বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের চেয়ে ৪৭ বছরের বড় ছিলেন অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক।

ঝালকাঠির রাজাপুরের সাতুরিয়ার মিয়া বাড়িতে ১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন বাংলার কোটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন এই মহান পুরুষ।

আজ (২৬ অক্টোবর ২০১৫) ছিল তার ১৪২তম জন্মবার্ষিকী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লাল সূর্য উদিত হওয়ার মাত্র ৯ বছর আগে ১৯৬২ সালের ২৯ এপ্রিল ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তার বাবা আইনজীবী মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী ও মা সৈয়দুন্নেছা। তিনিই ছিলেন বাবা-মায়ের একমাত্র পুত্র সন্তান।

বিশিষ্ট লেখক ও কলামিস্ট রামেন্দ্র চৌধুরী তার “হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দী-মুজিব” বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে লিখেছেন: “শেরে বাংলা বিভিন্ন উপলক্ষেই মুজিবকে (১৯২০-১৯৭৫) ‘নাতি’ বলে উল্লেখ করেছেন।

আর ভাসানী (১৮৮০-১৯৭৬) ‘পুত্রসম’ বিবেচনা করতেন মুজিবকে। সোহরাওয়ার্দীর (১৮৯২-১৯৬৩) বিবেচনায় ‘One of my star organizers (আমার তারকা সংগঠকদের মধ্যে একজন)’ ছিলেন মুজিব।”

রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের নিকট ‘শের-ই-বাংলা’ এবং ‘হক সাহেব’ নামে পরিচিত এই মহান ব্যক্তিত্ব। জীবদ্দশয়ায় অনেক রাজনৈতিক পদেই আসীন হয়েছিলেন তিনি।

এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭ – ১৯৪৩), পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী (১৯৫৪), পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী (১৯৫৫), পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর (১৯৫৬ – ১৯৫৮)। যুক্তফ্রন্ট গঠনে প্রধান নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

বাংলার ইতিহাসে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের মতো এত জনপ্রিয় নেতার আবির্ভাব খুব কমই হয়েছে। তার এই জনপ্রিয়তার বিষয়টি বেশ অকপটেই স্বীকার করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এমনকি স্বাভাবিক মত-পার্থক্যের কারণেও এ কে ফজলুল হকের বিরুদ্ধে জনসম্মুখে কিছু বলতে পারেননি বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বঙ্গবন্ধুর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” গ্রন্থ থেকেই আমরা ফজলুল হকের অসামান্য জনপ্রিয়তার কথা জানতে পারি।

বঙ্গবন্ধু তার এই গ্রন্থের একেবারে গোড়ার দিকে ২২ ও ২৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন: “একদিনের কথা মনে আছে, আব্বা ও আমি রাত দুইটা পর্যন্ত রাজনীতির আলোচনা করি। আব্বা আমার আলোচনা শুনে খুশি হলেন।

শুধু বললেন, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে কোন ব্যক্তিগত আক্রমন না করতে। একদিন আমার মা’ও আমাকে বলেছিলেন, ‘বাবা যাহাই কর, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলিও না।’ শেরে বাংলা মিছামিছিই ‘শেরে বাংলা’ হন নাই। বাংলার মাটিও তাকে ভালোবেসে ফেলেছিল।”

বঙ্গবন্ধু তার এই গ্রন্থে আরও লিখেছেন: “যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন আমার মনে আছে একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চান না এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক যিনি আমার দাদার খুব ভক্ত, আমাদের বাড়িতে সকল সময়ই আসতেন, আমাদের বংশের সকলকে খুব শ্রদ্ধা করতেন-দাঁড়িয়ে বললেন, যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরীবের বন্ধু হক সাহেব”।

গ্রন্থের একই স্থানে বঙ্গবন্ধু আরও লিখেছেন: “শুধু এইটুকু না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, তখনই জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি মার খেয়ে। কয়েকবার মার খাওয়ার পর আমাদের বক্তৃতার মোড় ঘুরিয়ে দিলাম”।

বিভিন্ন ইস্যুতে মত-পার্থক্য থাকলেও শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের প্রতি জনসাধারণের এই সীমাহীন ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

তাইতো নিজ দলের সহকর্মীদের কারো কারো বিরোধীতার পরও ফজলুল হকের দাওয়াতে শরীক হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন:

“একদিন হক সাহেব আমাদের ইসলামিয়া কলেজের কয়েকজন ছাত্র প্রতিনিধিকে খাওয়ার দাওয়াত করলেন। দাওয়াত নিব কি নিব না এই নিয়ে দুই দল হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত আমি বললাম, কেন যাব না, নিশ্চয়ই যাব।

হক সাহেবকে অনুরোধ করব মুসলিম লীগে ফিরে আসতে। আমাদের আদর্শ যদি এত হালকা হয় যে, তাঁর কাছে গেলেই আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলে যাব, তাহলে সে পাকিস্তান আন্দোলন আমাদের না করাই উচিত।”

শের-ই-বাংলা ছিলেন অবিভক্ত বাংলার কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রান। আর এই কর্মের জন্যই তিনি পরিণত হয়েছিলেন বাঙালির প্রাণপুরুষে। ১৯২৪ সালে শিক্ষামন্ত্রীর পদে ইস্তফা দেয়ার পর থেকে আবুল কাশেম ফজলুল হক সম্পূর্ণরূপে জড়িয়ে পড়েছিলেন কৃষকদের রাজনীতি নিয়ে।

১৯২৯ সালের ৪ জুলাই বঙ্গীয় আইন পরিষদের ২৫ জন মুসলিম সদস্য কলকাতায় একটি সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন। এই সম্মেলনে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি নামে একটি দল গঠনের সিধান্ত হয়। বাংলার কৃষকদের উন্নতি সাধনই ছিল এই সমিতির অন্যতম লক্ষ্য।

১৯২৯ সালে নিখিল বঙ্গ প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কলকাতায়। ঢাকায় প্রজা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৪ সালে। এই সম্মেলনে এ. কে. ফজলুক হক সর্বসম্মতিক্রমে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন।

ময়মনসিংহে বঙ্গীয় প্রজা সমিতির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩৫ সালে। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচিতসঙ্গীত এবং মরমী শিল্পী আব্বাসউদ্দিনের গানের মধ্যে দিয়ে এ সম্মেলন শুরু হয়েছিল। এই প্রজা সমিতির মধ্য দিয়েই পরবর্তিতে কৃষক-প্রজা পার্টির সূত্রপাত ঘটেছিল।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান দলাদলি ও স্বার্থের রাজনীতিতে যখন গোটা দেশ এক অশান্ত পুরীতে পরিণত হয়েছে, তখন শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের নি:স্বার্থ রাজনীতিই পারে সবাইকে সত্যিকার দেশপ্রেমে উদ্বীপ্ত হওয়ার প্রেরণা যোগাতে।

সব রাজনীতিবিদেরই উচিত বাংলার এই অকুতোভয় সেনানীর জীবন-ইতিহাসকে সঠিকভাবে অধ্যয়ন করা। এই মহান পুরুষের জন্ম দিবসে-কিভাবে মেহনতি মানুষের জন্য রাজনীতি করতে হয়- এই শিক্ষারই উন্মেষ ঘটুক রাজনীতিবিদদের মধ্যে সে কামনাই ফজলুল হক প্রেমী কোটি মানুষের ।

কেবি