বাংলাদেশ-ভারত অথবা বাংলাদেশ-মিয়ানমার যেই সীমান্তই হোক না কেন, সাম্প্রতিক সময়ে দুই প্রতিবেশী দেশের সীমান্ত রক্ষীদের হাতে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী নিহত হওয়ার জন্য বাহিনীটির সামরিক দুর্বলতাই বহুলাংশে দায়ী বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, সীমান্ত রক্ষায় সরকার বিজিবির মতো একটি শক্তিশালী বাহিনীকে নিয়োজিত করে তার পরিচালনার দায়িত্বে একজন মহাপরিচালক নিয়োগ করেছেন যিনি সীমান্ত রক্ষায় যে কোন তাৎক্ষনিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রাখেন।
ফজলুর রহমান বলেন, বর্তমানে বিজিবির দায়িত্বে নিয়োজিত মহাপরিচালকের কার্যক্রম দেখে মন হয় তিনি শুধু পতাকা বৈঠক আর নিহত বিজিবি জওয়ানদের লাশ ফেরত আনার কাজেই বেশি ব্যস্ত। অথচ সীমান্ত রক্ষায় সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন যে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তা যেন তিনি ভুলেই গেছেন।
সবশেষ গত ১৭ জুন বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তবর্তী নাফ নদীতে টহল দেয়ার সময় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশ-বিজিপির হাতে বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বিজিবির নায়েক আব্দুর রাজ্জাক অপহরণ এবং অপর সদস্য সিপাহি বিপ্লব কুমার দাস গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাকে দু:খজনক উল্লেখ করে ফজলুর রহমান বলেন, বিষয়টি সিরিয়াসলি নেয়া উচিত ছিল।

সাবেক এই বিজিবি ডিজি বলেন, আমি মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীদের অপহরণ বা গুলি করে মারার কথা বলছি না, কিন্তু সীমান্তে সরব উপস্থিতি (Aggressive Patrolling) অবশ্যই বাড়ানো উচিত ছিল। কিন্তু সেরকম কোন পদক্ষেপ আমরা দেখিনি।
তিনি বলেন, সরকারকে আমি দোষ দিতে চাই না। এর আগে রৌমারি সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফের বাড়াবাড়ি মোকাবেলায় আমরা তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। কিন্তু বর্তমান বিজিবির ডিজি সব ব্যাপারে সরকারের কুটনৈতিক পদক্ষেপের অপেক্ষায় থাকেন, যা একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের সীমান্ত রক্ষায় খুবই অবাস্তব বলে মনে হচ্ছে।
তবে, ফজলুর রহমানের মতে, মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীর বেপরোয়া আচরণের মূলে রয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যু। রোহিঙ্গাদের যেকোনভাবে বাংলাদেশে পুশইন করা এবং আটকে পড়া রোহিঙ্গাদের যাতে মিয়ানমারে ফেরত দেয়া না যায় সেজন্যই তারা বিজিবিকে মাঝে মধ্যে পরখ করে দেখছে। আর এর জবাবে দু:খজনক হলেও সত্যি যে বিজিবি চুপ করে আছে। আর বিজিবি প্রধান ধৈর্য ধরার নীতি অবলম্বন করছেন।
বিজিবির এই সাবেক মহাপরিচালক আশংকা প্রকাশ করে বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষীর হাতে আরও অনেক বিজিবি জওয়ানকে প্রান দিতে হতে পারে।
উদাহরণস্বরুপ তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ২৮ মেমিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপির গুলিতে নিহত হন বিজিবির নায়েক সুবেদার মিজানুর রহমান। ওই ঘটনার পর নানা গড়িমসি কর চারদিনের মাথায় ৩১মে মিজানের লাশ হস্তান্তর করে বিজিপি। ওই সময়ও বিজিবির ভূমিকা পতাকা বৈঠক ও লাশ গ্রহণ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
উল্লেখ্য, ওই ঘটনার প্রেক্ষিতে বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ তখন (৩১মে ২০১৪) এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেছিলেন, নিয়মিত টহলের অংশ হিসেবে বিজিবির একটি টহল দল পাইনছড়ি এলাকার ৫২ নম্বর বর্ডার পিলার (বিপি) এলাকায় টহল দিচ্ছিল। এ সময় কোনো প্ররোচনা ছাড়াই মিয়ানমার থেকে গুলি ছোড়া হয়। সম্পূর্ণ উসকানিমূলক মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা বিজিবির টহল দলের ওপর হামলা চালায়।
ওই হামলার সময় বিজিবির টহল সদস্যরা পিছু ফিরে এলেও নায়েক সুবেদার মিজান নিখোঁজ হন। পরে আরও সদস্য সেখানে যুক্ত হওয়ার পর পাইনছড়ির ৫২ নম্বর পিলারের কাছে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে গুলি লেগে নষ্ট হওয়া একটি মোবাইল ফোন পড়ে আছে, আর রক্তের ধারা চলে গেছে মিয়ানমারের দিকে। এরপর মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নিখোঁজ নায়েক মিজানকে ফেরত চাওয়া হয়। চারদিনের মাথায় বিজিপি মিজানের লাশ ফেরত দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহিদুজ্জামান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, আমরা নিজেদেরকে এতটাই দুর্বল পর্যায়ে নিয়ে গেছি যে, এখন মিয়ানমারের মতো দেশের কাছ থেকেও আমরা কাঙ্খিত আচরণ আশা করে বসে আছি। অথচ এটা সবাই বোঝে যে সীমান্তকে সুরক্ষা করতে হলে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার প্রমান দিতে হবে।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের মতো দেশের সীমান্ত রক্ষী আমাদের বিজিবির সদস্যদের হত্যা করছে, অপহরণ করছে, হাত কড়া দিয়ে ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় বেঁধে রাখছে-আর আমরা কিছুই করতে পারছি না।
অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান বলেন, এভাবে চলতে থাকলে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই দায় হয়ে যাবে। তাই সীমান্তে প্রতিপক্ষের শক্তি প্রদর্শনের বিপরীতে বাংলাদেশকেও নিজেদের শক্তিমত্তা প্রদর্শন করতে হবে।
তিনি বলেন, বিজিবির অপহৃত নায়েক আবদুর রাজ্জাককে যেভাবে অপমান অপদস্ত করা হয়েছে তার মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পতাকাকেই ভূলুন্ঠিত করা হয়েছে, অপমানিত করা হয়েছে বিজিবির ইউনিফর্মকে।
শাহিদুজ্জামান বলেন, দিনের পর দিন বিজিবির নিস্ক্রিয় ভূমিকার কারণে এখন মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীরা আমাদের সীমান্ত রক্ষীদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের চোখে দেখতে শুরু করেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও বিজিবি জওয়ানকে হারাতে হবে বলেও আশঙ্কা ব্যক্ত করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই অধ্যাপক।
উল্লেখ্য, গত ১৭ জুন ভোরে বিজিবির ছয় সদস্যের একটি দল নায়েক রাজ্জাকের নেতৃত্বে নাফ নদীতে টহল দিচ্ছিলেন। তাঁরা বাংলাদেশের জলসীমায় মাদক চোরাচালান সন্দেহে দুটি নৌকায় তল্লাশি করছিলেন।
এ সময় মিয়ানমারের রইগ্যাদং ক্যাম্পের বিজিপির সদস্যরা একটি ট্রলারে করে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে। একপর্যায়ে বিজিপির সদস্যদের বহনকারী ট্রলারটি বিজিবির টহল নৌযানের কাছে এসে থামে। বিজিপির ট্রলারটিকে বাংলাদেশের জলসীমা ছেড়ে যেতে বলা হলে তারা নায়েকরাজ্জাককে জোর করে ট্রলারে তুলে নেয়।
বিজিবির অন্য সদস্যরা এতে বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। এতে সিপাহি বিপ্লব কুমার গুলিবিদ্ধ হন। পরে বিজিপির ট্রলারটি রাজ্জাককে নিয়ে মিয়ানমারের দিকে চলে যায়।
বিজিপির এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণকে বিজিবির দীর্ঘদিনের সামরিক দুর্বলতার ফল হিসেবে উল্লেখ করে অধ্যাপক শাহিদুজ্জামান আর বিলম্ব না করে সীমান্ত রক্ষীকে স্বাধীনভাবে কাজ করার এখতিয়ার প্রদানে সরকারের প্রতি আহবান জানান।

এদিকে, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বিজিপির কাছ থেকে নায়েক রাজ্জাককে ফেরত আনার পর বৃহস্পতিবার বিকেলে (২৫ জুন ২০১৫) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের সীমান্ত রক্ষী বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদের বক্তব্যেও ছিল নতজানু মনোভাব।
তিনি বিজিপির প্রতি কোন হুঁসিয়ারি উচ্চারণ তো দূরের কথা উল্টো বিজিপির অভিযোগের জবাব দিতেই যেন ব্যস্ত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বিজিপির সাথে প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টার একটি বঠৈক হয়। যেখানে বিজিপি অভিযোগ করেছে যে বিজিবি নায়েক রাজ্জাক এবং তার দল ওই দিন ইউনিফর্ম ছাড়াই দ্বায়িত্বরত ছিলো। আমরা এই অভিযোগ প্রত্যখ্যান করে বলেছি যে, আমাদের কোন সদস্যকেই ইউনিফর্ম ছাড়া ডিউটি করতে দেওয়া হয়না।
মহাপরিচালক বিজিপির দ্বায়ের করা অপর অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, তারা অভিযোগ করে বলছে যে আমাদের বিজিবি সদস্যরা জিরো লাইন অতিক্রম করে ডিউটি করছিলো। আমরা সেটাও প্রত্যখ্যান করে বলেছি আমাদের সদস্যরা নির্দিষ্টি সীমানার মধ্যে থেকে সন্দেহভাজন নৌকা তল্লাসি করছিলো।
সংবাদ সম্মেলনে বিজিবি মহাপরিচালক আরও বলেন, দায়িত্বপালনরত বিজিবির সদস্যদের ওপর বিজিপির কিছু সদস্য সিভিল পোশাকে এসে অতর্কিত আক্রমন করে এবং এক পর্যায়ে নায়েক রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যায়।
সাংবাদিকরা এ সময় বিজিবি মহাপরিচালকের কাছে জানতে চান এত কিছুর পরও আপনাদের পদক্ষেপ কি শুধু পতাকা বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে? এ প্রশ্নের কোন সুস্পষ্ট জবাব না দিয়ে তিনি শুধু বলেন, পতাকা বৈঠকই আমাদের শেষ পদক্ষেপ না পরবর্তীতে আমরা প্রয়োজনে আরও বিকল্প পন্থা গ্রহণ করবো।
এদিকে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে বিজিবি সদস্যকে দ্রুত ফেরত দিতে বলে। অপরদিকে, বিজিবির পক্ষ থেকে কয়েক দফা পতাকা বৈঠকের উদ্যোগের কথা বলা হলেও মিয়ানমারের বিজিপি রাজি হয়নি। উল্টো বিজিপির ফেইসবুক পেইজে নায়েক রাজ্জাকের দুটো ছবি প্রকাশ করা হয়, যাতে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাতকড়া পড়া দেখা যায়।

আর এমনই অবস্থার মধ্যে রাজ্জাকের স্ত্রী আসমা বেগম গত রবিবার সকালে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। বিষয়টি সংবাদের শিরোনাম হলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে মিয়ানমারের সমালোচনা করেন অনেকে।
জাতীয় সংসদেও এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন একজন এমপি। সবশেষ বিজিপি রাজি হওয়ায় অপহৃত নায়েক আবদুর রাজ্জাককে ফিরিয়ে আনতে আজ বৃহস্পতিবার (২৫জুন ২০১৫) মিয়ানমারের মংডুতে পতাকা বৈঠকে অংশ নিতে সেখানে যান বিজিবির প্রতিনিধিদল।
শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষীর খামখেয়ালিপনা ও বেপরোয়া আচরণের কাছেও যদি বিজিবিকে জিম্মি হয়ে থাকতে হয় তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যত অস্তিত্ব কতটা অক্ষুন্ন থাকবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশের সাধারণ মানুষ। ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে তারা এমন উদ্বেগ ব্যক্ত করে সরকারের সতর্ক পদক্ষেপ কামনা করেছেন।
কেবি





