রাজধানীর মগবাজারের সোনালীবাগে গুলি করে তিনজনকে হত্যার ঘটনায় ২৪ ঘণ্টা পর গত শুক্রবার রাত ১১টার দিকে রমনা থানায় মামলা হলেও শনিবার দুপুর পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
তবে পুলিশের দাবি কি কারণে কারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে তা এক রকম নিশ্চিত হওয়া গেছে। এখন অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
রমনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মশিউর রহমান মামলা হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে টাইমনিউজবিডিকে জানান, 'শুক্রবার রাত ১১টার দিকে নিহত বৃষ্টি আক্তার রানু’র ভাই শামিম ওরফে কালা চাঁদ এই মামলা দায়ের করেন।
আসামিদের তালিকায় কালা বাবু, ফয়সাল আহমেদ রনি, শাহাদাত, রাজু, তপু, সোহেল, আরিফ, মারুফ, বিল্লাল, ঠাণ্ড, সিরাজ, পিচ্চি রনি ও জনিসহ মোট ১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।'
মামলার এজাহারে বলা হয়, 'কালা বাবু ও তার সহযোগী সন্ত্রাসীরা সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে কালা চাঁন ওরফে শামিমের কাছে চাঁদা চেয়ে আসছিল। চাঁদা না দেয়ায় তারা কালা চাঁনের বোনকে ও তার বাড়ির দুই ভাড়াটিয়াকে গুলি করে হত্যা করে।'তবে মামলা হলেও এখনো কাউকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয় নি বলে জানান ও মশিউর।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার কালা বাবুর দুই চাচি চম্পা বেগম ও চায়না বেগমকে থানায হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। ওই হত্যাকাণ্ডে ১২ জন অংশ নেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাদের সবার হাতেই ছিল আগ্নেয়াস্ত্র।
সোনালীবাগে চান বেকারির গলিতে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ৮টার দিকে সন্ত্রাসীরা বাড়িতে ঢুকে গুলি করলে বিল্লাল (২৮), মুন্না (২৫) ও হৃদয় (২২) গুলিবিদ্ধ হন। পরে সন্ত্রাসীরা ধাওয়া করে গলিতে নিয়ে হৃদয়ের বোন রানু আক্তারকে (৩০) গুলি করে। হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁদের মধ্যে রানু, বিল্লাল ও মুন্নাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হৃদয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ময়নাতদন্ত শেষে বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে তিনজনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ওই বাড়ির ভাড়াটিয়া মাহমুদা জানান, কালা চাঁনের পক্ষে বৃষ্টি তাদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করতেন। ছয়টি ঘরের প্রতিটির ভাড়া মাসে সাড়ে তিন হাজার টাকা।
পুলিশ ও স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, নিহত রানুর বড় ভাই কালাচান মগবাজার ওয়্যারলেস গেট রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক। কালাচানকেও সবাই সন্ত্রাসী হিসেবে জানে। রেলওয়ের জমির ওপর চার কক্ষের একটি টিনশেড বাড়ির দখল নিয়ে তাঁর সঙ্গে সন্ত্রাসী কালা বাবুর বিরোধ ছিল। এ কারণেই সহযোগীদের নিয়ে কালা বাবু এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
তবে স্থানীয় লোকজন জানান, মগবাজার ওয়্যারলেস রেলগেট থেকে মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত রেলওয়ের অন্তত ২৪ বিঘা জায়গা দখল করে বস্তি গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে মাদক, অবৈধ বিদ্যুৎসহ নানা ধরনের ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ করেছে সন্ত্রাসী তানভীরুল জামান খান ওরফে রনি। রনি পালিয়ে যাওয়ার পর কালা বাবু ওই বস্তির নিয়ন্ত্রণ নেয়।
স্থানীয় আরেক সন্ত্রাসী মাহাবুবুর রহমান ওরফে রানার সঙ্গে মিলে কালাচান ওই বস্তি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করেন। এর জের ধরে গত জানুয়ারি মাসে খুন হয় মাহাবুব। এরপর তার ভাই মিঠু ওই এলাকার ক্যাবল ব্যবসাসহ কিছু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেয়। মিঠুর সঙ্গে মিলে যান কালাচান। এসব নিয়ে কালা বাবুর সঙ্গে তাঁর বিরোধ বাড়তে থাকে।
তবে নিহত রানুর অপর ভাই প্রাণ শুক্রবার বলেন, ওই জায়গাটি তাঁর ভাই কালাচান ও রানু বৈধভাবেই স্থানীয় রনির কাছ থেকে কিনেছিলেন। জায়গাটি কালা বাবুর পৈতৃক বাড়ির সামনে হওয়ায় সে তা দখলে নিতে মরিয়া ছিল।
গতকাল দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে নিজেকে শামীম হিসেবে পরিচয় দেন কালাচান। তিনি এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রাজধানীর মালিবাগ, রামপুরা, মগবাজার ও আশপাশ এলাকার ত্রাস রনি। তার নামে চারটি হত্যাসহ ১৪টি মামলা রয়েছে। ২০১০ সালে রনিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু গত বছর ২৭ নভেম্বর জামিনে মুক্তি পেয়ে ভারতে পালিয়ে যেতে সে সক্ষম হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, মূলত পলাতক এ দুই সন্ত্রাসীর ক্যাডার বাহিনীর নিকট জিম্মি হয়ে আছে সাধারণ মানুষ। যখনই কেউ তাদের প্রতিবাদ করে তখন তাকে হত্যা করা হয়। তাদের সহযোগী হিসেবে কাইল্যা বাবু, কালাচানসহ অনেই এসব অপরাধগুলো সংঘঠিত করে।
তাদের দাবি, জিসান, রনি, কালা বাবু এলাকা ছাড়া। কিন্তু এলাকায় তাদের নাম করেই চলে চাঁদাবাজিসহ নানা কর্মকাণ্ড।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, এ ঘটনার মাধ্যমে কাইল্যা বাবুর আধিপত্য আরও বাড়বে। যদি সে ধরা না পড়ে তবে এলাকায় নিরব চাঁদাবাজি হবে। কারণ মৃত্যুর ভয়ে কেউ চাঁদাবাজীর ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলবে না। রনি, জিসান, কাইল্যা বাবুর ক্যাডারদের আধিপত্য বন্ধ না হলে সাধারণ মানুষ শান্তিতে থাকতে পারবে না। তাই চিহ্নিত এ সব সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেফতার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় জানান, ঘটনার পরপরই আমরা বিভিন্নভাবে কাইল্যা বাবু ও তার সহযোগীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। এই ঘটনায় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের হাত থাকতে পারে। সেই বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্ত ও আসামি গ্রেফতার অভিযান চালানো হচ্ছে।
পুলিশের রমনা বিভাগের সহকারী কমিশনার শিবলী নোমান বলেন, কী কারণে তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে এবং কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে, পুলিশ তা অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে। হত্যায় অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজনের নাম-পরিচয়ও পাওয়া গেছে। এখন তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
ঢাকা, জেইউ, ৩০ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর





