গত ২৪ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীর অদূরে মিনার জামারাতে প্রতীকী শয়তানকে পাথর মারার আনুষ্ঠানিকতা পালনের সময় প্রচণ্ড ভিড়ের চাপে শত শত হাজি হতাহত ও বহু সংখ্যক হাজি নিখোঁজ হয়েছেন। এ ঘটনায় বিশ্বব্যাপী তোলপাড় চলছে এবং কোনো কোনো মুসলিম দেশ সৌদি আরবকে দায়ী করেছে।
তবে এর মধ্যে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান সবচেয়ে কঠোর ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছে। এ দুর্ঘটনার জন্য সরাসরি সৌদি সরকারকে দায়ী করেছে ইরান। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কেন ইরান এমন কঠোর নিন্দা ও প্রতিদবাদ জানাচ্ছে। এমন অপপ্রচারও ছড়ানো হয়েছে- পবিত্র মক্কা ও মদিনা দখল করতে চায় ইরান। প্রশ্ন হচ্ছে আসলে কী তাই? ইরান কী সত্যিই পবিত্র মক্কা-মদিনা দখল করতে চায়? আর কেনইবা ইরান এত কঠোর অবস্থানে গেছে? এসব প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার আগে জেনে নেয়া যাক সর্বশেষ হতাহতের খবর।
সর্বশেষ হতাহতের সংখ্যা:
সৌদি সরকার বৃহস্পতিবার যে তথ্য দিয়েছে তাতে দেখা যায় মিনা দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১,০৯৭। তবে তার একদিন আগে সৌদি সরকারের স্বাস্থ্য উপমন্ত্রী নিহতের সংখ্যা ৪,১৭৩ বলে জানিয়েছিলেন। অবশ্য, পরেই এ খবর অস্বীকার করে সৌদি সরকার। তবে, নাইজেরিয়া অভিযোগ করেছে- নিহত হাজির প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করছে না সৌদি আরব। সৌদি আরবে অবস্থানরত নাইজেরিয়ার এক সরকারি কর্মকর্তা বলেছেন, মিনায় নিহতের যে সংখ্যা সৌদি আরব ঘোষণা করেছে তা সঠিক নয়। নিহতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হবে। সৌদি আরবের বিভিন্ন মর্গ পরিদর্শনের পর তিনি এ মন্তব্য করেন।
নাইজেরিয়ার ওই নাগরিক বলেন- মিনায় নিশ্চিতভাবেই কয়েক হাজার হাজি নিহত হয়েছেন।সর্বশেষ খবর হচ্ছে ইরানের ১০৪ জন হাজির লাশ ৩ অক্টোবর শনিবার দেশে এসেছে। আরো কতগুলো লাশ রাতে ফিরবে বলে কথা রয়েছে। তেহরানের মেহরাবাদ বিমানবন্দরে লাশ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানিসহ দেশর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছেন ইরানের হাজি:
মিনার মর্মান্তিক ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ইরানের হাজি নিহত হয়েছেন। সৌদি আরবের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ইরানের হাজি নিহত হয়েছেন ৪৬৪ জন। এছাড়া, আহত হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন ২০ জন এবং ৬ জনকে ইরানে আনা হয়েছে। এর পরে রয়েছে আফ্রিকার দেশ মালি। এ দেশটির হাজি নিহত হয়েছেন ৭৯ জন। তারপর রয়েছে মিশর। মিশরের হাজি নিহত হয়েছেন৭৮ জন। অন্য দেশের মধ্যে রয়েছে আফগানিস্তান ২, আলজেরিয়া ১১, বাংলাদেশ ৪১, বুরুন্ডি ১, ক্যামেরুন ৪২, চীন ৪, বেনিন ১৭, বুরকিনাফাসো ১, ইথিওপিয়া ১৩, ঘানা ৮, ভারত ৫৬, ইন্দোনেশিয়া ৫৭, আইভোরি কোস্ট ১৪, জর্দান ১, কেনিয়া ৬, লিবিয়া ৮, মালয়েশিয়া ১, মরক্কো ১০, মিয়ানমার ৫, হল্যান্ড ১, নাইজার ২২, নাইজেরিয়া ৬৪, ওমান ১, পাকিস্তান ৫২, ফিলিপাইন ১, সেনেগাল ৭, সোমালিয়া ৮, শ্রীলংকা ২, সুদান ৯, তানজানিয়া ৬, তিউনিশিয়া ১ এবং তুরস্কের ৪ জন। মিনার দুর্ঘটনায় সৌদি হিসাব অনুযায়ী, ৯৩৪ জন আহত ও ১,৪০০ ব্যক্তি নিখোঁজ রয়েছেন।
মিনা ট্রাজেডির কারণ:
পর্যবেক্ষক, বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত সৌদি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও নানা ভুল পদক্ষেপ এবং অব্যবস্থাপনার কারণেই মিনায় ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে সৌদি রাজপুত্রের গাড়ি বহরের নিরাপত্তার জন্য মিনার কয়েকটি রাস্তা বন্ধ করে দেয়া এবং ভিড়ের চাপে আহতদের যথাসময়ে সরিয়ে নেয়া হয়নি। মারাত্মক আহতদের যথাসময়ে হাসপাতালে না নেয়া ও প্রচণ্ড গরমের মধ্যে পানি সরবরাহ না করার অভিযোগসহ নানা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগ তুলেছেন বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শী হাজিরা।
অনেক প্রত্যক্ষদর্শী জানিয়েছেন, সৌদি পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা মিনায় শয়তানের প্রতীকী স্তম্ভে পাথর মারার আনুষ্ঠানিকতার স্থান-সংলগ্ন অল্প কয়েকটি সড়কের মধ্যে দুটি সড়ক বন্ধ করে দেয়ার ভিড়ের চাপে পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এমনকি সৌদি নিরাপত্তা কর্মী ও সেনারা পদদলিত হওয়ার ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও ঘটনাস্থলের সঙ্গে যুক্ত সব সড়ক বন্ধ করে রাখে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
ক্রেন দুর্ঘটনা:
মিনার দুর্ঘটনার আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় প্রবল ঝড় ও বজ্রপাতের মধ্যে মসজিদুল হারামের ছাদে ক্রেন ভেঙে পড়লে অন্তত ১০৭ জন হাজী নিহত ও ২৩৮ জন আহত হন। এর মধ্যে ইরানের হাজি ছিলেন আটজন।
নিহত হয়েছেন ইরানের রাষ্ট্রদূত ও মহাকাশ বিজ্ঞানী:
মিনার দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন লেবাননে নযিুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত গাজানফান রোকনাবাদি। তাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন কূটনীতিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া, পবিত্র মক্কার মসজিদুল হারামে ক্রেন ভেঙে যে আটজন ইরানি হাজী নিহত হয়েছেন তার মধ্যে ইরানের একজন মহাকাশ বিজ্ঞানী রয়েছেন। নিহত অধ্যাপক ড. আহমাদ হাতামিইরানের মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্রের বোর্ড মেম্বার।
এছাড়া, বিশ্ব অঙ্গনে সাড়া-জাগানো ইরানি ক্বারী মোহসেন হাজহাসানি করগার মিনায় নিহত হয়েছেন। মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ৫৭ তম আন্তর্জাতিক কুরআন প্রতিযোগিতার তিলাওয়াত বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন ইরানের এ বিশ্বনন্দিত তরুণ ক্বারি। এছাড়া মিনার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ইরানের ইসলামী সঙ্গীত শিল্পী আমিন বাওয়ি।
এ কী বলছেন সৌদি রাজা!
সৌদি রাজা সালমান মিনায় হাজিদের পাথর মারার দৃশ্য সেদিনের ঘটনাবলীর সিসিটিভি রেকর্ড গোপন করার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম খবর দিয়েছে। আরবি ভাষার মিডল ইস্ট প্যানারোমার ওয়েব সাইট জানিয়েছে, ‘মিনা ট্র্যাজেডি ও তার কারণ সংক্রান্ত কিছু ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ার পর সৌদি রাজা এনির্দেশ দিয়েছেন।’
সিসিটিভি’র ভিডিও রেকর্ডগুলো গোপন করার নির্দেশের কারণ হলো- এ ঘটনায় শত শত হাজি নিহত হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশ ও হাজিদের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি ক্রমেই জোরদার হচ্ছে।
কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুমকি দিল ইরান:
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, সৌদি আরবের মিনায় শত শত হাজির যে মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে তাতে রিয়াদ সরকার তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। নিহতদের মৃতদেহ দ্রুত ইরানে ফেরত পাঠাতে ব্যর্থ হলে তেহরান কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে এবং ইরানের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য জবাব শক্ত ও কঠিন হবে।
তিনি বলেন, ইরান এ পর্যন্ত আত্মসংযম দেখিয়েছে, ইসলামি শিষ্টাচার দেখিয়েছে, মুসলিম দেশ হিসেবে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্মান দেখিয়েছে। কিন্তু তাদের জানা উচিত যে, অনেকের চেয়ে ইরানের শক্তি বেশি এবং সক্ষমতাও অনেক। ইরান যদি এই ‘অশুভ ও বিরক্তিকর উপদানাগুলো’র বিরুদ্ধে প্রতিক্রয়া দেখায় তাহলে তাদের পরিণতি ভালো হবে না। মিনার ঘটনায় দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি সৌদি সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, দুর্ঘটনায় আহতদের বিষয়েও সৌদি কর্মকর্তারা যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেননি।
মিনা দুর্ঘটনার বিষয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. হাসান রুহানি সৌদি আরবের প্রতি চাপ দিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেছেন, সৌদি আরবের মিনায় শত শত হাজি হতাহত হওয়ার ঘটনায় তেহরান রিয়াদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেবে।
ইরানের জাতীয় সংসদের স্পিকার মিনায় শত শত হাজি নিহতের জন্য সৌদি আরবকে মূল দায়ী বলে মন্তব্য করেছেন। ইরানি নিখোঁজ হাজিদেরকে চিহ্নিত করার কাজে ইরানের টিমগুলোকে সৌদি আরব সহযোগিতা না করায় দুঃখ প্রকাশ করে লারিজানি বলেন, “এ আচরণ কোনো আতিথেয়তা নয় বরং শত্রুতা। সৌদি সরকারের জানা উচিত- মুসলিম জাতিগুলো বিশেষ করে ইরানের জনগণ সৌদি আরবের এ আচরণ কখনো ভুলবে না।”
এদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল ইয়াহিয়া রাহিম সাফাভি বলেছেন, সৌদি রাজার অমানবিক, দায়িত্ব জ্ঞানহীন ও অনৈসলামী আচরণ মিনার ঘটনার চেয়েও বেশি তিক্ত। তিনি বলেন, আমরা আশা করি আল্লাহ চাইলে এখন থেকে আগামী বিশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে একটি ইসলামী সরকার পবিত্র মক্কা ও মদিনা পরিচালনা করবে এবং সেখানে সউদ বংশ বলে কিছু থাকবে না।
ইরানের সংস্কৃতি ও ইসলামি দিক নির্দেশনা মন্ত্রী বলেছেন, সৌদি আরব হজ ব্যবস্থাপনায় গাফলতির মাধ্যমে মূলত হাজিদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছে এবং আন্তর্জাতিক আইনেরও লঙ্ঘন ঘটিয়েছে।
কেন ৭৪ হাজার কবর?
মক্কা সচিবালয় ছয়টি কবরস্থানে ৭৪,০০০ কবর প্রস্তুত করেছে বলে খবর বের হয়েছে। সৌদি আরবের দৈনিক পত্রিকা আরব নিউজ এ খবর দিয়েছে। তবে হঠাৎ করে কেন এত কবর একসঙ্গে প্রস্তুত করা হচ্ছে অথবা কতজন হাজিকে এসব কবরে দাফন করা হবে তা নিয়ে কিছু বলা হয় নি ওই খবরে। ফলে এক ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
লাশ ফেরতে সৌদি গড়িমসি:
মিনায় নিহত ইরানি হাজিদের মৃতদেহ ফেরত দিতে গড়িমসি শুরু করেছে সৌদি সরকার। এ প্রেক্ষাপটে ইরান বলেছে, নিহত প্রতিটি ইরানি হাজির লাশ অবশ্যই দেশে ফিরিয়ে আনা হবে। এজন্য পূর্ণ সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে ইরান। এ নিয়ে সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তেহরানের আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছেন ইরানের অন্যতম উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন আমির আবদুল্লাহিয়ান।
দায় এড়ানোর চেষ্টায় সৌদি সরকার:
এতবড় ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরও দায় এড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে সৌদি সরকার। সৌদি সরকারের কোনো কোনো মন্ত্রী ও দরবারি আলেম বলেছেন, নিতান্তই আল্লাহর ইচ্ছায় ঘটেছে এ দুর্ঘটনা। এতে মানুষের কোনো হাত নেই।
আবার কেউ কেউ বলেছেন, ইরান ও আফ্রিকার কিছু হাজি অসহযোগিতা করায় এবং উল্টো দিকে যাওয়ায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। সৌদি স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, হজযাত্রীরা দিক-নির্দেশনা অনুসরণ করেননি বলে এমন ঘটনা ঘটেছে।
সৌদি আরবেই ভিন্ন মত:
সৌদি আরবের বিশিষ্ট আলেম সালমান বিন ফাহাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-ওদা বলেছেন, এবার হজের সময় মিনায় যে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে তা ‘আল্লাহর কাজ’বলে রিয়াদ কোনোভাবেই নিজ দায়িত্ব এড়াতে পারে না। আব্দুল্লাহ আল-ওদা এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, বার বার যেসব ঘটনা ঘটেছে তাকে শুধুমাত্র ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা’ এবং মানুষের কিছু করার নেই বলে পার পাওয়া যাবে না।
সৌদি রাজ-দরবারের মুফতি আব্দুল আজিজ ইবনে আব্দুল্লাহ আশ-শেখ মিনা দুর্ঘটনার পর বলেছেন, এ ঘটনা ঠেকানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় এবং তা এড়ানোও অসম্ভব। সৌদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুবরাজ নায়েফের সঙ্গে বৈঠকে এ মন্তব্য করেন তিনি। মূলত এসব মতের বিরুদ্ধে পাল্টা মত তুলে ধরলেন সৌদি আলেম ফাহাদ বিন আব্দুল্লাহ আল-ওদা।
মিনা সড়ক নির্মাণকারী ইঞ্জিনিয়ারের বক্তব্য:
মিনায় পাথর নিক্ষেপের আনুষ্ঠানিকতা পালন-কেন্দ্র সংলগ্ন সড়ক ও সেতুগুলোর প্রকৌশলী ডক্টর কিট স্টিল বলেছেন, মিনায় যা ঘটেছে তা একটি প্রকাশ্য অপরাধ।
তিনি বলেছেন, ‘আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি যে মিনাগামী এইসব সেতু ও সড়কের ডিজাইনে কোনো সমস্যা নেই। শুধু যাওয়ার পথকে ফেরার পথ হিসেবে ব্যবহারের ফলে ঘটেছে ওই মহা দুর্ঘটনা! কারণ যা-ই হোক না কেন এটা এক প্রকাশ্য অপরাধ।’
সৌদি ব্যবস্থাপনার কঠোর সমালোচনায় নাইজেরিয়া:
এবারের পবিত্র হজে সৌদি সরকারের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কঠোর সমালোচনা করেছে নাইজেরিয়া। মিনায় পদদলিত হয়ে হাজি নিহত হওয়ার ঘটনায় সৌদি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যও নাকচ করেছে দেশটি।
মিনা বিপর্যয়ের তদন্ত চাই ইন্দোনেশিয়া:
ইন্দোনেশিয়ার সংসদের উচ্চ কক্ষ বা পিপলস কনসাল্টেটিভ অ্যাসেম্বলি'র ভাইস চেয়ারম্যান হেদায়াত নুর ওয়াহিদ বলেছেন, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা বা ওআইসি'র সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এই কমিটির মাধ্যমে মিনায় সংঘটিত বিপর্যয়ের কারণ উদঘাটন করা উচিত।
এছাড়া, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্টের দপ্তরের প্রধান তেতেন মাসদুকি বলেছেন, দেশটির প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো হজ যাত্রীদের নিরাপত্তা দেয়া ও মিনার বিপর্যয়ের মত ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধের বিষয়ে সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।
ভারত থেকে সমালোচনা:
মিনার ঘটনায় সৌদি সরকারের গাফলতিকে দায়ী করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় হজ কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান এবং পশ্চিমবঙ্গ স্টেট হজ কমিটির চেয়ারম্যান হাজি নুরুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, “আমি মনে করি সৌদি সরকারের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে না।
এর আগে মসজিদুল হারামে যে দুর্ঘটনা ঘটেছে, লাখ লাখ মানুষের সমাবেশের মধ্যে ক্রেন রাখা উচিত হয়নি। এটাও চরম গাফিলতির বিষয়।”
‘অল ইন্ডিয়া সুন্নাত অল জামায়াত’-এর সেক্রেটারি মুফতি আব্দুল মাতিন এ ঘটনায় সৌদি কর্তৃপক্ষের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “এত বড় দুর্ঘটনার দায় সৌদি প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। দুর্ঘটনায় নিহতদের লাশ সম্মানজনকভাবে রাখা হয়নি।
পুলিশ এবং সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা নিহত হাজীদের লাশ সম্মানজনকভাবে রাখতে পারেনি। সার্বিকভাবে এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। বিশ্বের দরবারে মুসলিমদের মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে।”
হজ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক কমিটির দাবি:
লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন, বার্ষিক হজ সমাবেশের ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণের জন্য রিয়াদের উচিত মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটি সম্মিলিত কমিটি গঠন করা।
তিনি মিনার ঘটনা তদন্তের জন্য সংশ্লিষ্ট মুসলিম দেশগুলোকে নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠনেরও আহ্বান জানিয়েছেন। যেসব দেশের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক হজযাত্রী নিহত হয়েছেন এই কমিটিতে সেই দেশের সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধি থাকবে বলে হিজবুল্লাহর প্রধান তার প্রস্তাবে উল্লেখ করেন।
কেন ইরান এতটা প্রতিবাদী:
প্রথম কথা হচ্ছে এবারে হজের সময় দুই দফার বড় দুর্ঘটনাতেই ইরানের বেশি হাজি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নাগরিক রয়েছেন। যেমন রয়েছেন একজন রাষ্ট্রদূত, তেমনি রয়েছেন মহাকাশ বিজ্ঞানী। রয়েছেন বিখ্যাত ক্বারি ও ইসলামি সঙ্গীত শিল্পী।
আগেও সৌদি হজের সময় অনেক ইরানি হাজি নিহত হয়েছেন। ১৯৮৭ সালে হজের সময় ইসরাইল ও মার্কিন বিরোধী শ্লোগান দেয়ায় সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী ইরানি হাজিদের ওপর গুলি চালিয়ে শত শত ইরানি হাজি হত্যা করে। এসব কারণে ইরানের প্রতিবাদ কড়া ও জোরালো হবে এটাই স্বাভাবিক।
এছাড়া, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো কতগুলো বাস্তবতা বিচেনায় নিতে হবে। মুসলিম বহু দেশ অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বেশ গরিব। এর মধ্যে অনেক দেশে সৌদি অর্থে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে বা হচ্ছে। বহু দেশ সৌদি আরবে জনশক্তি পাঠিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। কোনো কোনো দেশের শাসকরা সৌদি রাজা আর তার সঙ্গপাঙ্গদের করুণায় ক্ষমতায় আছে। এসব দেশ সৌদি রাজার বিরুদ্ধে কথা বললে যেমন বহু প্রকল্প বন্ধ হওয়ার আশংকা আছে, তেমনি বহিষ্কৃত হতে পারে লাখ লাখ শ্রমিক। কারো কারো ক্ষমতা যাবে।
কিন্তু ইরান সরকারের না আছে এ ধরনের ভয়, না আছে শ্রমিক বের করে দেয়ার আশংকা। অতএব, যে কথা অনেকে মোটেই বলতে পারছে না, সে কথা ইরান যথেষ্ট জোরের সঙ্গেই বলছে। এছাড়া, অনেকে সৌদি রাজতান্ত্রিক সরকারের নেতৃত্বে এক ধরনের ‘সুন্নি জগত’ কল্পনা করতে পছন্দ করে। এর বিপরীতে ইরানকে শিয়া রাষ্ট্র হিসেবে দেখিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে চায় যা কোনোভাবেই মুসলামনাদের স্বার্থ রক্ষা করবে না।
ইরান শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হওয়ায় তাদেরকে দোষারোপ করে সহজে পার পাওয়া যাবে- এমন একটা কৌশল অবলম্বন করে একসঙ্গে ইরানবিরোধী প্রচারণা জোরদার করেছে সৌদি লবি। পরিস্থিতি মোকাবেলায় ইরানকেও সত্য তুলে ধরার বিষয়ে শক্ত অবস্থানে যেতে হয়েছে। ইরানের হাজিদের বেশিরভাগই শিয়া হওয়ায় তাদের সঙ্গে সৌদি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের আচরণও যথেষ্ট বিদ্বেষপূর্ণ ছিল। এসব কারণে ইরানকে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করতেই হচ্ছে।
এ প্রতিবাদকে পবিত্র মক্কা ও মদিনা দখলের ষড়যন্ত্র বলে তুলে ধরছে সৌদি লবি যা নিতান্তই ভূয়া তথ্য। প্রকৃতপক্ষে নিদের দোষ লুকানোর জন্য ইরানকে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ইরান-বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে সৌদি সরকার দায় থেকে মুক্তি পেতে চাইছে।
তবে আশার কথা হচ্ছে- এ প্রতিবাদ শুধু ইরান করছে না। প্রতিবাদ করেছে ইন্দোনেশিয়া, নাইজেরিয়া, লেবাবনের হিজবুল্লাহ এবং ভারতের হজ বিষয়ক সংগঠনসহ অনেক দেশ ও সংস্থা।
হজ ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক কমিটি:
বার বার সৌদি সরকারের দুর্বল ও ভুল ব্যবস্থাপনার নজির স্থাপন হচ্ছে হজের মতো মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ফরজ জমায়েতে। এ কারণে হজ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে। এ দাবির পক্ষে অবশ্যই শক্ত ভিত্তি আছে। কারণ, হজ হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর বিষয়; এটি কোনো একক দেশ বা সরকারের বিষয় নয়। ফলে একক কোনো দেশের নিয়ন্ত্রণে থাকারও যৌক্তিকতা নেই।
এছাড়া, সৌদি আরবের লোকজন হলো বিলাসি জীবনযাপনে অভ্যস্ত; নিজেরা কাজ করে না। অর্থের জোরে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর লোক নেয় আর তারাই সৌদি সমাজের সব কাজ করে আসছে। এদের পক্ষে হজের মতো এত বড় বিশাল এবং দীর্ঘমেয়াদি অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয় তা বার বার প্রমাণিত হচ্ছে।
এ ছাড়া, কোন দেশের লোকজন হজে আসতে পারবে, কাদেরকে ভিসা দেয়া হবে, কাদের দেয়া হবে না তাও ওই রাজতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার আলোকে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে সৌদি সরকার। যে দেশ অপছন্দের, যে দেশের সঙ্গে শত্রুতা সে দেশের লোকজনকে ভিসা দেয়া হয় না। এই যেমন- এবার হজের জন্য ইয়েমেন ও সিরিয়ার লোকজনকে ভিসা দেয়া হয় নি। অথচ হজের মতো ফরজ ইবাদতে বাধা দেয়ার এখতিয়ার সৌদি সরকারের নেই। আল্লাহর কাছে জবাবদিহিতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করে সৌদি সরকার স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় হজ ব্যবস্থাপনা চালিয়ে আসছে। এসব ঘটনা ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বলা যায়- হজ ব্যবস্থাপনার জন্য ইরানসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা যে কথা বলছে তার যৌক্তিকতা রয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে, হজ ব্যবস্থাপনায় সৌদি সরকারের ব্যর্থতার কারণে হজ বিষয়ে আন্তর্জাতিক কমিটি গঠন এখন সময়ের দাবি। এ দাবি যত তাড়াতাড়ি পূরণ করা যাবে মুসলিম উম্মাহর জন্য ততই কল্যাণ। অন্যথায় এভাবে ক্ষতির মুখেপড়তেই থাকবে মুসলমানরা।
লেখক: রেডিও তেহরানের সিনিয়র সাংবাদিক।





