সেনা-সমর্থিত মিশরের প্রেসিডেন্ট আব্দেল ফাত্তাহ আল সিসি তার তথাকথিত ‘ইসলামী জঙ্গি’ বিরোধী যুদ্ধে এবার নতুন কৌশল গ্রহণ করেছেন। মিশরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে হটিয়ে সেনাবাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতা দখলকারী সিসি এবার যুদ্ধবিমান ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি নজর দিলেন সাদা পাগড়িওয়ালা যাজক বা ধর্ম শিক্ষকদের দিকে।

দেশটির হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ইসলামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আল-আজহার ইনস্টিটিউটের ধর্ম প্রচারক বা ধর্মীয় শিক্ষকদের এই কথিত ‘চরমপন্থা’ বিরোধী অভিযানে ব্যবহার করতে চান সিসি।

গত জানুয়ারিতে (২০১৫) আল-আজহার কনফারেন্স সেন্টারে ইসলামিক স্কলারদের উদ্দেশ্যে দেয়া এক টেলিভিশন বক্তৃতায় সিসি ইসলামের মধ্যে ধর্মীয় অভ্যুত্থানের ডাক দেন।

শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেয়া শত শত নিরস্ত্র মিশরীয় নাগরিককে নির্মমভাবে হত্যাকারী সিসি নিজের দিকে শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেন, পুরো বিশ্বজুড়ে এখন উদ্বেগ, ভয়, বিপদ, হত্যা ও ধ্বংসের অন্যতম কারণ হলো চরমপন্থী চিন্তা-ভাবনা। এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া দরকার এবং এক্ষেত্রে স্কলাররাই স্কুল, মসজিদ এবং বিমানবন্দরসহ সর্বত্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন।

বাকপটু ও ধূর্ত সিসি বলেন, "You, imams, are responsible before Allah. The entire world is waiting. The entire world is waiting for your next word because this nation is being torn apart." অর্থাৎ-“আপনারা, যারা ইমাম, তারা আল্লাহর কাছে দায়ী। গোটা পৃথিবী অপেক্ষা করছে। গোটা পৃথিবী আপনাদের কথা শোনার জন্য অপেক্ষা করছে, কারণ জাতি আজ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে”।

হঠাৎ করে সিসির দেয়া এমন বিপ্লবী বক্তব্যে স্কলাররা রীতিমতো হতভম্ব হয়ে যান। নানা মহলে এ নিয়ে সৃষ্টি হয় নতুন গুঞ্জনের। তবে, কারো কাছেই এটা আর অপরিস্কার নয় যে, সিসির এই সতর্কবাণী বড় কোন কুটকৌশলেরই অংশবিশেষ বই আর কিছুই নয়।

ধূর্ত সিসির সেই দুরভিসন্ধিটি হলো-তিনি চরমপন্থী আন্দোলন দমনের নামে তার প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে তথাকথিত আইন ও নিজের পোষ্য বাহিনীকে (brute force) কাজে লাগানোর পাশাপাশি এবার দেশের অধিকতর শান্ত ও অরাজনৈতিক অংশকে কৌশলে কাজে লাগাতে চান।

শুধু সিসির জন্যই নয় চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে এই গোটা অঞ্চলের জন্যই আল-আজহার ইনস্টিটিউট একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। কারণ আরব বিশ্বের সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে খ্যাত মিশরে এই লড়াইয়ের ফল গোটা দুনিয়াজুড়ে বিস্তার লাভ করবে বলেই মনে করেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। 

মিশরে আল-আজহার মসজিদটি ১০ম শতাব্দিতে নির্মিত হয় এবং এটি দেশটির সবচেয়ে পুরাতন ঐতিহ্যবাহী নিদর্শনের অন্যতম একটি। এই মসজিদকে ঘিরেই প্রতিষ্ঠিত হয় একটি বিশ্ববিদ্যালয় যা ১১৭১ সালে ফাতিমি খেলাফতের পূর্ব পর্যন্ত শিয়াপন্থী ইসলাম বিস্তারে কাজ করে। পরবর্তীতে এটি সুন্নী মসজিদে রুপান্তর লাভ করে এবং তখন থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সুন্নী মতাদর্শীপ্রধান চার মাজহাবের শিক্ষা বিস্তার শুরু হয়।

বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ফ্যাকাল্টি ও গবেষণা কেন্দ্রে সাড়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এদের অনেকেই এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আগত। এই প্রতিষ্ঠানটির সাথে মিশরজুড়ে আরও ৯ হাজারেরও বেশি স্কুলের নেটওয়ার্ক রয়েছে যেখানে ২০ লাখেরও অধিক শিক্ষার্থী রয়েছেন।

তবে, সুদীর্ঘ ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এই আল-আজহার ইনস্টিটিউটের এই দীর্ঘ পথচলায় খুব সামান্যই পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষক, গবেষক ও ধর্ম প্রচারকরা শুধুমাত্র টেক্সট বইয়ে কিছু পরিবর্তন এবং একটি অনলাইন মনিটরিং সেল গঠণের মধ্যেই যেন নিজেদের সংস্কার কাজকে সীমাবদ্ধ রেখেছেন।

অবশ্য এই অনলাইন মনিটরিং সেল যেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে থাকে তা হলো-বিভিন্ন জঙ্গী গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমসহ নানাভাবে যেসব বিবৃতি দেয় তা পর্যালোচনা করে থাকে এবং এর মোকাবেলায় পাল্টা মতামত দিয়ে থাকে। এর বাইরে আর তেমন কোন সংস্কার কাজ প্রতিষ্ঠানটি করছে না বললেই চলে। আর ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদের এই অবস্থানকে বেশ খোলামেলাভাবেই স্বীকার করছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধাররা।   

মিশরের এই বাস্তবতার মধ্যে টিকে থাকার লড়াইয়ে সিসি সেই কাজটিই করতে চান যা তার পূর্বসূরীদের কেউ করেননি। আর সেটি হলো-কঠোর নজরদারীর পাশাপাশি তথাকথিত ‘মডারেট ইসলাম’ শিক্ষায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা। মিশর, সিরিয়া, আলজেরিয়া ও ইরাকের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করে সিসির উপলব্ধিতে যেটি এসেছে তা হলো-চরমপন্থা দমনের নামে বিরোধী নির্মূলে শুধু কঠোরতার প্রয়োগে অনেক সময় নিজের সমূলে উচ্ছেদ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই সিসি একটি মিশ্র চাল চালতে চান।

সিসির এই যুদ্ধে তাকে কিছু বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে তার চেহারা। দীর্ঘদিন নামাজ পড়ার ফলে কার্পেটে সিজদা দিতে দিতে কপালে যে বিশেষ দাগ অনেক নামাজিরই দেখা যায় সিসির কপালেও রয়েছে তেমন চিহ্ন। পাশাপাশি তার স্ত্রী ও মেয়ে বোরখা পড়েন। এদিক থেকে সিসি সহজেই নিজেকে অত্যন্ত ধার্মিক হিসেবে জাহির করতে পারছেন জনসম্মুখে। বিশ্বস্ততার ব্যাপারে সিসির সুনাম এতটাই ছিল যে তার পূর্বসূরী মুসলিম ব্রাদারহুডের শীর্ষ নেতা এবং মিশরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিই তাকে ২০১২ সালে প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

অথচ এই সিসিই বেশ দু:সাহসিকতার সাথে মুসলিম ব্রাদারহুডকে বিতর্কিত ও অজনপ্রিয় করতে নানা কুটকৌশল গ্রহণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত মুরসির কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন। আর এরপরই শুরু হয় ব্রাদারহুডের প্রতি তার নির্মমতা। মিশরের জনপ্রিয় ওই সংগঠনটির শত শত নিবেদিতপ্রাণ কর্মীকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় এবং জেলে পাঠিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয় হাজার হাজার নেতা-কর্মীর ওপর। এমনকী গত মাসে (মে ২০১৫) ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ২০১১ সালের এক জেল বিদ্রোহের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয় সিসির পদলেহী কায়রোর এক আদালত।   

তবে মডারেট ইসলামের দোহাই দিয়ে এসব কর্মকাণ্ডকে এখন গা সওয়া করতে  সিসির উদ্যোগ খুব একটা কাজে আসবে না বলেই মনে করেন দেশটির বেশিরভাগ মানুষ। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, তারা তাদের প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের পরিকল্পনা নিয়েই এখন উদ্বিগ্ন।

আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান সরকারের মুখপাত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে, এটা যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না অনেকেই। এখান থেকে জঙ্গি পয়দা হয় এমন দোহাই দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের কাঁধে ভর করে উচ্চাভিলাসি রাজনীতিকরা তাদের হীন স্বার্থ চরিতার্থ করবেন তা কিছুতেই মানতে নারাজ দেশটির সচেতন জনতা। 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সের সাথে সাক্ষাতকালে কয়েকজন শিক্ষার্থী বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়ন খুবই অকার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। কায়রোর এই কঠোর দমন কৌশলই মানুষকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ এমনটি না ঘটলে এই মানুষগুলো উদারতার পথেই হাটতেন।

এদিকে, সিসির এই তথাকথিত ‘মডারেট ইসলাম’ প্রচারের টোপকে বেশ ভালোভাবেই গিলেছে পশ্চিমা বিশ্ব। তবে, সিসির সত্যিকারের পরিকল্পনা কী তা নিয়ে তাদের সংশয় রয়েই গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন যে, সিসির বিশাল কোন দুরভিসন্ধিরই একটি অংশ বিশেষ এই তথাকথিত ‘মডারেট ইসলাম’ ফাঁদ। পশ্চিমারা যেন খেই হারিয়ে ফেলছেন বিষয়টি নিয়ে। তাদের কাছে এর সুদূরপ্রসারি লক্ষ্য এবং বাস্তবায়নের পদ্ধতি-কিছুই যেন পরিস্কার নয়। 

যাই হোক না কেন, সিসি যেন কিছুতেই তার পরিকল্পনা থেকে পিছু হটছেন না। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আড়ালে নিজের প্রতিপক্ষকে চিরতরে নির্মূল করতে ঐতিহ্যবাহী আল-আজহার ইনস্টিটিউট যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম এ ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ নেই। আর এ কাজটি যে শুধুমাত্র ‘মডারেট ইসলাম’ প্রচারের নামে খুব সহজেই সম্পন্ন করা সম্ভব সে ব্যাপারে সিসি যেন খুবই আশাবাদী। আর তাইতো সিসির সাম্প্রতিক বক্তব্য হলো-"We need to move faster and more effectively." অর্থাৎ আমাদের দ্রুত ও অধিক কার্যকরভাবে অগ্রসর হতে হবে। (সহায়ক সূত্র: দি ডেইলি স্টার ও র‌য়টার্স)