কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সরিষাক্ষেতে মৌমাছির খামার করে সহজেই মধু সংগ্রহ লাভজনক ব্যবসা হয়ে দেখা দিয়েছে।
এতে কৃষকের একদিকে মধু বিক্রি করে অর্থনৈতিক ভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অন্যদিকে ক্ষেতে মধু চাষ করায় সরিষার ফলনও হয় বেশি। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতায় চলতি বছরে উপজেলায় সরিষা ক্ষেতে মধু চাষের ১৩টি খামার গড়ে তোলা হয়েছে।
কোনো দুর্যোগ না এলে সরিষায় বাম্পার ফলনের পাশাপাশি মধু বিক্রি করে লাভবান হবে কৃষক বলে মনে করছেন মৌ-চাষীরা। সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি খামার করে মধু চাষে উজ্জল সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।
রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আজিজুল হক জানান, সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি থাকলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফলন বাড়ে। এতে সরিষার ফুলে মৌমাছি যে পরাগায়ন ঘটায় তাতে সরিষার দানা ভালো হয় এবং ফলনও বাড়ে। যে সরিষা ক্ষেতে মৌমাছি নেই সেখানে সরিষার ফলন কম হয়। সরিষা ক্ষেতে মধুর খামার গড়ে তোলার জন্য আমরা সব সময় কৃষককে উৎসাহ দিয়ে থাকি।
ওই কর্মকর্তা জানান, সরিষা ক্ষেতে মধুর খামার গড়ে তোলার প্রচলন ছিল না। গত বছর ফরহাদ হোসেন নামের এক কৃষক সরিষা ক্ষেতে মধু চাষ করে লাভবান হয়েছে। ওই খামার দেখে অনেকেই মধু চাষে আগ্রহ দেখায়।
সরিষা ক্ষেতে মধু চাষ ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে দিতে হলে সরকারি ভাবে কৃষকদের মাঝে সতেনতা সৃষ্টি, পুঁজির যোগান, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং মধু বিপননের ব্যবস্থা করতে হবে। মূলত পৃষ্ঠপোষকের অভাবে সরিষা ক্ষেতে মধুর খামার করতে পারছে না কৃষক। তাছাড়া ওই খামার যে ব্যাপক লাভজনক সেটাও জানে না অনেক স্থানের কৃষক। কুড়িগ্রাম জেলার ৯ উপজেলায় যে পরিমাণ জমিতে সরিষার চাষ হয়ে থাকে তার অর্ধেক চাষ হয় রৌমারীতে।
এ বছরও উপজেলার পূর্বাঞ্চল সীমান্ত এলাকা গুলোতে প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। রৌমারী কৃষি অফিস সূত্রে এসব তথ্য জানাযায়।
সরেজমিনে সরিষা ক্ষেতে মধুর খামারে দেখা গেছে, সরিষা ক্ষেতের পাশেই সারি বদ্ধভাবে বসানো হয়েছে মৌমাছির বাক্স। হাজার হাজার মৌমাছি হলুদ রঙের সরিষার ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে বাক্সে জমা করছে। ৭/৮ দিন পর পর ওই সব বাক্স থেকে বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে মধু সংগ্রহ করা হচ্ছে।
প্রতি বাক্সে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মৌমাছি আর একটি মাত্র রানী মৌমাছি থাকে। রানী মৌমাছি ডিম দেয়। মৌমাছির নাম ‘এফিস মিলি ফেরা’ জাতের মাছি। সারাদিন মাছি গুলো সরিষার ফুলে পরাগায়ন ঘটায় এবং মধু সংগ্রহ করে। এতে প্রায় ৩ কিলোমিটার দুরের সরিষা ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহ করে মাছি গুলো। প্রতি বাক্স থেকে প্রতি সপ্তাহে ২৫ থেকে ৩০ লিটার মধু পাওয়া যায়।
মধু চাষী ফরহাদ হোসেন জানান, আমার খামারে মোট দেড়শ’র মতো বাক্স রয়েছে। প্রতিবাক্সে ৯/১০টি করে মোমের ফ্রেম রয়েছে। মোমের ফ্রেমে মাছি মধু জমা করে আর রানী মাছি ডিম দেয়। যখন ফ্রেমগুলো মধুতে ভরে যায় তখন বাক্স থেকে ফ্রেম গুলো খুলে বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাছি মুক্ত করা হয় এবং ড্রামের মধ্যে ঘুরাইয়া (ঘুর্ণায়মান ড্রাম) মধু পৃথক করে নেওয়া হয়। খামার করতে খরচের মধ্যে একটা বাক্স ৬০০ টাকা, একটা মোমের ফ্রেম ৫০০ টাকা। বাক্সভর্তি মৌমাছি নারায়নগঞ্জ থেকে কিনে আনা হয়েছে।
সরিষা ক্ষেত থেকে সংগ্রহ করা এসব মধু ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা লিটারে বিক্রি করা যায়। এ বছর তিনি ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা লাভের আশা করছেন। ফরহাতের মতো আরো ১১জন মধু চাষি খামার করেছেন রৌমারীতে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আজিজুল হক বলেন, ‘মধু মধুই। ফুলের ওপর নির্ভর করে মধুর ভিন্নতা। সরিষার ফুল থেকে যে মধু পাওয়া তার দাম একটু কম। সুন্দরবনের মধুর দাম একটু বেশি। রৌমারীতে প্রতিবছর যে পরিমাণ সরিষার আবাদ হয় তাতে অর্থনৈতিক দিক থেকে উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। আর এ কারনে সাতক্ষীরা জেলা থেকে ৯জন খামারিকে সব ধরণের সহযোগিতা প্রদান করে রৌমারীতে আনা হয়েছে। শরিষা ক্ষেতের মৌমাছির খামার গড়ে তোলার কারনে এ বছর রৌমারী থেকে প্রায় ৬০টন মধু পাওয়ার আশা করা হচ্ছে। যার বাজার দাম হবে দুই কোটি টাকা। একই ভাবে মৌমাছির খামার থাকার কারনে রৌমারীর কৃষক দেড়শ’ টন শরিষা বেশি পাবে।’
আর এই মধুর রয়েছে অসংখ্য গুণ। শরীরের ভেতর এবং বাইরে থেকে এটি সমান কাজ করে। রূপচর্চায় মধুর ব্যবহার অপরিহার্য।
বয়স কমিয়ে তারুণ্যকে ধরে রাখতে মধুর জুড়ি নেই। মধুতে থাকা বিভিন্ন উপকারী উপাদান ত্বকের কোষ পুনর্গঠনে সাহায্য করে এবং ত্বক টানটান রাখে।
মধু প্রাকৃতিক এন্টি-সেপটিক হিসেবেও খুব ভালো কাজ করে। খাঁটি মধুতে রয়েছে ‘ইনহিবিন’ যা এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধকারী এজেন্ট। পোড়া বা কাটা জায়গায় মধু লাগানোর মাধ্যমে ব্যথা কমে যায় এবং এটি ক্ষত স্থান থেকে ব্যাকটেরিয়া দূর করে যার ফলে ইনফেকশন হয় না। এছাড়াও এটি খুব দ্রুত ক্ষত স্থানের কোষ গঠনে সাহায্য করে।
ময়েশ্চারাইজার হিসেবে মধু বেশ কার্যকরী। নিমিষেই এটি ত্বককে নরম ও মসৃণ করে তোলে। যাদের ত্বক শুষ্ক তারা মুখে মধু লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহারে ত্বক নরম ও উজ্জ্বল হবে।
মুখের দাগ দূর করতে মধু, আমণ্ড অয়েল, গুঁড়া দুধ এবং লেবুর রস পরিমাণমত মিশিয়ে ফেইস মাস্ক হিসেবে লাগান। ১০-১৫ মিনিট রেখে মুখ ধুয়ে ফেলুন। ব্রণ বা রোদে পোড়া দাগ দূর করতে এই প্যাকটি বেশ কার্যকরী।
দেহের অতিরিক্ত ওজন কমাতে সকালে খালি পেটে এক গ্লাস হালকা গরম পানিতে এক চা চামচ মধু ও ২ চা চামচ লেবুর রস মিশিয়ে পান করুন। তবে গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থাকলে খাবেন না বা ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিবেন।
চুল সিল্কি রাখতে ও চুলের ফ্রিজি ভাব দূর করতে শ্যাম্পু করার পর কন্ডিশনারের সাথে এক চামচ মধু মিশিয়ে চুলের নিচের অংশে ভালো মতো লাগিয়ে কিছুক্ষণ পর চুল ভালো মতো ধুয়ে ফেলুন। চাইলে কন্ডিশনারের বোতলে পরিমাণমত মধু মিশিয়ে রেখে দিতে পারেন।
দুই চামচ মধু, আধা চামচ চিনি এবং কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে তৈরি করুন হানি স্ক্রাব। এই স্ক্রাবটি ২-৩ মিনিট মুখে হালকা ভাবে ম্যাসাজ করে মুখ ধুয়ে ফেলুন। চিনি খুব ভালো এক্সফলিয়েটিং এজেন্ট হিসেবে কাজ করে, লেবু ত্বকের দাগ দূর করে এবং মধু ত্বকে পুষ্টি জুগিয়ে একে নরম ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল করে তোলে।
লিপবাম হিসেবেও ব্যবহার করতে পারেন মধু। এক চামচ আমণ্ড অয়েল এবং এক চামচ মধু মিশিয়ে লিপবাম পটে সংরক্ষণ করুন। এটি ঠোঁট ফাটা রোধ করে এবং ঠোঁটে গোলাপি আভা নিয়ে আসে।
তাই মৌচাষীরা এই মধু চাষে সরকারের পৃষ্টপোষকতা পেলে আরো সাফল্য এবং অধিক লাভবান হবে পাশাপাশি অসংখ্য বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করেন।
এমএ





