এখন সব ভুলে গেছি। বাজারে সবকিছুর দাম বাড়তি। চাল থেকে শুরু করে ডাল এমনকি চিনি-লবণ পর্যন্ত বাড়তি দরে কিনতে হয়। পেঁয়াজ ও তেলের দাম আকাশচুম্বী। মাংস তো কেনাই যায় না। সবজির দামও অনেক। তাই যা জুটছে তা কিনে খেয়েপরে বাঁচতে হচ্ছে। এসব দেখার কেউ নেই।
আয়ের সঙ্গে খরচের ভারসাম্য রাখতে গিয়ে নিম্ন-মধ্যবিত্তদের কাটছাঁট করতে হচ্ছে প্রতিদিনের বাজার তালিকা। এভাবে দ্রব্যমূল্যের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সাধারণ মানুষ। তাদের মতে, ব্যয় এতই বেড়েছে যে জীবন চালানো দায় হয়ে পড়েছে। নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে মানুষের জীবনে কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জরুরি নিত্যপণ্য চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা-ময়দা, পেঁয়াজসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যগুলোর দাম বেড়েই চলেছে। একইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মসলা জাতীয় পণ্যের দামও। আর সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। টিসিবির পন্ন টাকা দিয়ে কিনতে গিয়েও হয়লানীর শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
৪ ফেব্রুয়ারি মালিবাগ কাঁচাবাজারে দোকান সাজিয়ে বসা বিক্রেতারা জানালেন, একে তো সরবরাহ কম তার ওপর ছুটির দিনের বাড়তি চাহিদা। দুই মিলে সপ্তাহের অন্যদিনের তুলনায় বেড়েছে সবজির দাম।
বাজার করতে আসা আর এক ব্যক্তি বলেন, আমরা যারা চাকরিজীবী এই বাজারদর পুরোপুরি ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। মাছের বাজারে সরবরাহে ঘাটতি না থাকলেও বাড়তি দাম।
এক বিক্রেতা বলেন, মাছের সরবরাহ আছে। কিন্তু দামও বেড়েছে। এবং সবাই কেনেও। অপর এক বিক্রেতা বলেন, যে মাছ গতকাল বিক্রি করেছি ১১০০ টাকা, সেটি আজ বিক্রি করছি ১৩০০ টাকা। মাছের বাজারে আসা এক ক্রেতা বললেন, করোনা পরিস্থিতি হিসেবে দাম আসলেই অনেক বেশি। এটা হতাশাজনক।
এই বাজারে কয়েক সপ্তাহ ধরেই খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৯শ' টাকা কেজি। গরুর মাংসের দাম কেজিতে ২০-৪০ টাকা বেড়ে দুদিন ধরে বিক্রি হচ্ছে ৬২০ টাকায়। বেড়েছে ব্রয়লার ও দেশি মুরগির দামও।
একজন মুরগি বিক্রেতা বললেন, দেশি মুরগী গত সপ্তাহের চেয়ে এই সপ্তাহে জোড়ায় ৫০ টাকা বেড়েছে। তিন/চারদিন ধরে বাড়ছে প্রোটিনের সহজ যোগানদার ডিমের দাম।
একজন মুরগী ক্রেতা বললেন, বাজার তো করতে হবে। না খেয়ে তো থাকতে পারব না। সরকার তো আর এদিকে নজর দিচ্ছে না। ফার্মের মুরগির লাল ও সাদা ডিম ডজনে ৫ টাকা বেড়ে ১০৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চালের আড়তের মহিউদ্দিন বলেন, সরকার বলছে পর্যাপ্ত চাল মজুদ আছে। দেশে চালের কোনো ঘাটতি নেই। এরপরও কেন চালের দাম বাড়ছে এই প্রশ্ন আমারও। তিনি বলেন, ধারনা করা হচ্ছে, মিলাররা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়াচ্ছে। মিল মালিকদের নিয়ন্ত্রনে না আনতে পারলে- বাজার নিয়ন্ত্রনে রাখা সম্ভভ না।
গত এক মাসের ব্যবধানে মোটা চালের দাম বেড়েছে সাড়ে ৪ শতাংশ, চিকন চালের দাম সোয়া ৩ শতাংশ, আটার দাম ৯ শতাংশ, মসুর ডালের দাম ৯ শতাংশ, পেঁয়াজের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।
ভোজ্যতেলে দাম লিটারে সর্বোচ্চ বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। প্রতিকেজি আদা ১৫ শতাংশ ও রসুন ১৪ শতাংশ, গরু ও খাসির মাংসের দাম প্রায় ৬ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি প্রতিকেজি চিনির দাম ৩ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিহালি ডিমের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৭৮। এছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে পরিবহণ খরচ ও সেচ খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় সবজির দাম বেড়েছে গড়ে ৪ শতাংশ।
এভাবে সব পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে। গত এক মাসের ব্যবধানে তো আয় বাড়েইনি। গত এক বছরের ব্যবধানেও বাড়েনি। উলটো অনেকের আয় কমেছে। ফলে ভোক্তাদের জীবনযাত্রার মানের সঙ্গে আপস করে খাদ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে ছাড় দিতে হয়েছে।
এর মধ্যে খাদ্যে বাজেট কমছে। একই সঙ্গে শিক্ষা ও চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাড়া খাতে ব্যয় কমছে। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভালো শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্য বাজেটে কাটছাঁট করায় পুষ্টি গ্রহণের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার শঙ্কা আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপেও পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে অপুষ্টিতে ভোগার তথ্য উঠে এসেছে। পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে মানুষ যে কতটা অসহায় তা একজন ভোক্তার বক্তব্য থেকে পষ্ট হয়ে ওঠে।
রাজধানীর কাওরান বাজারে একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা সাইফুল আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দুই ছেলে, স্ত্রী ও বৃদ্ধ মাকে নিয়ে আমার পরিবার। শান্তিনগর এলাকায় থাকি। চাকরি করে বেতন পাই ৩৫ হাজার টাকা। এই বেতন দিয়ে গত দুই বছর আগেও পরিবার নিয়ে বেশ ভালো ছিলাম। কিন্তু এখন ভালো নেই।
এখন সংসারের চাহিদা মেটাতে পারছি না। অভাব কাটছে না। এই আয় দিয়ে ব্যয় সামলাতে পারছি না। প্রতিমাসেই ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। তিনি বলেন, যে বাসায় থাকি তার ভাড়া ৫ হাজার টাকা। বড় ছেলে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। প্রতি সেমিস্টারে তার পড়ার খরচ ১৫ হাজার টাকা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতসহ ছেলেকে হাতখরচ দিতে হয় মাসে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। ছোট ছেলে অস্টম শ্রেণিতে পড়ে। মাসে যাতায়াত খরচসহ স্কুল ফি ৪ হাজার টাকা।
গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বিল চার হাজার টাকা। এতেই বেতনের টাকা শেষ। এরপর আছে আমার নিজের অফিসে যাতায়াত খরচ, চিকিৎসা, ছেলেদের বইখাতা-কলমসহ অন্যান্য ব্যয়।





