উত্তর কোরিয়াকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে জাপানি মুখপাত্র আরো বলেন, তারা এ ধরনের কর্মকাণ্ড কখনো সহ্য করবেন না।

জাপানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী সুনোরি ওনোদেরা (Itsunori Onodera) বলেন, জাপানের ওপর দিয়ে উত্তর কোরিয়া কোন ক্ষেপনাস্ত্র নিক্ষেপ করলে তাতে বাধা দেয়া হবে। কারণ এটা জাপানের জাতীয় অস্তিত্বের প্রতি হুমকি।

এছাড়া জাপানের বর্তমান আইন অনুযায়ী দেশটি আমেরিকাসহ অন্য সহযোগীদের প্রতিরক্ষায় সহায়তা করতে পারবে। আগে অবশ্য কেবলমাত্র নিজ ভূখন্ডের দিকে ছুটে আসা ক্ষেপনাস্ত্র ভূপাতিত করার অনুমতি ছিল জাপানের।

অপরদিকে, দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাবাহিনী বলছে, অতি দ্রুত যে কোন ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের সব প্রস্তুতি তারা এরই মধ্যে নিয়ে রেখেছেন।

দক্ষিণ কোরিয়া সেনাবাহিনীর যুগ্ম মুখপাত্র রোহ জাই-চিয়েন (Roh Jae-cheon) বলেন, তাদের সেনাবাহিনীর কড়া সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে উত্তর কোরিয়া উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কোন কর্মকাণ্ড করলে আমাদের সেনা এবং আমেরিকা-দক্ষিণ কোরিয়া জোট তার সমুচিত জবাব দেবে।

এদিকে, এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহত শক্তির মধ্যে অন্যতম চীন পরিস্থিতিকে জটিল ও অত্যন্ত স্পর্শকাতর আখ্যায়িত করে উত্তর কোরিয়াকে শান্ত থাকার পরামর্শ দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যেভাবে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়া পরস্পরবিরোধী অবস্থানে চলে যাচ্ছে এবং তাতে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে তা শেষমেষ বিশ্বযুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে। রাশিয়া ও চীন কিছুটা কৌশলী ভূমিকায় থাকলেও যুদ্ধ বেঁধে গেলে এই দুই দেশ যে উত্তর কোরিয়াকেই ভেতরে ভেতরে সমর্থন দেবে সে ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত অনেকেই। এমনই পটভূমিতে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধ কি আসন্ন? এই প্রশ্নই এখন বিশ্বজুড়ে। তবে, আলোচনার টেবিলেই বিষয়টির সুরাহা হোক সেটাই সবার কামনা।

আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া বাকযুদ্ধ

উত্তর কোরিয়াকে চরম পরিণতি ভোগের হুঁশিয়ারি দিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মঙ্গলবারের বার্তাকে “আহাম্মকের আস্ফালন” (a load of nonsense) বলে আখ্যায়িত করেছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির সরকারী গণমাধ্যমের খবরে এমনটি বলা হয়।

খবরে আরো বলা হয়, উত্তর কোরিয়া মনে করে যে এরকম উদ্মাদ ও কান্ডজ্ঞানহীন (bereft of reason) ব্যক্তির (ট্রাম্প) সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সংলাপ সম্ভব নয়। কঠোর শক্তি প্রয়োগই তার জন্য উপযুক্ত।

দিশেহারা গুয়ামবাসী

এদিকে, ক্রমাবনত পরিস্থিতির মধ্যেই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ম্যাট্টিস গত বুধবার এক বিবৃতিতে পিয়ংইয়ংকে তার অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করার আহবান জানান।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক দেশ কোরিয়াকে অবশ্যই নিজেকে একঘরে করে রাখার নীতি থেকে সরে আসতে হবে এবং পরমানু অস্ত্র কর্মসূচি বাদ দিতে হবে।

উত্তর কোরিয়াকে সতর্ক করে দিয়ে তিনি আরো বলেন, আমাদের পররাষ্ট্র দপ্তর এই বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকিস্বরুপ অপতৎপরতা বন্ধে সব ধরনের কুটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু এটাও অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে আমাদের সম্মিলিত সামরিক জোট নিজেকে রক্ষা কিংবা শত্রুকে সমূলে ধ্বংসের ব্যাপারে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি দক্ষ।

এদিকে, আমেরিকার মজুদ পারমানবিক অস্ত্রের ব্যাপারে বুধবার রীতিমতো এক হুংকার ছাড়েন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নিউজার্সিসে অবকাশ সময় কাটানোর মধ্যেই এক টুইট বার্তায় ট্রাম্প বলেন, অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় আমেরিকার পারমানবিক অস্ত্রের মজুদ এখন অনেক বেশি শক্তিশালী।

ছোট্ট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ গুয়াম

ফিলিপাইন ও হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মধ্যে অবস্থিত ৫৪১ বর্গকিলোমিটার বা ২০৯ বর্গমাইলের আগ্নেয়গিরি ও প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ গুয়াম। প্রশান্ত মহাসাগরে এটির অবস্থান।

যদিও আমেরিকার মানচিত্রে এটি অন্তর্ভূক্ত নয়, কিন্তু আমেরিকার “নন-ইনকর্পোরেইটেড (non-incorporated)” অঞ্চল হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হয়। দ্বীপটিতে বসবাস করছেন ১ লাখ ৬৩ হাজার মানুষ।

গুয়ামে জন্মগ্রহণকারীরা আমেরিকার নাগরিক হিসেবেই গণ্য হন। তাদের একজন নির্বাচিত গভর্নর ও হাউজ রিপ্রেজেনটেটিভ রয়েছেন। কিন্তু আমেরিকার জাতীয় নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে তারা ভোট দিতে পারেন না।

এই দ্বীপের এক-চতুর্থাংশ স্থান জুড়ে রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। সেখানে প্রায় ৬ হাজার আমেরিকান সেনা রয়েছেন। এই ঘাঁটিতে আরো কয়েক হাজার সেনা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে দেশটির।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই দ্বীপটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। এখান থেকেই গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগর, কোরিয়া এবং তাইওয়ান অঞ্চলে অভিযান চালাতো যুক্তরাষ্ট্র। (সূত্র: বিবিসি)