কোরবানির চামড়ার দাম কম নির্ধারণ করায় তা পাচারের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম নিম্নমুখী হওয়ায় এবার কোরবানির চামড়ার দাম কম নির্ধারণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, গতবারের মতো এবারো গরু ও ছাগল মিলে এক কোটি পিস চামড়া কেনার টার্গেট নির্ধারণ করেছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে ৭০ লাখ গরুর চামড়ায় আর ৩০ লাখ ছাগলের।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহিন আহমেদ বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার দাম ২০-২৫ সেন্ট কমে যাওয়ার পাশাপাশি চীন সরকার চামড়া পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করায় সেখানে বাংলাদেশ থেকে চামড়া রফতানি কমে গেছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হংকংয়েও রফতানির আদেশ কমেছে। সব মিলিয়ে ব্যবসায়ীরা চাপে রয়েছেন। তিনি মৌসুমী ব্যবসায়ীদের বেশি দামে চামড়া না কেনার আহ্বান জানান। এ বিষয়ে লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবু তাহের বলেন, বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনার বিষয়ে বড় ব্র্যান্ডগুলোর অনীহার কারণে চামড়ার দাম কমানো হয়েছে।
গত শুক্রবার ব্যসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এবার রাজধানীতে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৭০-৭৫ টাকা। ঢাকার বাইরে এর দাম ধরা হয়েছে ৬০-৬৫ টাকা। গত বছর রাজধানীতে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম ছিল ৮৫-৯০ টাকা আর রাজধানীর বাইরে ছিল ৭৫-৮০ টাকা। সে হিসেবে ২৫ থেকে ২৮ বর্গফুটের গরুর চামড়া ২৫০-৩৫০ টাকা কমে বিক্রি করতে হবে।
একই অবস্থা হবে ছাগলের ক্ষেত্রে মাঝারি ধরনের (৮-২২বর্গফুট) ১০০ থেকে ১৫০ টাকা কমে বিক্রি করতে হবে। এ ছাড়াও মহিষের দাম ৩৫-৪০ টাকা ও ছাগলের ক্ষেত্রে খাসির লবণযুক্ত চামড়া ৩০-৩৫ টাকা ও বকরির চামড়া ২৫-৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর বর্গফুটপ্রতি দাম ছিল যথাক্রমে ৫০-৫৫, ৪০-৪৫ ও ৩০-৩৫ টাকা। এর ফলে দেশের চামড়া শিল্পে রফতানিতে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
সক্রিয় পাচারকারী চক্র: বরাবরে মতো ঈদকে সামনে রেখে এবারো উত্তরাঞ্চলসহ সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় রয়েছে পাচারকারী চক্র। চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পাচারের জন্য বিনা সুদে কোটি কোটি টাকা লগ্নিও করছে ভারতীয় চামড়া সিন্ডিকেট। জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও সীমান্তবর্তী এলাকার অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী সরাসরি এ কারবারের সঙ্গে জড়িত। সীমান্তজুড়ে এসব এলাকা দিয়েই কোরবানির পর মাসব্যাপী চামড়া বাধাহীনভাবে ভারতে চলে যায়। এছাড়াও পঞ্চগড়, দিনাজপুর, লালমনিরহাট জেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে চামড়া পাচারের জন্য প্রস্তুত শত শত দালাল সিন্ডিকেট। কয়েকজন গরু ব্যবসায়ী, দালাল, কসাই ও চামড়া ব্যবসায়ী জানান, ঠাকুরগাঁওসহ উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৬০ ভাগ চামড়াই সীমান্ত দিয়ে চলে যাবে।
ব্যাংক ঋণ সাড়ে ৫শ’ কোটি টাকা: সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক মিলে এ বছর কোরবানির পশুর চামড়া কিনতে ৫৪০ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ অনুমোদন দিয়েছে। এর মধ্যে এবারো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন চার বাণিজ্যিক ব্যাংক দিচ্ছে ৫৩০ কোটি টাকা। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল, সিটিসহ কয়েকটি ব্যাংক ১০ কোটি টাকার ঋণ দিচ্ছে। গত বছর এ খাতে ঋণ দেয়া হয়েছিল ৪০০ কোটির কিছু বেশি।
উল্লেখ্য, সারাদেশে কোরবানির ঈদে প্রায় ৭০ লাখ চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এসব চামড়া স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ থেকে শুরু করে ট্যানারি মালিক পর্যায়ে পৌঁছতে চার-পাঁচ হাতবদল হয়। এতে চামড়ার প্রকৃত দাম সাধারণ মানুষ পায় না। এসব ঝামেলা এড়াতে কয়েক বছর ধরে সরকারের মধ্যস্থতায় প্রতি বছর ঈদের আগে দাম নির্ধারণ করে চামড়া ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো। এ বছর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমের দোহাই দিয়ে ব্যবসায়ীরা মূল্য নির্ধারণের পক্ষে ছিলেন না। তবে বাণিজ্যমন্ত্রী ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে দাম নির্ধারণের পক্ষে মতামত দেন।
কেএ





