ভাবতে হয়তো অবাক লাগছে। অবাক লাগারই কথা। বিশ্বমোড়ল পুঁজিবাদী আমেরিকার নাকের ডগায় যুগের পর যুগ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু রেখে বাম আন্দোলনের ইতিহাসের উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত হওয়া ফিদেল কাস্ট্রোর জীবনের শেষ স্বপ্ন ছিল একটি ফুটবল মাঠ। তাও আবার শিশুদের জন্য।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে আলজাজিরার প্রতিবেদন থেকে এমন তথ্যই জানা গেল। কিউবার রাজধানী হাভানার দক্ষিনের ঐতিহ্যবাহী স্থান জায়মানিতাসে এই মাঠ নির্মানের নির্দেশ দিয়েছিলেন অবিসংবাদিত নেতা কাস্ট্রো।
জায়মানিতাসের যেই স্থানটি আরো একটি কারণে বিশেষত্বের দাবিদার। আর তা হলো- কাস্ট্রো প্রায়ই এখানে যাত্রা বিরতি দিতেন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সুখ-দু:খের কথা শুনতেন। শাসকের স্থান ভুলে মিশে যেতেন সাধারণ মানুষের সাথে তাদেরই একজন হয়ে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, মৃত্যুর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে ফিদেল কাস্ট্রো শিশুদের ফুটবল খেলার এই মাঠ নির্মানের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরেও যখন ফিদেল কাস্ট্রোকে বিশ্বজুড়ে স্মরণ করা হচ্ছে কখনও বা ক্যারিশমেটিক বিপ্লবী হিসেবে, কখনও বা নিষ্ঠুর স্বৈরশাসক হিসেবে, তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ফিদেলকে যেন আবিস্কার করলেন বিশ্ববাসী। ফিদেলকে তার প্রতিবেশীরা যেন এক বৃদ্ধ বন্ধু হিসেবে নতুনরুপে কাছে পেলেন যিনি কিনা তাদের সন্তানদের জন্য ফুটবল খেলার মাঠ নির্মানে তার প্রভাবকে ব্যবহার করেছিলেন।

১৯৫৯ সালের ঐতিহাসিক কিউবা বিপ্লবের মহানায়ক বিগত ৫ দশক ধরে আমেরিকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নেতৃত্ব দিয়েছেন সমাজতান্ত্রিক কিউবাকে। তাকে হত্যার জন্য আমেরিকা ৬৩৮ বার ব্যর্থ হামলা চালিয়েছিলো বলে তথ্য রয়েছে।
তবে, শেষ পর্যন্ত বার্ধক্যের কাছে হার মেনেছিলেন এই বিপ্লবী। ছোট ভাই রাউল কাস্ট্রোর নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। আর ক্ষমতার চেয়ার থেকে অবসরের এক দশকের মাথায় গত ২৫ নভেম্বর চিরদিনের জন্য না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন আলোচিত-সমালোচিত এই নেতা।
স্থানীয় সময় শনিবার এই বিপ্লবী নেতার দেহাবশেষ তার জন্মস্থান শান্তিয়াগোতে আনা হয়। আজ (রোববার) স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় (বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায়) তাকে শান্তিয়াগোর গোরস্থানে কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রামের আরেক মহান পুরুষ জোসে মার্টির সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়।
রাজধানী হাভানার পশ্চিম প্রান্তে গাছ গাছালি ঘেরা এক বিশাল কমপ্লেক্সে জীবনের শেষ দিনগুলো পার করেছেন কাস্ট্রো। এই স্থানটির একেবারে লাগোয়া প্রতিবেশী এলাকা হলো জায়মানিতাস।
জায়মানিতাস জীর্ণ-শীর্ণ অবস্থায় পতিত এক স্থান যা কিনা এখনো পুরোনো ঐতিহ্য লালন করছে। বিভিন্ন উপলক্ষ্যে ঘোড়া সজ্জিত গাড়ি চলে যায় শহরটির মধ্য দিয়ে, সরকারী রেশন কার্ডধারী অনেকেই এখানে চালু থাকা ডিসপেনসারি থেকে তাদের প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র সংগ্রহ করছেন। এসবই যেন এখানকার সামাজিক অবস্থানকে তুলে ধরছে।

কাস্ট্রোর জীবনের সবশেষ কর্মগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এই জায়মানিতাসে শিশু ও তরুণদের জন্য একটি ফুটবল খেলার মাঠ তৈরির নির্দেশ দান। এখানে প্রায়ই কাস্ট্রো তার গাড়িবহর থামিয়ে জনগণের সাথে মিশে যেতেন, একেবারে কাছ থেকে সাধারণ মানুষের কথা শুনতেন, তাদের সুখ-দু:খের ভাগিদার হতেন।
সবমিলিয়ে এই জায়মানিতাসে কাস্ট্রোর অবস্থান ছিল বেশ শক্তিশালী। এই নেতার মৃত্যুর এক সপ্তাহ পরে যখন বার্তাসংস্থা রয়টার্স এখানকার দুই মহিলার সাথে কথা বলতে গেল অমনি তারা চোখের পানি ফেলতে শুরু করলেন প্রিয় নেতার স্মরণে।
এখানকার কয়েকজন অধিবাসী জানালেন, সবশেষ গত ৯ই নভেম্বর কাস্ট্রো তার গাড়ি থামিয়েছিলেন এই স্থানে এবং রাস্তায় ফুটবল খেলতে থাকা ছোট কোমলমতি শিশুদের আদর করেছিলেন, উৎসাহ দিয়েছিলেন।
বাচ্চাদের একটি কথার দিকে হঠাৎ মনোযোগ আটকে গেল কাস্ট্রোর। আর তা হলো-এখানে আর কোন খেলার জায়গা নেই (এই রাস্তা ছাড়া)। কাস্ট্রো কিছুটা ক্ষুব্ধ কণ্ঠেই যেন জবাব দিলেন, “What do you mean there's nowhere to play [football]?” সহজ কথায় “কোথাও খেলার জায়াগা নেই মানে?”
পরদিনই তারা মাঠের কাজে নেমে গেলেন, জানালেন রাফায়েল সিয়েরা। ছাপ্পানো বছরের এই রাফায়েল হলেন ১৯৮০ সালে অ্যাঙ্গোলা যুদ্ধে কিউবার সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালনকারী। তিনি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে কাস্ট্রোর রসতদাতা হিসেবে কাজ করতেন।
যাই হোক, কাস্ট্রো তার কথা রাখলেন, বাচ্চাদের জন্য ফুটবল খেলার মাঠ উপহার দিলেন, টেলিযোগাযোগ কর্মকর্তা হিসেবে অবসর নেয়া ৬২ বছরের মারিয়াম লা ভেলি আবেগরুদ্ধ কন্ঠে কথাগুলো বললেন।

এখানকার কিশোর কিশোরীদের মনে কাস্ট্রোর এই ছোট্ট কাজটি যে কতটা প্রভাব ফেলেছে তা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দুই কিশোর-কিশোরীর বক্তব্য ও কাজের মধ্য দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে সেই চিত্র।
এদের একজন ১৪ বছর বয়সি নবম শ্রেনীর ছাত্রী জেনিফার ডায়াজ। মেয়েটি কাস্ট্রোর একটি ছবি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। সেই ছবিটি তার আইপ্যাডের স্ক্রীনে সেট করা হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে-কাস্ট্রো তার গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে বসে আছেন, পাশে স্ত্রী ডালিয়া সটো দেল ভ্যালে।
অন্যজন ১৩ বছরের অস্টম শ্রেনীর ছাত্র ইয়োসেইল কালভো। যখন কাস্ট্রোর ছবিযুক্ত তার ব্রাশটি নিয়ে প্রশ্ন করা হয় ছেলেটি বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠে। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ছেলেটি জানায়, আমি তার (কাস্ট্রোর) সাথে প্রায় একমাস আগে কথা বলেছিলাম। তিনি জানিয়েছিলেন, আমাদের জন্য একটি ফুটবল খেলার মাঠ তৈরি করতে যাচ্ছেন। সেই কাজ চলছে।
এটাই হলো ফিদেল কাস্ট্রো। কিউবার মানুষের হৃদয়ে যার স্থান নানা কারণে। যে যেভাবেই তাকে অভিহিত করুক না কেন কিউবার মানুষের মনের মনিকোঠায় তিনি যে আসন গেড়েছেন তা হয়তো কোনদিনই নড়বড়ে হবার নয়।
কেবি





