ক্যাস্পিয়ান সাগর থেকে রাশিয়ার চারটি যুদ্ধজাহাজ সিরিয়ায় তৎপর সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আইএস’র অবস্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু জানিয়েছেন, জাহাজ থেকে ২৬টি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করা হয়।
বিভিন্ন খবর থেকে জানা যাচ্ছে-সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আইএস’র ১১টি লক্ষ্যবস্তুর ওপর এসব হামলা করা হয়েছে।
হামলায় লক্ষ্যবস্তুগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে এবং তবে এতে বেসামরিক জানমালের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয় নি।
লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য রাশিয়ার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার আকাশ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
এ হামলায় আড়াই হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরান ও ইরাকের ভুখণ্ড পেরিয়ে আন-নুসরা এবং আইএস আস্তানায় আঘাত হানে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে সিরিয়ায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিমান অভিযান শুরু করেছে রাশিয়া। তারপর এই প্রথম রুশ নৌবাহিনী সে অভিযানে যোগ দিল। অবশ্য, এর আগে যুদ্ধবিমান মোতায়েনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে রুশ নৌবাহিনী।
রুশ নৌবাহিনীর মাধ্যমে লাতাকিয়ার একটি বিমানঘাঁটি এবং তারতুসে রুশ পুরনো নৌঘাঁটিতে সরঞ্জাম এবং রসদ সরবরাহ করা হয়েছে।
তবে কাস্পিয়ান সাগরে অবস্থানরত যুদ্ধজাহাজ থেকে ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মাধ্যমে সিরিয়ার যুদ্ধের যে নতুন মোড় নিচ্ছে তা পরিষ্কার।
এর মাধ্যমে এটাও পরিষ্কার হয়েছে যে, আইএস সন্ত্রাসীদের পতন না হওয়া পর্যন্ত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পিছিয়ে আসবেন না।
রুশ স্যাটলাইটের তথ্যচিত্র ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কাস্পিয়ান সাগর থেকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে।
৯দিনের চলমান সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত বেসামরিক জানমালের ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায় নি। কাস্পিয়ান সাগর থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে মূলত রাশিয়া সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করল।
শুরু হলো স্থল অভিযান:
এদিকে, আইএস’বিরুদ্ধে বিশাল আকারের স্থল অভিযান শুরু করেছে সিরিয়া। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় হামা প্রদেশে এ অভিযান শুরু হয়েছে।
অভিযানে সহযোগিতা দিচ্ছে রুশ বিমান বাহিনী। স্থল অভিযানে যে পর্যায়ে সিরিয়ার সেনাবাহিনী সহায়তা চাইছে সেখানেই বোমা হামলা চালাচ্ছে রুশ জঙ্গিবিমান।
ওই সূত্র বলছে, হামার লাতমিন ও মোরেক অঞ্চল মুক্ত করে কাফ্র জেইতার দিকে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সেনা সূত্র জানিয়েছে, এসব এলাকায় আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আন-নুসরা ফ্রন্টসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।
সিরিয়ার সেনাবাহিনী ইদলিব প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে হামা প্রদেশের উত্তর অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। উত্তরাঞ্চলীয় আলেপ্পো প্রদেশের দেইর হাফের ও আল-বাব এলাকায় আইএসআইএল অবস্থানে রুশ বাহিনী বিমান হামলা চালিয়েছে।
সামরিক সূত্র বলছে, এ হামলায় বহু সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। স্থল অভিযান শুরুর আগে, বুধবার সকালের দিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছিলেন, সিরিয়ায় স্থল অভিযান শুরু হলে তাতে সমর্থন দেবে রুশ বিমান বাহিনী। তবে স্থল অভিযানে রুশ পদাতিক বাহিনী অংশ নিয়েছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।
আইএস’র শয়তানী কৌশল:
সর্বশেষ রুশ ড্রোন থেকে তোলা ভিডিও চিত্রে দেখা যাচ্ছে- রুশ বাহিনীর হামলায় দিশেহারা হয়ে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস এক ধরনের প্রতারণা ও শয়তানী কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।
ওই ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে- আইএস সন্ত্রাসীরা তাদের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রগুলো ইদলিবের একটি আবাসিক এলাকার মসজিদের কাছে রাখছে যাতে রুশ বাহিনী সেখানে বিমান হামলা চালাতে না পারে।
এ সম্পর্কে রুশ উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী আনাতোলি অ্যান্তোনভ বলেছেন, “মসজিদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও দুর্বলতার কথা ভেবে সন্ত্রাসীরা এ কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে।
তারা জানে যে, আমরা কোনোভাবেই মসজিদে হামলা করতে পারব না। তারা এই সুযোগ নিচ্ছে।”
অ্যান্তোনভ এটাও বলেছেন, মসজিদের কাছে সন্ত্রাসীদের অস্ত্র রাখার এটা একটা কারণ হতে পারে যে, তারা গোলা বারুদের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মসজিদ উড়িয়ে দিয়ে রাশিয়ার বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণা চালাবে যে, রুশ বাহিনী সিরিয়ায় মুসলমানদের মসজিদ ধ্বংস করছে।
পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে:
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। রাশিয়ার কাছে সামরিক সহায়তা চাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে ইরাক।
এমনটা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতির ভেতরেই রুশ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা হবে এবং দ্রুত পাল্টে যাবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি।
সহযোগিতা চাওয়ার বিষয়ে ইরাকের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক সংসদীয় কমিটির প্রধান হাকিম আজ-জামিলি বলেছেন, সিরিয়ায় রুশ বাহিনী সফল হলে রাশিয়ার কাছে বাগদাদ সাহায্য চাইবে।
সিরিয়ায় যে রুশ অভিযান শুরু হয়েছে তাতে সন্ত্রাসীরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এতে বাগদাদ অনেকটা আশাবাদী হয়ে উঠেছে রুশ সহযেগিতা নেয়ার বিষয়ে।
গত কয়েকদিনের মধ্যে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল-এবাদিও বলেছেন, রুশ সামরিক সহায়তা চাওয়ার জন্য সরকার তাকে অনুমোদন দিয়েছে।
এছাড়া, ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও রাশিয়া মিলে যে যৌথ গোয়েন্দা তথ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে তাও শিগগিরি কাজ শুরু করবে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। এ পদক্ষেপও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, রাশিয়া বলেছে আনুষ্ঠানিকভাবে আহ্বান জানালে ইরাকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিমান অভিযান চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করবে মস্কো।
জর্দান সফরের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানিয়েছেন, রুশ ফেডারেশন কাউন্সিলের স্পিকার ভ্যালেন্তিনা মাতভিয়েনকো।
আসাদকে পাকিস্তানের সমর্থন:
সিরিয়ায় যখন রুশ অভিযান জোরদার হয়েছে, ইরাক যখন মস্কোর কাছে সামরিক সহায়তা চাওয়ার পরিকল্পনা করছে তখন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে পাকিস্তান।
সিরিয়ায় নিযুক্ত পাকিস্তানের নতুন রাষ্ট্রদূত এয়ার মার্শাল (অব.) আতহার হোসেইন বুখারি ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সিরিয়ায় সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে এগিয়ে এসেছে রাশিয়া তবে সিরিয়ার সাধারণ মানুষ যাতে কোনোভাবেই বিমান হামলার শিকার না হয় সেদিকে বিশেষ নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
পাক সরকার বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাশার আসাদকে সমর্থন করে বলেও তিনি জানিয়েছেন। চলতি মাসের শেষ দিকে বুখারি সিরিয়ায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগ দেবেন।
তিনি বলেছেন, সিরিয়ার জনগণ যদি আাসদকে আবারো নির্বাচিত করে তাহলে পাকিস্তান তখনও আসাদকে সমর্থন করবে।
সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস সম্পর্কে পাক সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে আতহার বুখারি বলেন, এই অপশক্তি হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় হুমকি। এদের নির্মূলের জন্য একতাবদ্ধ হওয়া উচিত।
এই শক্তি শুধু ইরাক ও সিরিয়ার ক্ষতি করবে না বরং সঠিকভাবে মোকাবেলা না করলে বিশ্বের অন্য মুসলিম দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন এয়ার মার্শাল আতহার।
তিনি বলেন, সিরিয়ার জনগণই সিরিয়ার ভাগ্য নির্ধারণ করবে। তারা যদি আসাদকে আবার নির্বাচিত করতে চায় অথবা নতুন সরকার চায় তাহলে তাও তাদের ওপরই নির্ভর করবে।
সিরিয়া ইস্যুতে এটিই পাকিস্তানের অবস্থান বলে ঘোষণা করেন বুখারি। নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ও সরকার ঠিক করা শ্রেষ্ঠ সমাধান বলে মনে করেন পাক রাষ্ট্রদূত।
সিরিয়ায় আইএস-বিরোধী লড়াইয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সমর্থন জরুরি বলেও উল্লেখ করেন বুখারি।
আসাদ প্রশ্নে পাকিস্তানের এই অবস্থানকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে কারণ মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আবার সৌদি আরব আসাদের বিরুদ্ধে চরম শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
এছাড়া, আইএস বিরোধী লড়াইয়ে পাকিস্তানকে যোগ দিতে আমেরিকা আহ্বান জানিয়েছে। সে সময় আসাদের প্রতি পাকিস্তানের এই সমর্থনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে বটে।
রুশ হামলার লক্ষ্য কী?:
সিরিয়ায় সামরিক অভিযানের আসল উদ্দেশ্য কী তা নিয়ে বিশ্লেষক মহলে চলছে নানা পর্যালোচনা।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের উপস্থিতি ও বিরোধিতা সত্ত্বেও যখন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নেন তখন এ প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
এ প্রশ্নের আপাতত জবাব দিয়েছেন, রুশ ফেডারেশন কাউন্সিলের স্পিকার ভ্যালেন্তিনা মাতভিয়েনকো।
তিনি বলেছেন, আইএস-কে পরাজিত করা ছাড়া সিরিয়ায় রুশ বিমান অভিযানের আর কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য নেই। এই লক্ষ্যই মার্কিন জোটের দেশগুলো থেকে রাশিয়াকে আলাদা করেছে।
পতন হবে কী আইএস’র?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন বলেছেন, আইএস পরবর্তী পর্যায়ে কূটনৈতিক সমাধানের প্রয়োজন রয়েছে। এর আপাতত অর্থ হচ্ছে- সিরিয়ায় আইএস সন্ত্রাসীদের পতন অবশ্যসম্ভাবী।
হিলারির এ বক্তব্যের যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে এ কারণে যে, তিনি ওবামা সরকারেরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন এবং তিনি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার লড়াইয়ে অনেক এগিয়।
তার কাছে অনেক তথ্য আসবে এটাই স্বাভাবিক। হিলারি তথ্য ছাড়া আইএস পরবর্তী সিরিয়ার চিন্তা করেছেন তা ভাবার কারণ আছে বলে মনে হয় না।
এস-৩০০ মোতায়েন:
রাশিয়া সিরিয়ার লাতাকিয়া বন্দরে 'মস্কোকাভা' নামের একটি ডেস্ট্রয়ারে ৬৪টি 'এস-থ্রি হান্ড্রেড'নামের অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে।
ফলে সিরিয়ার আকাশে বিমান হামলা চালাতে হলে তুরস্ক, ব্রিটেন, ইসরাইল ও জর্দানকে রাশিয়ার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। তা না হলে তাদের জঙ্গি বিমানগুলো যে কোনো সময় ভূপাতিত হতে পারে।
সিরিয়ায় এস-৩০০ মোতায়েনের কারণে রুশ বিমান হামলার পরিধি ও তীব্রতা বাড়ানো সহজ হবে। এতে রয়েছে রাডার আবার হামলা জন্য রয়েছে ক্ষেপণাস্ত্র।
তুরস্ক, জর্দান, ব্রিটেন ও ইসরাইলের কাছে এই রাডার এড়ানোর মত স্টিলথ জঙ্গিবিমান নেই।
রাশিয়ার এপদক্ষেপের কারণে ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধের প্রথম ফ্রন্টের নেতা প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার পাশ্চাত্য, ইসরাইল ও আরব রাজা বাদশাহদের হিসাব মিথ্যা স্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
এ কারণে কথিত বহুজাতিক জোটের সঙ্গে রাশিয়ার সামরিক সংঘাতও বেধে যেতে পারে বলে কেউ কেউ আশংকা করছেন।
ন্যাটোর গাত্রদাহ কেন?
সিরিয়ায় আইএস’ওপর শিগগিরি বিমান হামলা বন্ধ করতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ন্যাটো।
সোমবার সিরিয়া সংকট নিয়ে ব্রাসেলসে ন্যাটো সদর দফতরে জরুরি বৈঠকের পর এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়।
এতে বলা হয়, ন্যাটো মিত্ররা অবিলম্বে সিরিয়ার বিরোধী ও বেসামরিক মানুষদের ওপর রাশিয়ার বিমান হামলা বন্ধের আহ্বান জানাচ্ছে।
এ ছাড়া, বিবৃতিতে সিরিয়ায় রুশ সামরিক উপস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ জানায় ন্যাটো।
বিবৃতিতে দাবি করা হয়, সিরিয়ার রুশ সামরিক তৎপরতা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে- ন্যাটোর এই বিবৃতি কেন?
রাশিয়া তো ন্যাটোর কোনো সদস্য দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে নি। কিংবা সিরিয়ায় জোর করে সামরিক অভিযান শুরু করে নি।
আসলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে মার্কিন ও পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়ার জন্য ন্যাটো নামের এ সামরিক জোট গঠন করা হয়েছে।
এরাই পশ্চিমা সরকারগুলোর লাঠিয়াল হিসেবে অন্যায় যুদ্ধ পরিচালনা করে থাকে। শুধুমাত্র নাম দিয়েছে ন্যাটো।
দুঃখজনক হচ্ছে এই সামরিক জোটের একমাত্র মুসলিম দেশ হচ্ছে তুরস্ক যার বর্তামন নেতা রজব তাইয়্যেব এরদোগান।
তিনি মুখে মুখে ইসলামের কথা বললেও পশ্চিমাদের পেছন ছাড়তে পারেন নি; তেমনি ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কও ছিন্ন করেন নি। বরং সে সম্পর্ক দিনে দিনে বেড়ে চলেছে।
নো ফ্লাইজোন এবং ‘রহস্যে ঘেরা’ওবামা: সিরিয়ায় সর্বপ্রথম নো-ফ্লাই জোন গঠনের জন্য আমেরিকার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন মিশরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মুহাম্মাদ মুরসি।
মজার বিষয় হচ্ছে- এ আহ্বানের কয়েকদিন পরই কাতালীয়ভাবে তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল এবং কিছুদিনের মধ্যে জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল- সিসি মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে জোর করে এবং অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেন।
আবার বেশ কয়েকদিন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান সিরিয়ার একটি অঞ্চল নিয়ে নো ফ্লাই জোন গঠনের আহ্বান জানান।
কিন্তু ওবামা এখনো সে বিষয়ে কার্যকর কেনো পদক্ষেপ নেন নি। এর পর নতুন করে মার্কিন ডেমোক্র্যাট দলের সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন নো-ফ্লাই জোন গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু ওবামা এবারও তা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এটি খুব সহজ কাজ নয় যা কম মূল্যে শেষ করা যাবে।
ওবামা আরো বলেছেন, এটি হচ্ছে হিলারির নির্বাচনী প্রচারণার অংশ কিন্তু তিনি যদি প্রেসিডেন্ট হন তাহলে এ ধারণা থেকে সরে আসবেন। আসলে বোঝা যাচ্ছে না কেন ওবামা নো-ফ্লাই জোন গঠন করতে চান না।
তাকে কী রাশিয়া সবসময় তাড়া করে ফিরছে? কেউ কেউ মনে করেন, ওবামা নানাভাবে ইসরাইল-বিরোধী কাজই বেশি করছেন।
সিরিয়া ইস্যুতে পূর্ব শর্তের বিরোধী ইরান:
সিরিয়া ইস্যুতে যেকোনো ধরনের পূর্ব শর্তের বিরোধী ইরান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মাদ জাওয়াদ জারিফ মার্কিন গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সিরিয়া সংকটের রাজনৈতিক সমাধানই একমাত্র পথ।
আর এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে বলে পূর্ব শর্তদিয়ে কোনো আলোচনায় বসতে গেলে তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। খোলা মন নিয়ে সিরিয়ার সব পক্ষকে আলোচনায় বসতে হবে।
আসাদের ভাগ্য দেশের জনগণ নির্ভর করবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সিরিয়ায় রুশ হামলার প্রতি ইরান প্রথম থেকেই সমর্থন দিয়ে আসছে।
আমেরিকায় অবস্থাএরে সময় রুশ হামলার খবরে তিনি অবাক হয়েছেন কিনা-এমন এক প্রশ্নের জবাবে জারিফ বলেছেন, এ বিষয়ে ইরান ও রাশিয়ার মধ্যে তথ্য আদান প্রদান হচ্ছে। এটা অনেকটা কাঙ্ক্ষিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আমেরিকার যত উদ্বেগ:
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশ্টোন কার্টার বলেছেন, সিরিয়ায় বিমান হামলা করে রাশিয়া ‘মৌলিক ভুল’করেছেন।
তিনি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া শুধু আইএস’র ওপর হামলা চালাচ্ছে না তারা সিআইএ’র সৃষ্টি ও প্রশিক্ষণ দেয়া গেরিলাদের ওপরও হামলা চালাচ্ছে।
রাশিয়ার কাছে তার এ অভিযোগের কী মূল্য আছে সেটা ভিন্ন কথা তবে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন যে এসব কথায় ভিজবেন না তা পরিষ্কার।
সিরিয়ায় রুশ হামলা অ্যাশ্টোনের জন্য ভারী মুশকিলের বিষয় কারণ তিনিই এখন আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী, মার্কিন সামরিক বাহিনীরমান-মর্যাদা রক্ষাও তার বড় দায়িত্ব।
বিশ্বযুদ্ধের আশংকা আছে?:
ওবামা প্রশাসনের ঘোরতর সমর্থক ব্রেজিনস্কি মনে করেন, সিরিয়ায় রুশ হামলা শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়েছে। এ অবস্থায় রাশিয়া হামলা বন্ধ না করলে মস্কোর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেয়া উচিত বলে তিনি প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন।
তিনি আইএস-কে আমেরিকার সম্পদ বলে উল্লেখ করেছেন। ব্রেজিনস্কি ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা।
সে কারণে তার কথা মোটেই গুরুত্বহীন নয়। সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়াকে কীভাবে মোকাবেলা করা হবে তা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনে চলছে বিতর্ক। সে বিতর্ক কোথায় গিয়ে শেষ হবে বলা কঠিন।
প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আগেই শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। দুই মেয়াদে তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং এখন দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন।
ক্ষমতায় থাকাকলে তিনি সেভাবে কোথাও যুদ্ধে জড়ান নি। শেষ সময়ে এসে তিনি নতুন করে যুদ্ধে জড়াবেন কিনা তা নিয়ে নানা হিসাব নিকাশ করতে হচ্ছে। তবে রাশিয়ার উত্থানকে অবশ্যই আমেরিকা সহজভাবে নেবে না।
সে ক্ষেত্রে ওবামার চাওয়া কতটা গুরুত্ব পাবে তা দেখার বিষয়। এ ক্ষেত্রে ইহুদি লবি এবং সিআইএ’র মতামতই বেশি গুরুত্ব পাওয়া কথা।
এছাড়া, ন্যাটো জোটও রাশিয়াকে নানা সময়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছে। রাশিয়ার সীমান্তে বহুদিন ধরে তারা নানা রকমের সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি ঘটিয়েছে এবং সেনা মোতায়েন করেছে।
রাশিয়ার উঠোনের ওপর রাতদিন মহড়া চালাচ্ছে। সিরিয়ায় হামলা চালানোর পর সেখানে হামলা বন্ধ করতে ন্যাটো জোট মস্কোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু রশিয়া এসব কোনেকিছুই আমলে নেয় নি।
পুতিন তার অবস্থানে অটল এবং মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটকে মোকাবেলার জন্য এক ধরনের প্রস্তুতি আছে।
এমন প্রস্তুতির অংশ হিসেবেপুতিন নানা ধরনের অস্ত্রের আধুনিকায়ন করেছেন, যুদ্ধজাহাজ তৈরি করেছেন, নতুন নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ও অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়েছেন।
সিরিয়া ইস্যুতে ন্যাটোর অন্যতম সদস্য জার্মানির অবস্থান খানিকটা নরম। এছাড়া, ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলার সময় যে কথা বলে যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে পরে তার কোনো প্রম্যাণ পাওয়া যায় নি।
এ নিয়ে মার্কিন নেতাদের ভেতরে লজ্জা না থাকলেও জার্মানির মতো সদস্যরা ভিন্নভাবে বিষয়টি দেখবে।
এছাড়া, ইউরোপ ও ন্যাটো জোটের এমন কোনো দেশ নেই যার ওপর মার্কিন গোয়েন্দারা গুপ্তচরবৃত্তি করে নি। এ নিয়ে মার্কিন সরকারের সঙ্গে অনেক দেশর সম্পর্কে টানাপড়েনও রয়েছে। সে কারণে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গেলে ন্যাটো জোট নিয়ে আমেরিকাকে নানা হিসাব নিকাশ করতে হবে।
এদিকে, আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে কথিত যুদ্ধ এবং সাদ্দামের দুর্বল ইরাকের ওপর হামলা আর রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ এক কথা নয়।
যদি মর্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালায় তাহলে চীনের ভূমিকা কী হবে তা এক বড় প্রশ্ন।
তবে, সাম্প্রতিক নানা ঘটনা ও সম্পর্কের ধরন থেকে বলা যায়- চীনও রশিয়ার পক্ষে সে যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে।
দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে মার্কিন বাড়াবাড়ি, চীন সীমান্তের কাছ ঘেঁষে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এসবই চীনের জন্য মারাত্মক অস্বস্তির কারণ।
এশিয়ায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর উপস্থিতির সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে চীন। এসব চীন সরকারের জানা।
সিরিয়া হচ্ছে রাশিয়া, চীন ও আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে দূরে। অতএব, যুদ্ধ শুরু হলে তা সবার জন্য আপাতত নিরাপদ অবস্থান।
পরে যুদ্ধের ব্যাপ্তি কতটা ছড়িয়ে পড়বে সেটা অবশ্য আলাদা চিন্তার বিষয়। নানা সমীকরণ থেকে সিরিয়া ইস্যুতে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার একটা আশংকা রয়েছে; এমনকি তা বিশ্বযুদ্ধেও রূপ নিতে পারে।
‘নরকে যাও ওবামা’:
সিরিয়ায় হামলা চালিয়ে রাশিয়া মূলত ওবামাকে নরকে যাওয়ার কথা বলেছে। এ মত হলো মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা লিন্ডসে গ্রাহামের।
তিনি মার্কিন সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, রাশিয়াকে সিরিয়ায় স্বাধীনভাবে হামলা চালাতে দিলে মধ্যপ্রাচ্যের বিরাট একটা অংশ ইরান ও রাশিয়ার প্রভাবধীন হয়ে পড়বে।
এছাড়া, আরব অঞ্চলে ক্ষমতার পালা বদল ঘটবে; সামগ্রীক ক্ষমতার ভারসাম্য আমেরিকার প্রতিকূলে চলে যাবে। এমনকি তুরস্কেও প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের দলের ক্ষমতা হারানোর ভয় রয়েছে।
এজন্য লিন্ডসে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে ওবামা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। লিন্ডসের এসব কথার মধ্যদিয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়- সিরিয়া ইস্যু নিয়ে এবং আইএস সৃষ্টি করতে গিয়ে আমেরিকা সত্যিই ফাঁদে আটকে গেছে।
এখন কীভাব সে ফাঁদ থেকে মুক্তি পাবে তার পথ খুঁজতে হবে তাদেরকে। তবে তা যে খুব সহজ হবে না সেটা নিশ্চিত।
এরইমধ্যে সিরিয়ায় রুশ বিমানের সদর্প উপস্থিতির কারণে মার্কিন বিমানগুলো কোণঠাসা হয়ে পড়েছে এবং সংঘর্ষ এড়াতে বারবার পথ পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
লেখক: রেডিও তেহরানে সিনিয়র সাংবাদিক।
ইআর/এসএইচ





