বিখ্যাত চিত্রশিল্পী লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চির আঁকা একটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম হচ্ছে 'লেডি উইথ এন আরমাইন'। এ চিত্রকর্মটি নিয়ে একটি যুগান্তকারী আবিষ্কার করেছেন ফরাসি এক প্রকৌশলী। তার এই আবিষ্কারের মাধ্যমে চিত্রকর্ম সম্পর্কে নতুন এক ধারণার উন্মেষ হলো। খবরটি গত সোমবার প্রকাশ করে বিবিসি।
'লেডি উইথ এন আরমাইন' চিত্রকর্মটি ৫০০ বছরের পুরনো। ধারণা করা হয় ১৪৮৯ থেকে ১৪৯০ সালে এই চিত্রকর্মটি আঁকেন ইতালীয় চিত্রশিল্পী ভিঞ্চি। চিত্রকর্মটিতে মূলত তৎকালীন সময়ের ডিউক রাজা লুডোভিকো স্ফর্জার প্রিয় উপপত্নী সিসিলিয়া গ্যালরানীর।
ভিঞ্চি তার চিত্রটিতে আরমাইন (নকুল জাতীয় জন্তু বিশেষ) কোলে সিসিলিয়াকে ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু ফরাসি প্রকৌশলী প্যাসকেল কোটের কাজটি হচ্ছে অন্য জায়গায়। এতদিন সবার সাদামাটা চোখে দেখা যেত যে, চিত্রকর্মটির তিনটি অংশেই সিসিলিয়ার কোলে আরমাইন রয়েছে। কিন্তু এবার প্যাসকেল দেখিয়ে দেন যে, তিনটি অংশেই সিসিলিয়ার কোলে আরমাইন ছিল না, বরং দুটি অংশে ছিল। আরেকটি অংশে সিসিলিয়াকে আরমাইন ছাড়াই অংকিত করেছেন লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি।
কিন্তু এই বিষয়টিই এতদিন কারো জানা ছিল না। ফরাসি প্রকৌশলী প্যাসকেল 'শেডিং নিউ লাইট' প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিত্রকর্মটিতে লুকিয়ে থাকা এই রহস্য বের করেছেন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি দেখান যে, চিত্রকর্মটির তিনটি অংশের প্রথম অংশে সিসিলিয়ার কোলে আরমাইন নেই। পরের অংশে কম লোমবিশিষ্ট একটি আরমাইন কোলে, আর তৃতীয় ও শেষ অংশে ঘন ও লম্বা লোমবিশিষ্ট আরমাইন কোলে রয়েছেন সিসিলিয়া।
এই ছবির মাধ্যমে আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায়; সেটি হচ্ছে বর্তমানের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অভিজাত শ্রেণীর লোকদের পালিত জন্তু নিয়ে যাওয়ার ফ্যাশন ৫০০ বছরেরও পুরোনো এবং প্যাসকেল কোটে এই বিষয়টিও প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন।
লিওনার্দো গবেষকরা বলেছেন, এই প্রতিকৃতিগুলোর আবিষ্কার খুবই বিস্ময়কর এবং চিত্রশিল্পের ইতিহাস সম্পর্কে নতুন প্রশ্নের দ্বার উন্মোচন হয়েছে ।
মনের পরিবর্তন
মনে করা হয় এই প্রতিকৃতিটি ১৪৮৯ এবং ১৪৯০ সালে আঁকা হয় । লিওনার্দোকে আঠার বছর পৃষ্ঠপোষকতা করেন ডিউক যখন তিনি ডিউক-এর শহরে ছিলেন । ডিউককে 'হোয়াইট আরমাইন' নামে ডাকা হত ।
মি. কোটে প্যারিসের লুমিয়ার টেকনোলজির সহ-প্রতিষ্ঠাতা , তারা একটি প্রযুক্তি আবিষ্কার করেন যার নাম লেয়ার এম্পলিফিকেশন মেথড (এলএএম)। এই মেথড চিত্রকর্মের উপর তীব্র আলোর সিরিজ প্রবাহের কাজ করে, তারপর একটি ক্যামেরার মাধ্যমে আলো এবং আলোর প্রতিফলন পরিমাপ করা হয় ।
এর মাধ্যমে মি. কোটে বিশ্লেষণ এবং পুনর্গঠন করে দেখান যে ছবির উপরিভাগে কি হয়েছে । এর ফলে নতুন একটি থিওরির প্রয়োগ হলো বিখ্যাত ছবিতে। এই ছবির মাধ্যমে আরমাইনটি কে গ্যালারানির ভালোবাসার মানুষ এর প্রতীক তার রক্ষাকর্তা হিসেবেও আবিষ্কৃত ও উপস্থাপিত হয়। আরেকটি তত্ত্ব রয়েছে যে, গ্যালারানি নিজে আর্টিস্টকে বলেছিলেন তার ছবির সাথে আরমাইনটিকে সংযুক্ত করতে যাতে তার এবং ডিউকের সম্পর্ক সম্পর্কে মিলানের আদালত অবহিত হয় ।
মি. কোটে বলেন, এলএএম প্রযুক্তির মাধ্যমে এই শিল্পকর্ম সম্পর্কে জানা যাবে পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতই ।
তিনি বলেন, " আমরা আবিষ্কার করেছি যে, লিওনার্দো সবসময় তার চিন্তার পরিবর্তন করতেন যেমন তিনি কোন বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েন তাহলে এর ফলে তিনি কোন কিছু মুছে ফেলেন অথবা যোগ করেন, তিনি তার মন বারে বারে পরিবর্তন করেন। "
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ইতিহাস এর এমিরেটাস অধ্যাপক বলেন, "প্যাসকেল কোটে যা প্রকাশ করেছেন তা অসাধারণ । এটা আমাদেরকে লিওনার্দোর মনমানসিকতা সম্পর্কে অনেক কিছু জানায় যখন তিনি ছবি আঁকতেন। আমরা জানি যে তিনি ভালো কাজের শুরুতে অনেক সময় নষ্ট করতেন কিন্তু এখন আমরা জানতে পারলাম তিনি চিত্রকর্মে সবসময় বেশি সময় দিতেন এবং এর ফলে ব্যাখ্যা করা যায় তার ছবি আঁকা শেষ করতে এত কষ্ট হত কেন।"
এই চিত্রকর্মটি Czartoryski Foundation এর দায়িত্বে পোল্যান্ডের ক্রাকাও এ অবসিথত জাতীয় জাদুঘরে দেখানো হয়, জাদুঘরের সংস্কারের কারণে ছবিটি এখন ওয়ায়েল প্যালেসের কাছাকাছি ঝুলন্ত আছে ।
২০১১ সালের জাতীয় গ্যালারি প্রদর্শনীতে "লেডি উইথ এন আরমাইন" ছিল মূল আকর্ষণ ( লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি: পেইন্টার এট দি কোর্ট অফ মিলান)।
এই চিত্রকর্মটি এর আগেও অনেকবার এক্স-রে এবং ইনফ্রারেড রশ্মি দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। সূত্র: বিবিসি
ইআর/এসএমএ





