সাম্প্রতিক সময়ে সংগঠিত সংঘর্ষে ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ইসরাইল আন্তর্জাতিক আইন ভঙ্গ করেছে বলে মন্তব্য করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ। ইসরাইলি সেনাদের আল-আকসা মসজিদ জবরদখল করাকে কেন্দ্র করে এই সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।
মানবাধিকার গ্রুপের বরাত দিয়ে আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখন্ডে চলমান সংঘাতের সময় ফিলিস্তিনি শিশুদের ব্যাপারে ইসরাইল সীমাহীন বাড়াবাড়ির (disproportionate violence) পন্থা অবলম্বন করছে। শুধুমাত্র চলতি (অক্টোবর ২০১৫) মাসেই অন্তত ১০ ফিলিস্তিনি শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে যায়নবাদী ইসরাইলি দখলদাররা।
ফিলিস্তিনে কর্মরত শিশুদের রক্ষামূলক আন্তর্জাতিক সংস্থা “ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল (Defence for Children International (DCI)- Palestine)” এর আইন কর্মকর্তা (attorney and international advocacy officer) ব্রাড পার্কার (Brad Parker)আলজাজিরাকে বলেন, পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে এবং যুদ্ধ-বিধ্বস্ত পরিবেশে ইসরাইলি সেনারা কোন ধরনের নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা না করে ফিলিস্তিনি শিশুদের প্রতি নির্মম আচরণ করছে।
মানবাধিকার ইস্যুতে সহায়তা প্রদানের জন্য কর্মরত জাতিসংঘের অফিস (United Nations Office for the Coordination of Humanitarian Affairs) এর দেয়া তথ্য অনুযায়ী শুধুমাত্র ৬-১২ অক্টোবর ২০১৫-এই এক সপ্তাহেই অন্তত ২০১জন ফিলিস্তিনি শিশু ইসরাইলি হামলায় আহত হয়েছে। আর এটা কেবলমাত্র পশ্চিম তীর (West Bank) এবং গাজা অঞ্চলের ইসরাইলি বাড়াবাড়ির হিসাব।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকার সুরক্ষা কেন্দ্রের (Harvard University's Carr Centre for Human Rights) গবেষক ফেডারিকা ডি আলেজান্দ্রা (Federica D'Alessandra) বলেন, অল্প সময়ে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া নৃশংসতা ফিলিস্তিনি শিশুদের মধ্যে গভীর মানসিক ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।
গবেষক আলেজান্দ্রা আরও বলেন, বহু বিশেষজ্ঞের সাথে কথা বলে জানা গেছে হতাশা, উৎকণ্ঠা, বিপদ-পরবর্তী উদভ্রান্তি এবং নানা ধরনের মানসিক জটিলতা ক্রমেই আচ্ছন্ন করে ফেলছে ফিলিস্তিনি শিশুদের।

উল্লেখ্য গত মাসে (সেপ্টেম্বর ২০১৫) আল-আকসা মসজিদে ইসরাইলি দখলদারদের জবরদখলকে কেন্দ্র করে পশ্চিম তীর, গাজা ও ইসরাইলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।
এ সময় ইসরাইলি সেনারা টিয়ার গ্যাস, স্টান গ্রেনেড, রাবার বুলেট এবং তাজা বিস্ফোরক ব্যবহার করে। শুধু ফিলিস্তিনি প্রতিবাদকারীই নয়, ফিলিস্তিনের কোমলমতি শিশুদের ওপরও ইহুদিবাদী ইসরাইলি সেনারা এসব অস্ত্র প্রয়োগ করে।
চলতি (অক্টোবর ২০১৫) মাসের ১ তারিখ থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৫২ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইলি দখলদাররা। নিরস্ত্র বিক্ষোভকারী থেকে শুরু করে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ ফিলিস্তিনিরাও রেহাই পায়নি এই হত্যাযজ্ঞ থেকে। এ সময় ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের মুখে নিহত হন ৮ ইসরাইলি।
সমালোচকরা মনে করেন, শিশুদের বিরুদ্ধে অন্তত ভয়াবহ শক্তিমত্তা প্রদর্শন করার কোন দরকার ছিল না। শিশুদের সাথে সকল পরিস্থিতিতেই শিশুসুলভ আচরণ করাই সার্বজনীন মানবাধিকারের দাবি। কিন্তু এই মানবিক বিষয়টিকে প্রতিনিয়ত ভূলুন্ঠিত করে চলছে দখলদার ইসরাইলি সেনারা।
ইসরাইলের গুলি কর ও হত্যা কর নীতি:
ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল (Defence for Children International (DCI)- Palestine) এর আইন কর্মকর্তা (attorney and international advocacy officer) ব্রাড পার্কার আরও বলেন, ক্রমেই এমন আশংকা দানা বাঁধছে যে ইসরাইল “গুলি কর ও হত্যা কর (shoot-to-kill)” নীতি অবলম্বন করেছে। আর এই নীতির ফলে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের প্রবণতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
গত ৫ অক্টোবর (২০১৫) বেথেলহেমে বিক্ষোভ করার সময় আবদেল রহমা আবদুল্লাহ (Abdel Rahman Abdullah)নামের ১৩ বছরের এক ফিলিস্তিনি কিশোরের ওপর নির্মমভাবে গুলি চালায় ইসরাইলি দখলদাররা।
পরে অবশ্য গতানুগতিক পন্থায় ইসরাইল দাবি করে ভুলক্রমে ওই কিশোরকে হত্যা করা হয়েছে। ইসরাইলি সেনারা মূলত কাছের আরেকজন বয়স্ক ফিলিস্তিনিকে টার্গেট করে গুলি ছুড়েছিল।
মানবাধিকার আইন কর্মকর্তা ব্রাড পার্কার আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বিধান অনুযায়ী, জীবন বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে একান্ত বাধ্য হয়েই কেবল গুলি করা যায়। অথচ আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই যে কোন বিক্ষোভ চলাকালেই কোন ধরনের হামলা বা ঝুঁকির শিকার না হয়েও ইসরাইলি সেনারা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ফিলিস্তিনি শিশুদের হত্যা করে চলছে। গত মাসে ইসরাইল অন্তত ৫ বার শান্তিপূর্ণভাবে চলা ফিলিস্তিনি বিক্ষোভের ওপর সশস্ত্র হামলা চালায়।
গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর ২০১৫) ইসরাইলি সেনারা ইয়াবাদ (Yabad) নামের পশ্চিম তীরের উত্তরের একটি গ্রামে ঢুকে পড়ে এবং সাকের হারজাল্লাহ (Saqir Herzallah) নামের ১৪ বছরের এক তরুনের ওপর হামলা চালিয়ে তাকে আহত করে। এ সময় সাকের তাদের পারিবারিক ওলিভ বাগানে কাজ করছিল। স্থানীয় গণমাধ্যমে এ খবর প্রকাশ করা হয়।
ফিলিস্তিনের রামাল্লাকেন্দ্রীক মানবাধিকার সংগঠন আল হকের (Al-Haq) দেয়া প্রতিবেদন অনুযায়ী গত ১ অক্টোবর (২০১৫) থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি দখলদাররা ফিলিস্তিনিদের ওপর এ ধরনের অন্তত ৪৮টি হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার মধ্যে ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর চালানো সহিংস আক্রমনও রয়েছে।
আল হকের আইন গবেষক (legal research and advocacy coordinator) মনা সাবেল্লা (Mona Sabella) অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর এমনকি ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর চালানো নৃশংস হামলার জন্য ইসরাইলিদের খুব কমই জবাবদিহি করা হয়। এসব অমানবিক কার্যকলাপের জন্য কখনই তাদের বিচারের মুখোমুখি হতে হয় না বললেই চলে। (সূত্র: আলজাজিরা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম)
কেবি





