২৫ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন মিয়ানমারের জনগণ। নির্বাচনে বিশাল ব্যবধানে জয়লাভ করতে যাচ্ছে অং সান সু চি’র দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডি।

প্রাথমিক ফলাফলে এনএলডি অন্তত ৮০ শতাংশ ভোট পেয়েছে বলে জানা গেছে স্থানীয় নির্বাচন কমিশন সূত্রে। অবশ্য এখনো নির্বাচনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

তবে এরই মধ্যে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন সেনাসমর্থিত ক্ষমতাসীন দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি বা ইউএসডিপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাই উ।

নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এখনো ভোট গণনা চলছে। তবে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা তথ্যের ভিত্তিতে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন তাই উ। আর এর মধ্য দিয়ে মিয়ানমারের জনগণ পেতে যাচ্ছে গণতান্ত্রিক নেতা। যে নেতা তাদের সকল অধিবার নিশ্চিত করবে।

এরই মধ্যে কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানের শরণার্থী ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা ফিরতে চাই স্বদেশে। তবে তা অবশ্যই মৌলিক অধিকার নিয়ে।

মঙ্গলবার উখিয়ার কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্পে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বললে তারা এমন ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেন। বেশ কিছু রোহিঙ্গাদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, ‘দীর্ঘ ২৫ বছর পর মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। আমরা যতটুকো খবর পেয়েছি এতে অং সান সু চি’র জয় হতে যাচ্ছে। তাই আমরা অনেক খুশি পাশাপাশি আমরা তাকে অভিনন্দন জানায়। সে দেশে অনেক বছর সামরিক শাসন ছিল, এই শাসনামলে আমরা নির্যাতনের শিকার হয়ে বাধ্য হয়ে বাংলাদেশে বসবাস করছি। সুচি সরকার গঠনের পর তিনি আমাদের মৌলিক অধিকারগুলো দিয়ে আবারো আমাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেবেন এই আহবান জানায়।’

তারা আরও বলেন, আমরা মিয়ানমার ফেরার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। যে কোন সময় আমরা স্বদেশ ফিরতে রাজি এ ক্ষেত্রে সুচির সু-নজর কামনা করছি।

কুতুপালং রেজিস্টার্ড রোহিঙ্গা ম্যানেজমেন্ট কমিটির সেক্রেটারি মো. ইসমাইল বলেন, মিয়ানমারে ২০১৫ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আমাদের দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আমরা আশাবাদী ছিলাম অং সান সু চি’র দল ক্ষমতায় আসলে তিনি রোহিঙ্গা ইস্যুর সমস্যাটা নিয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবেন। সেই দেশে আমরা চরম পর্যায়ের অবহেলিত, অধিকার তো দূরের কথা সেখানে আমরা অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছি প্রতিনিয়ত। এখন অং সান সু চি’র কাছে আমাদের আবেদন থাকবে তিনি সরকার গঠনের পর পরই রোহিঙ্গা বিষয়ের সমাধান করবেন। এবং খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থানসহ মৌলিক অধিকার প্রদানের মাধ্যমে আমাদের মিয়ানমার মুসলিমদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেবেন।

রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ও উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী জানান, মিয়ানমারে গণতন্ত্র ফিরে আসার ফলে রোহিঙ্গাদের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তিনি আশা করেন মিয়ানমার সরকার অবিলম্বে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে।

এদিকে নির্বাচনে সু চি’র বিজয়ে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ সু চি এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা মুসলমান ইস্যুটি সমাধানের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেন নি। তিনি এ বিষয়ে ‘ধীরে চলো নীতি’ অনুসরণের পক্ষে।

সূত্র মতে, গত জুনে দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, রাতারাতি রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেছিলেন, এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ইস্যু। এর সঙ্গে অনেক জাতিগত এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী জড়িয়ে রয়েছে। তার মতে, এক গোষ্ঠীর জন্য কিছু করতে গেলে অন্য গোষ্ঠীগুলোর ওপর তার প্রভাব পড়বে। এ কারণেই রোহিঙ্গা সঙ্কটটি অত্যন্ত জটিল পর্যায়ে রয়েছে।

তবে অং সান সু চি মিয়ানমারের দায়িত্ব নেয়ার পর তার পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের বিষয়ে কি ধরনের বক্তব্য আসতে পারে তা এখনো নিশ্চত হওয়া না গেলেও কক্সবাজারের সচেত মহল ও রোহিঙ্গরা আশাবাদী তাদের স্বদেশে ফিরিয়ে নেয়া হবে।

জেলার সচেতন মহল বলছেন, এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা অং সান সু চি দল গঠনের পর তার সু-চিন্তিত পদক্ষেপের।

সূত্র মতে, কক্সবাজারে মিয়ানমার থেকে বাস্তুভিটা ছেড়ে আসা নিবন্ধিত রোহিঙ্গা রয়েছে প্রায় ৩৩ হাজার। তবে অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রায় ৩ লক্ষাধিক। এসব রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের সাথে বেশ কয়েকবার কথা হলেও এখন পর্যন্ত এই সমস্যার সু-নির্দিষ্ঠ কোন সমাধান হয়নি। তাই অং সান সু চি দল গঠনের পর রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে ইতিবাচক সমাধান আসবে এমনটাই প্রত্যাশা বাংলাদেশের জনগণ ও রোহিঙ্গাদের।
সূত্র-ব্রেকিং/এমএ