ব্রিটেনে ঘরবাড়ির মূল্য আগামী ১০ বছরে আরও ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। অব্যাহত চাহিদা বৃদ্ধির বিপরীতে পর্যাপ্ত ঘরবাড়ি নির্মাণ না হওয়ার কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সেন্টার ফর ইকোনোমিক্স এন্ড বিজনেস রিসার্চ (সিইবিআর)। ফলে ইতিমধ্যে সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়া হাউজিং খাত আরও বেশি নাগালের বাইরে চলে যাবে।
এদিকে, গত কয়েক বছর যাবত ব্রিটেনের বেশিরভাগ কাউন্সিলে কাউন্সিল ট্যাক্স স্থির থাকলেও আগামী বছরগুলোতে তা বদ্ধি পাবে বলে আভাস দেয়া হয়েছে।
দি সানডে টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৯/২০ সাল নাগাদ বেন্ড থ্রি হাউজের ক্ষেত্রে কাউন্সিল ট্যাক্সের পরিমাণ এক শ পাউন্ড পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকারী ব্যয় কর্তনের বিপরীতে কাউন্সিলগুলোর সেবাখাতের ব্যয় নির্বাহের জন্য এই কাউন্সিল ট্যাক্স বাড়ানো হবে।
এছাড়া গত ১৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার ডেইলি ইন্ডিপেনডেন্টে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, আরএসএ নামের একটি গবেষণা সংস্থা বেনিফিট ব্যবস্থা বাতিল করে এর পরিবর্তে ‘সিটিজেন ওয়েইজ’ চালু করার জন্য সরকারকে পরামর্শ দিয়েছে।
থিংক ট্যাঙ্কটি বলছে, ‘সিটিজেন ওয়েইজ’ চালু হলে বহুমুখি বেনিফিট আদায় নিয়ে যে ধোঁয়াশা রয়েছে সেটা কেটে যাবে। এই ব্যবস্থায় ধনি গরিব নির্বিশেষে সকল নাগরিককে বছরে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের কথা বলা হয়েছে।
বাড়বে ঘরবাড়ির মূল্য:
ব্রিটেনে ঘরবাড়ির মূল্য আগামী বছরগুলোতে আরও বৃদ্ধি পাবে। সেন্টার ফর ইকোনোমিক্স এন্ড বিজনেস রিচার্স (সিইবিআর) এর পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০১৫ সালে ব্রিটেনে ঘরবাড়ির মূল্য অন্তত ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। ন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব স্টেইট এজেন্টস (এনএইএ) ও এসোসিয়েশন অব রেসিডেন্সিয়াল লেটিং এজেন্টস (আর্লা) এর পরামর্শে হাউজিং নিয়ে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিইবিআর।
সিইবিআর এর প্রাক্কলন অনুযায়ী, বর্তমানের ন্যায় ২০২৫ সালেও ঘরবাড়ির গড় মূল্য সবচেয়ে বেশি থাকবে লন্ডনে। তখন এখানকার ঘরবাড়ির গড় মূল্য হবে ৯ লাখ ৩১ হাজার পাউন্ড। লন্ডনের বাইরের ঘরবাড়ির ক্ষেত্রে এই গড় মূল্য হবে ৪ লাখ ১৯ হাজার পাউন্ড। বর্তমানে লন্ডনে ঘরবাড়ির গড় মূল্য ৫ লাখ ১৫ হাজার পাউন্ড এবং লন্ডনের বাইরে এই গড় মূল্য ২ লাখ ৮০ হাজার পাউন্ড।
বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে ২০২৫ সালে ব্রিটেনে ঘরবাড়ির মূল্য কেমন হবে তারও একটি আভাস দিয়েছে সিইবিআর। আভাস অনুযায়ী ২০২৫ সালে দক্ষিণ পূর্ব ব্রিটেনে ঘরবাড়ির গড় দাম হবে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬ পাউন্ড। ইস্ট ইংল্যান্ডে এই হার হবে ৫ লাখ ৭৪ হাজার ৩৭৪ পাউন্ড। সাউথ ওয়েস্টে দাম হবে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার পাউন্ড।
এছাড়া, স্কটল্যান্ড, ইয়র্কশায়ার, হাম্বার, নর্থ ওয়েস্ট ইংল্যান্ড, ইস্ট এবং ওয়েস্ট মিডল্যান্ডে ঘরবাড়ির গড় মূল্য ২ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওয়েলসে গড় দাম হবে ২ লাখ ১৭ হাজার পাউন্ড।
তবে এই সময় ব্রিটেনের মধ্যে ঘরবাড়ির মূল্য সবচেয়ে কম হবে নর্দান আয়ারল্যান্ডে। আভাস অনুযায়ী নর্দান আয়ারল্যান্ডে ঘরবাড়ির গড় মূল্য হবে ১ লাখ ৮৭ হাজার পাউন্ড।
এনএইএ’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক মার্ক হেওয়ার্র্ড বলেন, ঘরবাড়ির মূল্য একদিকেই ছুটছে এবং সেটা উর্ধ্ব গতির দিকে। ইতোমধ্যে অনেক ক্রেতা হাউজিং মার্কেট থেকে ছিটকে পড়েছেন। স্বল্প আয়ের মানুষ যারা বাড়ি কেনার অপেক্ষায় আছেন তাদের জন্য এই মূল্য বৃদ্ধির খবর নিঃসন্দেহে দুঃখজনক।
তিনি বলেন, আয়ের অব্যহত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি হাউজিং খাতের মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিতে মর্গেজ প্রদানে বাড়তি কড়াকড়ি এবং প্রয়োজনীয় হারে সহনীয় ঘরবাড়ি নির্মাণ না হওয়ায় সাধারণ মানুষের জন্য বাড়ির মালিক হওয়ার স্বপ্ন অলিক হয়ে উঠবে।
এছাড়া ২০০৭ সালের বিশ্বমন্দা মোকাবেলার জন্য ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার সর্বনিম্নে (শূণ্য দশমিক ৫ শতাংশ) নামিয়ে আনে। গত কয়েক মাস ধরেই ওই সুদের হার বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে।
গত সপ্তাহে আমেরিকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বৃদ্ধি করে। ধারণা করা হচ্ছে ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও শিগ্রই একই পথে পা বাড়াবে। সুদের হার বাড়ানো হলে সাধারণ মানুষের বাড়ি কেনার স্বপ্ন আরও বেশি আকাশ কুসুম হয়ে উঠবে।
বৃদ্ধি পাবে কাউন্সিল ট্যাক্স
বিগত কয়েক বছর ধরে সরকারী বেনিফিট কর্তনের ধকল মোকাবেলায় কাউন্সিল ট্যাক্স বৃদ্ধি স্থবির ছিলো। বেশিরভাগ কাউন্সিল তাদের বাসিন্দাদের জন্য কাউন্সিল ট্যাক্স বৃদ্ধি করেনি।
কিন্তু গত ১৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার দি সানডে টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারী পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০১৯/২০ অর্থবছরের মধ্যে ব্যান্ড থ্রি হাউজের ক্ষেত্রে কাউন্সিল ট্যাক্সের পরিমাণ এক শ পাউন্ড পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ২০১৬ সাল থেকে প্রতি বছর সর্বোচ্চ ২৩ পাউন্ড পর্যন্ত কাউন্সিল ট্যাক্স বৃদ্ধি পাবে। ব্রিটেনের ১২৪টি কাউন্সিলে অনুসন্ধান করে দি সানডে টেলিগ্রাফ এ বিষয়ে সত্যতা পেয়েছে।
বর্তমানে ইংল্যান্ডে ব্যান্ড থ্রি ক্যাটাগরির একটি হাউজের ক্ষেত্রে কাউন্সিল ট্যাক্স এক হাজার ৪৫৯ পাউন্ড। ট্যাক্স বৃদ্ধির ফলে ২০১৯/২০ সাল নাগাদ একই ক্যাটাগরির হাউজের ক্ষেত্রে ট্যাক্সে পরিমাণ হবে এক হাজার ৫৬০ পাউন্ড।
কাউন্সিল ট্যাক্স বৃদ্ধির বেশির ভাগই ঘটেছে ঘরবাড়ির ওপর চাপানো ২ শতাংশ লেভির কারণে। বয়স্ক এবং ঝুকিতে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তার খরচ যোগাতে সরকারের পক্ষ থেকে এই বাড়তি লেভি চাপানো হয়।
কমিউনিটিজ সেক্রেটারি গ্রেগ ক্লেয়ার্ক লেভি চাপানোর বিষয়টিকে স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য একটি ঐতিহাসিক সমাধান বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, এর ফলে স্থানীয় সেবাখাতের অর্থায়নে কাউন্সিল স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি পূর্ণ দায়বদ্ধ হলো। কেন্দ্রীয় সরকারের এতে কোনো দায় থাকলো না।
বেনিফিট ব্যবস্থা বাতিল করে ‘সিটিজেন ওয়েইজ’
আরএসএ নামে একটি থিংক ট্যাঙ্ক সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেছে, বর্তমান বেনিফিট ব্যবস্থা বাতিল করে যাতে সিটিজেট ওয়েইজ চালু করা হয়।
সংস্থাটির সুপারিশ অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন শর্ত পূরণ সাপেক্ষে লোকজন যেসব বেনিফিট পেয়ে থাকেন, সিটিজেট ওয়েইজ এর ক্ষেত্রে তেমন হবে না। বরং দেশের সকল নাগরিককে বছরে একটি ন্যূনতম আয়ের ব্যবস্থা করে দেযা হবে। যারা কাজে আছেন কিংবা যারা কাজে নেই সকলেই এই সুবিধা পাবেন।
সুপারিশ অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিক সপ্তাহে ৭১ পাউন্ড বা বছরে তিন হাজার ৬৯২ পাউন্ড পাবেন। শিশুদের জন্যও একটি ভাতা বরাদ্দ থাকবে। পেনশনওয়ালারা পাবেন বছরে সাত হাজার ৪২০ পাউন্ডের সিটিজেন পেনশন।
তবে সিটিজেট ওয়েইজ-এ হাউজিংয়ের বিষয়টি যুক্ত থাকবে না। সিটিজেট ওয়েইজের বাইরে বিভিন্ন অঞ্চল ভেদে হাইজিংয়ের জন্য সহায়তা চালু থাকবে। আরএসএর মতে, সিটিজেট ওয়েইজ হবে বর্তমান বেনিফিট ব্যবস্থার চাইতে অনেক বেশি সরল এবং ন্যায্য। সিটিজেন ওয়েইজ পাওয়ার জন্য নাগরিকদের জব সেন্টারে সাইন ইন করতে হবে না।
আরএসএর পলিসি এবং স্ট্র্র্যাটেজি বিষয়ক পরিচালক এন্থনি পেইন্টার বলেন, তাদের প্রস্তাব কল্যাণ রাষ্ট্র ব্রিটেনের বেনিফিট ব্যবস্থায় আধুনিক সমাজের প্রতিফলন ঘটাতে সক্ষম হবে।
তবে বিভিন্ন পক্ষ থেকে আরএসএর প্রস্তাবের বিরোধীতা করা হয়েছে। ইউগভ পরিচালিত এক জরিপে ৫৩ শতাংশ মতামতদাতা প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করেছে। এর বিপরীতে মাত্র ১৮ শতাংশ মতামতদাতা বলেছেন, তারা প্রস্তাবের পক্ষে।
কেবি





