পদ্মা সেতুতে মাথা লাগার গুজবের চেয়েও ‘ছেলে ধরা’ খবরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। এতদিন বিষয়টি গুজব মনে করা হলেও নেত্রকোনায় শিশু সজিব মিয়ার (৭) দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধারের ঘটনায় সারাদেশে অভিভাবকদের মাঝে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি ছেলে ধরা সন্দেহে বিভিন্ন স্থানে অন্তত ৫ জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় বেশ কয়েকজনকে গণপিটুনি দিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে।

আজ শনিবার রাজধানী ঢাকা ও নারায়নগঞ্জে ছেলে ধরা সন্দেহে এক নারীসহ দুই জনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নারায়নগঞ্জে আরেক নারী বিক্ষুব্ধ জনতার পিটুনিতে গুরুতর আহত হয়েছেন। এসব ঘটনা তদন্ত করতে মাঠে নেমেছে পুলিশ।

অনেক ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা খবর পাওয়ার আগেই স্থানীয় মানুষ সন্দেহজনক ব্যক্তি বা নারীকে আটক করে পিটুনি দিয়ে হত্যা করছে। প্রকাশ্যে এভাবে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তি কতখানি দোষি বা ঘটনার সঙ্গে জড়িত তা প্রমান করার সুযোগ থাকছে না। আইন হাতে তুলে নিয়ে মানুষ অন্যের ওপর এভাবে ঝাপিয়ে পড়লে নিরপরাধ মানুষও মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হতে পারেন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এদিকে ছেলে ধরার গুজবে বিভিন্ন এলাকায় স্কুলগামী শিশু-কিশোরদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও অভিভাবকরা শিশুদেরকে নিয়মিত  স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। গণমাধ্যমের খবরে জানা গেছে, বরিশাল, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ কয়েকটি জেলার কিছু স্কুলে শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি কমে গেছে।

তবে বিষয়টি গুজব বলেই  জানাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কয়েকটি এলাকায় জনসাধারণকে সচেতন করতে মাইংকি করা হয়েছে। 

এছাড়া পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের জন্য মানুষের মাথা লাগবে বলে যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, তার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ।

পদ্মাসেতুর প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি গুজবের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকতে বলা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি মহল সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রগতি তুলে ধরে ঐ বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয় যে ব্রিজ নির্মাণে মানুষের মাথা প্রয়োজন হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি গুজব।

পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ঐ অঞ্চলের কাছে বেশ কয়েকটি এলাকায় বিভিন্ন বয়সী মানুষ অপহৃত হচ্ছে বলেও গুজব ছড়িয়ে পড়ায় কিছু এলাকায় মানুষের মধ্যে ভিত্তিহীন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে দেশের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবরও বের হয়।

তবে কোনো এলাকার আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকেই কোনো অপহরণের খবর পাওয়া যায়নি।

তাহলে কেন এমন একটি ভিত্তিহীন গুজব ছড়িয়ে পড়লো যার কারণে পদ্মা সেতুর প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এই অপপ্রচারের প্রতিবাদ করতে হলো?

ছেলে ধরা সন্দেহে নিহত ৫ : 

শনিবার (২০ জুলাই-২০১৯) রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরা বা ‘কল্লা কাটা’ সন্দেহে এক নারীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। সকাল পৌনে ৯টার দিকে উত্তর বাড্ডার কাঁচাবাজারের সড়কে এ ঘটনা ঘটে। বাড্ডা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, গুরুতর আহত অবস্থায় ওই নারীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠানো হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। স্থানীয়রা জানান, উত্তর বাড্ডায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও একটি মাদরাসা পাশাপাশি। সেখানে শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে তিনজন বোরকা পরিহিত নারী যান। তারা স্কুলের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন। বাধার মুখে দু’জন পালিয়ে গেলেও আরেক গণপিটুনির শিকার হন।

একই দিন (২০ জুলাই-২০১৯) সকালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক দুই স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে এক যুবক নিহত হয়েছেন। গুরুতর আহত হয়েছেন এক নারী। তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতদের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাদের বয়স ২২-২৫ বছর।

নেত্রকোনায় সজিব মিয়া (৭) নামের এক শিশুর গলা কেটে হত্যার ঘটনায় রবিন নামে এক যুবক গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৯ জুলাই-২০১৯) দুপুরে শহরের নিউটাউন পুকুরপাড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে সজীবের মস্তকবিচ্ছিন্ন দেহ তার রবিনের বাসার সামনের সড়কের পূর্ব কাটলি এলাকার নির্মাণাধীন একটি ভবনের তিনতলা থেকে উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় থানায় দু’টি মামলা হলেও পুলিশের তদন্তে এখনো ঘটনার রহস্য উদঘাটন হয়নি।

এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেই রাজশাহীর বাগমারায় মিজানুর রহমান মিজান নামে ছয় বছরের এক শিশুকে গলা কেটে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গভীর রাতে উপজেলার ভবানীগঞ্জ পৌর এলাকার সূর্যপাড়ায় এই ঘটনা ঘটে। ওই সময় একই ঘরে শিশুটির মা-বাবাও ঘুমিয়েছিলেন। আহত মিজান ওই এলাকার আতিকুর রহমানের ছেলে। রাতেই মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। বর্তমানে হাসপাতালের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন।

১০ জুলাই (২০১৯) ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে ছেলে ধরা সন্দেহে অজ্ঞাত এক যুবক (৩০) গণপিটুনিতে নিহত হয়।

১১ মে (২০১৯) খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় ছেলে ধরা সন্দেহে এক বৃদ্ধকে (৬৫) পিঠিয়ে হত্যা করে এলাকাবাসী। পুলিশ বলছে, ওই বৃদ্ধ পাগল ছিলেন।

জানা গেছে, এরইমধ্যে পদ্মা সেতুর নির্মাণ নিয়ে ফেসবুকে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কয়েক জনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব।

১২ জুলাই র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের সিনিয়র সহকারী পরিচালক এএসপি মিজানুর রহমান ভূঁইয়া জানান, পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে গুজব ছড়ানোর দায়ে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরমধ্যে শহীদুল ইসলাম (২৫) নামে এক তরুণকে নড়াইল থেকে র‌্যাব-৬, আরমান হোসাইনকে (২০) চট্টগ্রাম থেকে র‌্যাব-৭, ফারুককে (৫০) মৌলভিবাজার থেকে র‌্যাব-১১ এবং রাজবাড়ীর পাংশা থেকে পার্থ আল হাসান (১৬) নামে এক কিশোরকে গ্রেফতার করেন র‌্যাব-৮ এর সদস্যরা।

করণীয়  

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান  এসব ঘটনাকে সম্পূর্ণ গুজব বলে মনে করেন। তিনি গুজব প্রতিরোধে সচেতন নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পাল্টা সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর সুপারিশ করেছেন । পাশাপাশি গুজবকারীদের বিষয়ে কঠোর হয়ে দেশের প্রচলিত আইনে বিচারের আওতায় আনতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, এ ধরনের গুজব মানুষ হত্যার হাতিয়ার। গুজব ছড়িয়ে মানুষ হত্যার ঘটনা ঘটছে। এর আগে আমরা ধর্মসহ বিভিন্ন গুজব ছড়িয়ে মানুষ হত্যা করতে দেখেছি। কিন্তু এধরনের গুজব এই প্রথম। গুজবকারীদের যেভাবেই হোক ধরে আইনের আওতায় আনতে হবে। তার আগে তাদের সতর্ক করতে হবে। আমাদের ডিজিটাল আইনেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়।

গুজবে আতঙ্কিত না হতে পুলিশের আহ্বান  

পুলিশ সদর দফতর এ নিয়ে নাগরিকদের উদ্দেশে  বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গুজবে বিভ্রান্ত হবেন না। পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা ও রক্ত লাগবে, এটা গুজব। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যারা এধরনের গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও জানিয়েছে পুলিশ।

ঢাবি অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, একটা গোষ্ঠী যারা বাংলাদেশের উন্নয়নকে বিশ্বাস করে না, তারা ওঁত পেতে থাকে, কখন কোন গুজব ছড়ানো যায়। গুজবের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করতে চায়। সেক্ষেত্রে সরকারকে সজাগ থাকতে হবে।

শুধু গুজব বলেই উড়িয়ে না দিয়ে বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় এনে চক্রান্তের পেছনের রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী।