পুলিশ বলছে, অভিযোগ পেলেই তারা চাঁদাবাজি রোধে অভিযান চালাবে। কিছুদিন আগে রাজধানীর উত্তরায় একটি পরিবহনে প্রকাশ্যে চাঁদাবাজির অভিযোগ তৃতীয় লিঙ্গের চার সদস্যকে গ্রেফতারের পর বেরিয়ে আসে চাঁঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশ বলছে-যে চারজনকে হিজড়া সন্দেহে গ্রেফতার করা হয় তারা সবাই ‘পুরুষ’!
এছাড়া শনিবার রাজধানীতে সাত বছর হিজড়া ছদ্দবেশে থাকা দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত এক আসামীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আমিনুল ইসলাম জানান, সাত বছর ধরে তৃতীয় লিঙ্গের ছদ্মবেশে থেকেও শেষ রক্ষা হয়নি মাদক মামলায় দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামী বিল্লাল হোসেনের। জামিনে বের হয়ে কারাবাস থেকে রেহাই পেতে তিনি ছদ্মবেশে তৃতীয় লিঙ্গের বেশে ছিলেন।
বাড্ডা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি বলেন, ২০১২ সালের ৭ সেপ্টেম্বর মো. বিল্লাল হোসেন মাদকসহ শাহ আলী থানা পুলিশের কাছে গ্রেফতার হয়েছিলেন। জামিনে বের হয়ে মামলার দায় থেকে বাঁচার জন্য শাহ আলী থানা এলাকা ছেড়ে তিনি চলে যান। বিল্লালের ২ বছর সাজা হয়। গত সাত বছর ধরে তৃতীয় লিঙ্গের ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি আত্মগোপনে থাকেন। ওসি বলেন, শাহ আলী থানা পুলিশ গোপন তথ্যের ভিত্তিতে তার অবস্থান নিশ্চিত হয়। পরে শনিবা রাতে বাড্ড থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। বিল্লাল প্রকৃতপক্ষে তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি নয়।
ফিঙ্গার প্রিন্টের মাধ্যমে প্রকৃত নাম ও ঠিকানা নিশ্চিত হওয়া যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর সর্বত্র রয়েছে হিজড়াদের নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন বাস কাউন্টারে তারা টাকা তুলছে। বনশ্রী, খিলগাঁও, মতিঝিল, উত্তরা, মোহাম্মপুর, আদাবর, গুলশান, বনানী, মহাখালী, ফকিরাপুল, আরামবাগ, লালবাগ, শান্তিনগর, মধুবাগ, মিরপুর, মধ্যবাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করে হিজড়াদের চাঁদাবাজি চলছে।
এছাড়াও মাদক ব্যবসা, পতিতাবৃত্তি, মারামারিসহ নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি তাদের হাতে খুনের ঘটনাও ঘটেছে। তারা আবার সন্ত্রাসীদেরও আশ্রয় দিয়ে থাকে। হিজড়া হওয়ার কারণে এমনিতেই এরা সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পাচ্ছে। আর এ সুযোগে তারা আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যদেরকেও পাত্তা দিচ্ছে না। ফলে এদের অত্যাচার দিন দিন বেড়েই চলেছে। উত্তরা, বনানী, গুলশান, ফার্মগেট, পরীবাগ ফুট ওভারব্রিজ, মহাখালী ফ্লাই ওভারের নিচে, রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, সংসদ ভবন এলাকা, চন্দ্রিমা উদ্যান, ধানমন্ডি লেক, কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে রাতের আঁধার নামলেই পতিতাবৃত্তিতে নেমে পড়ে। এদের অধিকাংশই হিজড়া। অনেক হিজড়া পতিতা, ছিনতাই ও মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এসব এলাকায়।
বিশেষ করে রাতে পথচারীরা রেহাই পায় না তাদের হাত থেকে। ফুট ওভারব্রিজগুলোতে উঠলেই তাদের তাদের উৎপাত চোখে পড়ে। হিজড়াদের টাকা তোলা নতুন কিছু নয়। আগে মানুষ যা দিত, তা নিয়েই খুশি থাকত হিজড়ারা। কিন্তু এখন তাদের আচরণ বদলে গেছে। রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি, দোকানপাট যেখানে-সেখানে টাকার জন্য মানুষকে নাজেহাল করছে তারা। নবজাতক জন্মের খবর পেলেই সেই বাড়িতে গিয়ে চাহিদা মতো টাকা না পাওয়া পর্যন্ত বাড়ি ঘেরাও করে রাখে। টাকা কম দিতে চাইলে লোকজনকে নাজেহাল করার অনেক অভিযোগ আছে। হিজড়াদের কেউ কেউ অভিযোগ করছে, রাজধানীতে অনেক ‘নকল’ হিজড়া আছে, যাদের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে বিনা পরিশ্রমে অর্থ উপার্জন করা। তারা নিজেদের মধ্যে সাংকেতিক ভাষায় কথা বলে থাকে।
আরও জানা যায়, খিলক্ষেত এলাকায় হিজড়াদের দলনেতা নাজমা হিজড়ার অধীনে রয়েছে ৪০ জন হিজড়া। ৩০ বছর আগে পুরুষাঙ্গ কেটে হিজড়া হয়েছে নাজমা। দক্ষিণখানের ফায়দাবাদ, কাঁঠালতলা, কোর্টবাড়ী, আজমপুর কাঁচাবাজার, কসাইবাড়ী, আশকোনা এলাকায় আছে ৪০টি গ্রুপ। একেকটি গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১২ জন। গ্রুপগুলোর মধ্যে রাহেলা, স্বপ্না, কল্পনা হিজড়া। তুরাগের কামারপাড়া, রাজাবাড়ী, ধউর, রানাভোলা, বাউনিয়া এলাকায় থাকে ১০টি গ্রুপ। তাদের গ্রুপ প্রধান হচ্ছেন কচি হিজড়া। সবাই তাকে গুরু মা বলে ডাকেন। মোহাম্মদপুর ও আদাবরে আছে ১২টি হিজড়া গ্রুপ। এছাড়াও টঙ্গী শিল্পাঞ্চলে প্রায় দুই শতাধিক হিজড়া বসবাস করছে। তাদের একাধিক গ্রুপ রয়েছে। তুরাগ, উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান থানা এলাকায় আছে অন্তত ২০টি গ্রুপ। বাড্ডা রামপুরা এলাকায় রয়েছে একাধিক চক্র।
গণপরিবহনে চাঁদাবাজির অভিযোগে গত ৩ সেপ্টম্বর গ্রেফতার তৃতীয় লিঙ্গের বেশধারী চার পুরুষ বর্তমানে কারাগারে আছে। ছদ্মনামধারী এ চার আসামী হলেন- মৌসুমী (৩২), অনিকা (১৯), তুলি (২৪) ও দুলী (২৫)। উত্তরা পশ্চিম থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা পুলিশের উপ-পরিদর্শক লিয়াকত আলী বলেন, ৪ সেপ্টেম্বর আসামীদের আদালতে হাজির করে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এরআগে রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মোহসীন বলেন, গ্রেফতারের পর তৃতীয় লিঙ্গের চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করা হয়। এরপর জানা যায় তারা মূলত তৃতীয় লিঙ্গের কেউ নয়, সবাই পুরুষ। তৃতীয় লিঙ্গের বেশে দীর্ঘদিন ধরে উত্তরা এলাকায় বিভিন্ন যানবাহন থেকে চাঁদাবাজি করতো তারা। টাকা না দিলে কাউন্টার ও গাড়িতে রীতিমতো তা-ব চালাতো। যাত্রীদের সঙ্গে অশ্লীল আচরণ করতো।
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তরা উত্তরা পশ্চিম থানার ৭ নম্বর সেক্টরের বিএনএস টাওয়ারের সামনে এনা পরিবহনের ম্যানেজার জিয়াউল হকের কাছে দুই হাজার টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তারা যাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ শুরু করেন। ওসি মোহাম্মদ মোহসীন বলেন, একপর্যায়ে ওই ম্যানেজার ৫০০ টাকা দিতে রাজি হন। কিন্তু আসামীরা তাদের দাবি করা টাকার জন্য অনড় থাকেন। তারা ভুক্তভোগী জিয়ার পকেট থেকে এক হাজার ১০ টাকা নিয়ে নেন এবং আরও ৪৯০ টাকার জন্য কাউন্টারজুড়ে হৈ হুল্লোড় শুরু করেন। পরে তিনি বিষয়টি পুলিশকে জানালে ঘটনাস্থল থেকে তৃতীয় লিঙ্গের বেশধারী ওই চারজনকে গ্রেফতার করা হয়।
এ ছাড়াও গত ঈদুল ফিতরের দিন বিকেলে রাজধানীর পল্টনে পলওয়েল মার্কেটের সামনে থেকে প্রকাশ্যে প্রাইভেট কার থেকে একটি দামি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় কয়েকজন হিজড়ারা। এ ঘটনায় পল্টন থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী (জিডি) করা হয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা পল্টন থানার এসআই মোঃ নাসির উল্লাহ জানান, এ ঘটনার তদন্ত চলছে।





