রংপুর শহর রক্ষা বাঁধে দাঁড়াতেই কয়েকজন নারী পুরুষ এসে পাশে ঘিরে ধরে বললেন, বাহে হামাক (আমাদের) কিছু দিবের আচ্চেন (আসছেন) নাকি? দেন? ঈদে ছৈল পৈলদের (ছেলেমেয়ে) জামা কাপড় কিনম (কিনব)। এমন আকুতি আর চোখের ফ্যাল ফ্যাল আকুতিই জানিয়ে দিচ্ছিল এবারের ঈদটা কেমন যাবে তাদের।
কয়েকদিন পরেই মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর। কিন্তু এবার ঈদে অনেকটা আকাশ ভেঙে মাথায় পড়ার মত অবস্থা হয়েছে রংপুর অঞ্চলের প্রায় কোটি মানুষের। এ মানুষগুলোর বাড়তি কোন আয় নেই। দিন মাস বছর পেরিয়ে সব জিনিসের দাম বাড়লেও বাড়েনা তাদের আয়।
ফলে এবারের ঈদ বাজারে ওই মানুষগুলো পড়েছেন বিপাকে। ঈদের কেনাকাটায় এ মার্কেট ও মার্কেট ঘুরে ফিরলেও বাজেটের বাইরে পণ্যের দাম হওয়ায় মুখটা মলিনই রয়ে গেল তাদের। কিনতে পারছেন না পরিবার পরিজনদের জন্য পছন্দের পোষাক।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নিত্যপণ্যের মূল্যের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতি, ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ পোশাক-আশাকের দর আকাশ ছোঁয়া। তাই বিপদে পড়েছেন স্বল্প ও নির্ধারিত আয়ের পরিবারের কর্তারা।এদের অভিযোগ, পরিবার-পরিজনের জন্য ঈদের নতুন পোশাক, বাড়তি খাবারের আয়োজন তো দূরের কথা নিত্যদিনের বাজার তালিকা থেকেও কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
ফলে ঈদ বলতেই যেন আঁতকে উঠার মত অবস্থা হয়েছে আমাদের। তার উপর ক্ষতিগ্রস্ত কুড়িগ্রাম লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, রংপুর নীলফামারী জেলার চরাঞ্চলের মানুষেরা আর বিপাকে পড়েছেন। এবারের বন্যায় অনেকটা কোমড় ভেঙে গেছে তাদের। ফলে প্রায় কোটি মানুষ এবার ঈদের আনন্দ থেকে অনেকটা বঞ্চিত।গত সপ্তাহের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত রংপুরের গংগাচড়া এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে সেখানকার চিত্র।
রংপুর শহর রক্ষা বাঁধে দাঁড়াতেই কয়েকজন নারী পুরুষ এসে পাশে ঘিরে ধরলেন।বললেন, বাহে হামাক (আমাদের) কিছু দিবের আচ্চেন (আসছেন) নাকি? দেন? ঈদে ছৈল পৈলদের (ছেলেমেয়ে) জামা কাপড় কিনম (কিনব) । এমন আকুতি আর চোখের ফ্যাল ফ্যাল আকুতিই জানিয়ে দিচ্ছিল এবারের ঈদটা কেমন যাবে তাদের।
একই দশা ওই উপজেলার আরও ৪ ইউনিয়নের অর্ধ লাখ মানুষের।খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাদের মতই অবস্থা রংপুর বিভাগের সব চরাঞ্চলে বসবাসকারীদের। ঈদ ঘনিয়ে আসলেও সেখানকার মানুষের মধ্যে নেই ঈদের আনন্দ। আছে শুধু ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার আকুতি।
একটি বেসরকারি জরিপ সংস্থা বলছে, রংপুর বিভাগে প্রায় সোয়া ২ কোটির উপরে মানুষের বসবাস। এর মধ্যে নিম্ন ও মধ্যম আর নির্ধারিত আয়ের মানুষই বেশি। যাদের নির্ধারিত আয় দিয়ে অতিরিক্ত মূল্যে কেনাকাটা করা সম্ভব নয়।
রংপুর সদরের একটি বেসরকারি কলেজ শিক্ষক সাইফুল ইসলাম জানালেন তার কষ্টের কথা। যে বেতন পান তিনি, তা দিয়ে বাড়ি ভাড়া, নিত্যদিনের খরচ আর ২ ছেলে ১ মেয়ের পড়ালেখার খরচ জোগাতেই হিমশিম খান তিনি। প্রায় প্রতিমাসেই সহকর্মীদের কাছে ধারদেনা করতে হয় তাঁর। এবারের ঈদে গ্রামের বাড়িতে থাকা বাবা মা ছোট ভাই আর ছেলেমেয়েদের ঈদের কেনাকাটা নিয়ে আছেন চরম দুশ্চিন্তায়। ঈদ ঘনিয়ে আসলেও এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি তিনি। তবুও বন্ধুদের বলে রেখেছেন কিছু টাকা ধারের জন্য। নিজের এবং স্ত্রীর না হলেও অন্তত বাবা মা আর ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু কেনাকাটা করার কথা ভাবছেন তিনি। তিনি হেসে হেসে বলেন, ভাই আমরা যারা স্কুল কলেজে চাকরি করি তাদের সবার অবস্থা প্রায় আমার মত।
প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করে রবিউল ইসলামে নামের এক ব্যক্তি জানান, আমি প্রতিষ্ঠানের ৩টি উপজেলার দায়িত্বে। মাসে পাই ২৩ হাজার টাকা। বাড়ি ভাড়া দেই ৫ হাজার। মোটরসাইকেলের তেল বাবদ যায় ৪ হাজারের বেশি। বিদ্যুৎ, গ্যাস বিল যায় ১ হাজার ৯ টাকা। ছেলের প্রাইভেট টিচারকে দেই দেড় হাজার টাকা। স্কুলের খরচ আর ছোট মেয়ের প্রতিদিনের যে খরচ তা দিয়ে মাস ঠেকাতেই কষ্ট হয়। ঈদ ঘনিয়ে আসছে বেতন পাইনি। নেই আমাদের বোনাস। কি হবে নিজেও ভাবতে পারছি না।
রংপুর সালেক মার্কেটের সামনে কথা হয় ফাহিমা মৌ নামের এক গৃহিণীর। তিনি বলেন, ভাই শহরের বড় বড় মার্কেট ঘুরে এখানে আসলাম। (এই মার্কেটটিতে অপেক্ষাকৃত পণ্যের কম দাম)। এখনো কেনাকাটা করতে পারিনি। যা পছন্দ হয় তার দাম এতো বেশি যে ক্রয় করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আমার স্বামী একটি প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করেন।ঈদের বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, উচ্চবিত্তরা বড় বড় বিপনীতে ভিড় করছে। আর মধ্যবিত্ত নির্ধারিত আয় আর নিম্ন আয়ের মানুষজন অপেক্ষাকৃত কম মূল্যের মার্কেট আর ফুটপাতে ভিড় জমাচ্ছেন।
ব্যবসায়ীরা জানান, লোকজন আসছেন দাম দর করছেন কিন্তু বিক্রি হচ্ছে কম।রংপুর সুপার মার্কেটের সামনে রিকশায় উঠতে উঠতে শহিদুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন দ্বিগুণ করা হয়েছে। আর আমাদের বিপদের শেষ নেই। জামা কাপড়ের যে দাম আমরা তো সেগুলো কিনতে পারব না। তাদের অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তা কর্মচরীদের বেতন বাড়ায় এবার ঈদে সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সে কারণে বাজেট নিয়ে মার্কেটে আসলেও প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে, শুধু ঈদ আনন্দ থেকেই বঞ্চিত হওয়া নয়, এর মাধ্যমে সামাজিক বলয় ও পারিবারিক ঐতিহ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে।রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ জানালেন, পোশাক-পরিচ্ছদসহ নিত্যপণ্যের বাজার মূল্য হু-হু করে বাড়লেও বেসরকারি এবং প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কর্তরত ব্যক্তিদের বেতন ভাতা বাড়েনি বা বাড়ানো হচ্ছে না। ফলে এ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
তিনি সরকারকে পরামর্শ দিয়ে বলেন, বেসরকারি এবং প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে যাতে বেতন ভাতা বাড়ানো হয় এবং পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আর সঙ্গে চরাঞ্চলের মানুষের জন্য দ্রুত বিশেষ বরাদ্দ দেয়ার আহ্বান জানান এই বিশ্লেষক।
ইআর





