দেশের কালো টাকার ভবিযৎ কী তা এখনো অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। কালো টাকা সাদা হবে কি-না তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে চলছে নানা বিশ্লেষণ। সরকারের পক্ষ থেকে এবার কালো টাকাকে ‘না’ বললেও সরকার সমর্থক অর্থনৈতিকরা এটাকে ‘হ্যাঁ’ বলার চেষ্টা করছেন। যদিও বরাবরের মত সংগঠনগুলো কালো টাকাকে সাদা ‘না’ করার পক্ষে মত দিয়েছেন।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত মনে করছেন, দেশে কালো টাকা আর নেই। তবে সরকারের সমর্থকরা বলছেন, অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় কালো টাকা সাদা করার বিষয়টি আসেনি। চূড়ান্ত বাজেটে এ বিষয়টি থাকা জরুরি। এক্ষেত্রে কঠিন শর্তে কালো টাকা অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের প্রতিক্রিয়ায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিমত ব্যক্ত করে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত।
অন্যদিকে নতুন অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ না রাখার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা সত্ত্বেও বিভ্রান্তি কাটেনি বলে মনে করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংগঠনটি সরকারের পক্ষ থেকে ‘স্পষ্ট’ ব্যাখা দাবি করেছে।
এদিকে বাজেটোত্তর এক সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, 'দেশে কেউ কালো টাকার ঘোষণা করে না, এটি বন্ধ করা হবে। গতবছর মাত্র ৩৪ কোটি টাকা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করা হয়েছে-এর মানে হলো দেশে কালো টাকা নেই!'।
প্রাক বাজেট আলোচনায় বিভিন্ন সময়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ রহিত করার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বক্তব্য দিলেও ২০১৪-১৫ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় সুনির্দিষ্টভাবে তিনি কিছুই উল্লেখ করেননি। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ওই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, 'এটি খেয়াল করিনি, এটা এ মুহূর্তে বন্ধ করা হলো'।
তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশে কালো টাকার উৎস হলো জমি। রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া যে পদ্ধতিতে হয় তাতে বহু কালো টাকার জন্ম হয়। দেশে কালো টাকার পরিমাণ মোট দেশজ আয়ের ৬৫ থেকে ৮৫ শতাংশের মতো, এর সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করতে একটি সমীক্ষা করা হচ্ছে।
কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান গোলাম হোসেন বলেন, মোট তিনটি খাতে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ ছিলো। এগুলো হলো রিয়েল এস্টেট খাত, ট্রেজারি বন্ড ক্রয় এবং ১০ শতাংশ জরিমানা। শেয়ার বাজারে এ সুযোগ ছিলো না। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের পর এ সুযোগ বন্ধ করা হবে।
বাজেট ঘোষণার আগে ও পরে যে বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে এবং হচ্ছে সেটি হল কালো টাকার ব্যবহার। তবে এই কালো টাকা বিনিয়োগের পক্ষে মত দিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি। অবশ্য কঠিন শর্তে বলেছে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা যেতে পারে কালো টাকা।
এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলা হয়, অবকাঠামো বিশেষত রাস্তাঘাট, ব্রিজ ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র এ অর্থ বিনিয়োগের কথা ভাবা যেতে পারে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ ও এই সমস্যা সমাধানে একটি কমিশন গঠনেরও প্রস্তাব দিয়েছে অর্থনীতি সমিতি।
সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত বলেন, দেশের অর্থনীতিতে পুঞ্জিভূত কালো টাকার পরিমাণ ৪২ থেকে ৮০ শতাংশ বা পাঁচ থেকে সাত লাখ কোটি টাকা। বিষয়টি সত্য। এ অর্থ উদ্ধার হওয়া প্রয়োজন। এ জন্য এমন পদ্ধতি অবলম্বন করা প্রয়োজন যাতে সৎ ব্যক্তিরা ভবিষ্যতে অসৎ হতে প্রণোদিত না হন। যদিও অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, দেশে কালো টাকা আর নেই। কালো টাকা নিয়ে সরকারের মধ্যে দ্বিমুখী ওই তথ্য বিভ্রান্ত ও রহস্য আরো বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রস্তাবিত ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা নিয়ে অর্থমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট কোনো কথা না থাকাকে ‘কালো টাকা সাদা করার সম্মতি’ হিসেবে দেখছেন তিনি।
দেবপ্রিয় বলেন, অর্থমন্ত্রী আগে বলেছিলেন এবার বাজেটে কালো টাকা সাদা করার কোনো সুযোগ রাখা হচ্ছে না। কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় তিনি এবিষয়ে কিছু বলেন নি।
দেবপ্রিয় বলেন, যেহেতু মন্ত্রী কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে নীরব থেকেছেন সেহেতু এটাকে এক প্রকার সম্মতি হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। তবে বাজেটোত্তর সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, 'এটি খেয়াল করিনি, এটা এ মুহূর্তে বন্ধ করা হলো'।
এদিকে কালো টাকা বৈধ করার ব্যাপারে বিভ্রান্তি নিরসনের দাবি করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যানের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির প্রেক্ষিতে এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান পরিস্কার করার দাবি জানায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এ লক্ষ্যে টিআইবি আয়কর অধ্যাদেশের ১৯ বিবিবিবিবি ধারা রহিত করে কালো টাকা বৈধ করার সকল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সুযোগ বন্ধ করার আহবান জানায়।
এক প্রসঙ্গে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “প্রভাবশালী মহলের চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে বাজেটে কালো টাকাকে বৈধতা দেবার অনৈতিক, অসাংবিধানিক ও বৈষম্যমূলক পথে অর্থমন্ত্রীর না যাওয়ার সিদ্ধান্তের ঘোষণা প্রশংসনীয়।
তবে একই সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর এর চেয়ারম্যানের বক্তব্যে বিভ্রান্তির সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাজেট বক্তৃতায় বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার ফলেই বিভ্রান্তি ঘনিভূত হয়েছে। প্রাক-বাজেট আলোচনা-বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী কালোটাকা বিরোধী অবস্থান ঘোষণা করে যে আশাবাদ সৃষ্টি করেছেন তার প্রেক্ষিতে সরকারকে আরো দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।” এ জন্য আয়কর অধ্যাদেশের ১৯ ধারা রহিত করে কালো টাকা বৈধ করার সকল সুযোগ বন্ধ করার আহবান জানায় টিআইবি।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে অপ্রদশিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দিয়ে ৩২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করেছে রাজস্ব বোর্ড। বিশ্লেষকরা বলছেন, কালো টাকা সাদা নিয়ে রহস্যে থেকেই যাচ্ছে। বাস্তবে সরকার কি করবে-তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ঢাকা,এমআর ,১৫ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম) // এসএইচ