বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহধর্মিণী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ৮৬তম জন্মবার্ষিকী আজ। ১৯৩০ সালের ৮ই আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার সময় তিনিও নিহত হন। একজন স্ত্রী হিসেবে, একজন মা হিসেবে কেমন ছিলেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব? শেখ মুজিবই বা তাকে কিভাবে মূল্যায়ন করতেন?
বঙ্গবন্ধুর লেখা “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” গ্রন্থের বেশ কয়েক স্থানেই তিনি তার স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রসঙ্গ টেনেছেন। তার সেই বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত লেখার মধ্য দিয়েই উপলব্ধি করা যায় একজন স্ত্রী হিসেবে, সন্তানের মা হিসেবে এবং সর্বপরি দেশের প্রতি কতটা নিবেদিতপ্রাণ নারী হিসেবে জীবন যাপণ করেছিলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা। শেখ মুজিব তাকে রেণু বলে ডাকতেন।
বঙ্গবন্ধু তার “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” গ্রন্থে ১৯৪৯ সালে জেলে থাকা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন: “একদিন আমার হাতের কব্জি সরে গিয়েছিল, পড়ে যেয়ে। ভীষণ যন্ত্রণা, সহ্য করা কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। আমাকে বোধহয় মেডিকেল কলেজে পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছিল। একজন নতুন ডাক্তার ছিল জেলে। আমার হাতটা ঠিকমত বসিয়ে দিল। ব্যথা সাথে সাথে কম হয়ে গেল। আর যাওয়া লাগল না। বাড়িতে আমার আব্বা ও মা ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। রেণু তখন হাচিনাকে নিয়ে বাড়িতেই থাকে। হাচিনা (শেখ মুজিব তার বড় মেয়ে শেখ হাসিনাকে হাচিনা বলে ডাকতেন) তখন একটু হাঁটতে শিখছে। রেণুর চিঠি জেলেই পেয়েছিলাম। কিছু টাকাও আব্বা পাঠিয়েছিলেন। রেণু জানত, আমি সিগারেট খাই। টাকা পয়সা নাও থাকতে পারে। টাকার দরকার হলে লিখতে বলেছিল।” (পৃষ্ঠা নাম্বার ১১৮)

১৯৪৬ সালে লাহোর থেকে দেশে ফেরার পথে স্ত্রী রেণুকে ও পরিবারকে যেভাবে মনে করছিলেন সে প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে শেখ মুজিব লিখেছেন: “মন চলে গেছে বাড়িতে। কয়েক মাস পূর্বে আমার বড় ছেলে কামালের জন্ম হয়েছে, ভাল করে দেখতেও পারি নাই ওকে। হাচিনা তো আমাকে পেলে ছাড়তেই চায় না। অনুভব করতে লাগলাম যে, আমি ছেলে মেয়ের পিতা হয়েছি। আমার আব্বা ও মাকে দেখতে মন চাইছে। তাঁরা জানেন, লাহোর থেকে ফিরে নিশ্চয়িই একবার বাড়িতে আসব। রেণু তো নিশ্চয়ই পথ চেয়ে বসে আছে। সে তো নীরবে সকল কষ্ট সহ্য করে, কিন্তু কিছু বলে না। কিছু বলে না বা বলতে চায় না, সেই জন্য আমার আরও বেশি ব্যথা লাগে।” (পৃষ্ঠা নাম্বার ১৪৬)
আন্দোলন-সংগ্রামে সব সময় ব্যস্ত সময় পার করার কারণে শেখ মুজিবকে খুব সময়ই কাছে পেতেন স্ত্রী রেণু। তাই সুযোগ পেলেই তিনি স্বামীর সাথে থাকতে চাইতেন। ১৯৪৬ সালে বাড়ি থেকে ঢাকায় ফেরার সময় কিভাবে রেণু তার সঙ্গী হয়েছিলেন সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে শেখ মুজিব আরও লিখেছেন: “রেণু বলল, কতদিন দেখা হবে না বলতি পারি না। আমিও তোমার সাথে বড়বোনের বাড়িতে যাব, সেখানে্ও তো দু’একদিন থাকবা। আমি ও ছেলেমেয়ে দুইটা তোমার সাথে থাকব। পরে আব্বা যেয়ে আমাকে নিয়ে আসবেন। আমি রাজি হলাম, কারণ আমি তো জানি, এবার আমাকে বন্দি করলে সহজে ছাড়বে না। নৌকায় এতদূর যাওয়া কষ্টকর। আমরা বিদায় নিয়ে রওয়ানা করলাম। দুইজন কর্মীও আমার সাথে চলল। একজনের নাম শহীদুল ইসলাম, আরেকজনের নাম সিরাজ। ওরা স্কুলের ছাত্র ছিল, আমাকে ভীষণ ভালবাসত। এখন দুজনই ব্যবসায়ী। শহীদ আজও আমাকে ভালবাসে এবং রাজনীতিতে আমাকে অন্ধভাবে সমর্থন করে। সিরাজ অন্য দল করলেও আমাকে শ্রদ্ধা করে। এরা কবিরাজপুর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল এবং রতভর পাহারা দিয়েছিল। শীতের দিন ওরা এক কাপড়ে এসেছিল। রেণু নিজের গায়ের চাদর ওদের দিয়েছিল।” (পৃষ্ঠা নাম্বার ১৬৪)

বড় বোনের বাড়িতে বেড়ানো শেষে বিদায় নেয়ার মুহুর্তটি কেমন ছিল সেই প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে শেখ মুজিব তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন: “রাতে রওয়ানা করে এলাম, দিনেরবেলায় আসলে হাচিনা কাঁদবে। কামাল তো কিছু বোঝে না। শিবচরে জাহাজ আসে না, চান্দেরচর যেতে হবে, প্রায় দশ মাইল। আমার বড়বোনের দেবর, আমারও বিশিষ্ট বন্ধু ও আত্মীয় সাইফুদ্দিন চৌধুরী সাহেব আমাকে ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। রেণু আমাকে বিদায় দেওয়ার সময় নীরবে চোখের পানি ফেলছিল। আমি ওকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম না, একটা চুমা দিয়ে বিদায় নিলাম। বলবার তো কিছুই আমার ছিল না। সবই তো ওকে বলেছি।” (পৃষ্ঠা নাম্বার ১৬৫)
জেলে থাকার সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন: “হাচিনা আমার গলা ধরল আর ছাড়তে চায় না। কামাল আমার দিকে চেয়ে আছে, আমাকে চেনেও না আর বুঝতে পারে না, আমি কে? মা কাঁদতে লাগল।… থানায় ফিরে এলাম এবং দারোগা সাহেবের বাড়িতেই আমার মালপত্র রাখা হল। আব্বা, মা, রেণু খবর পেয়ে সেখানেই আসলেন।যে সমস্ত পুলিশ গার্ড এসেছে ফরিদপুর থেকে তারাই আমাকে পাহারা দেবে এবং মামলা শেষ হলে নিয়ে যাবে। আব্বা, মা ও ছেলেমেয়েরা কয়েক ঘণ্টা রইল। কামাল কিছুতেই আমার কাছে আসল না। দূর থেকে চেয়ে থাকে। ও বোধহয় ভাবত, এ লোকটা কে?” (পৃষ্ঠা নাম্বার ১৮৩-১৮৪)

শেখ মুজিব আরো লিখেছেন: “রেণু আমাকে একাকী পেল, বলল, জেলে থাক আপত্তি নাই, তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ। তোমাকে দেখে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে। তোমার বোঝা উচিত আমার দুনিয়ায় কেউ নাই। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা গেছেন, আমার কেউই নাই। তোমার কিছু হলে বাঁচব কি করে? কেঁদেই ফেলল। আমি রেণুকে বোঝাতে চেষ্টা করলাম, তাতে ফল হল উল্টা। আরও কাঁদতে শুরু করল, হাচু ও কামাল ওদের মা’র কাঁদা দেখে ছুটে যেয়ে গলা ধরে আদর করতে লাগল। আমি বললাম, খোদা যা করে তাই হবে, চিন্তা করে লাভ কি?” (পৃষ্ঠা নাম্বার ১৯১)
এভাবেই আমৃত্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থেকে তাকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছেন বেগম ফজিলুন্নেছা মুজিব। শেখ মুজিবের সহধর্মিনী হয়ে তার রেণু হিসেবে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের ভূমিকা যে কোন বাঙালি নারীর জন্য হতে পারে এক প্রেরণা। স্বামীর সুখে-দু:খে তার পাশে থেকে জীবনযাপণ করার যেই বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতির গল্প আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি তারই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি যেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ওরফে রেণু।
কেবি





