বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং ভারতীয় গরু বাংলাদেশে বৈধ-অবৈধ পথে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর পাল্টে যায় দৃশ্যপট। প্রথমে কিছুদিন গরু সংকট দেখা দিলেও জেলায় জেলায় পর্যাপ্ত গরুর খামার গড়ে উঠায় তা অনেকাংশে দূর হয়েছে।
কোরবানির পশু বিক্রির উদ্দেশে কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর ও সিলেটসহ ২৫/৩০ জেলায় গড়ে ওঠে গরুর খামার।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এ সব খামারে লাখ লাখ গরু প্রতিপালন করেছেন দেশীয় খামারিরা। গরু প্রতিপালনের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হতে সাধারণ কৃষকদের অনেকেই নিজ উদ্যোগে ঘরেই দু’চারটি করে গরু প্রতিপালন করেছেন।
ঈদে সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু আসবে না এবং গরু বিক্রি করে লাভবান হবেন এ আশায় প্রহর গুনেছেন তারা। কিন্তু কোরবানির ঈদ আসার আগে হঠাৎ করে সীমান্তে বিএসএফের নমনীয়তায় ফের গরু আসায় বিপাকে পড়েছেন দেশীয় খামারিরা। এটাকে অশনি সংকেত বলেই মনে করছেন তারা।
আর মাত্র দু’দিন বাকি আছে কোরবানির ঈদের। জমতে শুরু করেছে কোরবানির হাট। এরই মধ্যে দেশীয় খামারিরা তাদের খামারের গরু বিক্রি শুরু করেছেন। অন্য ব্যবসা-বাণিজ্য গুটিয়ে অনেকেই কোরবানীর চাহিদা মাথায় রেখে খামারে গরুর সংখ্যাও বাড়িয়েছেন।
ভারত গরু না দিলে দেশে গরুর সঙ্কট হতে পারে-এমন শঙ্কার কথা মাথায় রেখেই তারা এমনটি করেছেন। এখন আকস্মিকভাবে ওপার থেকে গরু আসা শুরু হলে গলায় দড়ি দেওয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবে না বলে নিজেদের অসহায়ত্বের কথা জানিয়েছেন অনেক খামারি।
সরেজমিনে রাজধানীর কয়েকটি হাট ঘুরে ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ভারত থেকে ঈদের আগমূহুর্তে গরু আসুক এটা তারা কোনভাবেই সমর্থন করছেন না। ব্যবসায়ীরা বলছেন, “দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে তারা এবার গরু ছাড়বে না। আর এখন যদি গরু ছাড়ে তাহলে আমাদের এটা বাদ দিয়ে অন্য পথ বেছে নিতে হাবে।” তবে ক্রেতাদের মধ্যে ভারতীয় গরুর পক্ষ বিপক্ষ নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে।
গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫) দুপুর বরোটায় টাইমনিউজবিডির এই প্রতিবেদক সরেজমিন ঘুরে দেখেন রাজধানী ঢাকার কোরবানির হাটগুলোর অন্যতম গাবতলী গরু হাট। তখনও টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছিল। তাই হাটে ক্রেতাদের খুব একটা আনাগোনা ছিল না, অথচ বিক্রেতাদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
কুষ্টিয়ার মিরপুর থেকে এসেছেন মো. খোকন বেপারী। গরুর ব্যবসা করছেন দির্ঘ ত্রিশ বছর ধরে। এর আগেও তিনি ঢাকার বিভিন্ন হাটে গরু এনেছেন। এবার তিনি গরু এনেছেন ১১টি। বড় নয়টি এবং ছোট দু’টি। নয় মাস আগে যেগুলো কিনেছিলেন আট লাখ টাকা দিয়ে। দ্বিগুন লাভের আশা করে এসেছেন ঢাকার হাটে।
নরম কন্ঠে তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলছিলেন, “আমরা কৃষি ব্যাংক, অগ্রনী ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে ঋণ নিয়ে এই গরু গুলো পালি। এগারোটা গরু পালন করতি আমার কমপক্ষে ৯-১০ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। এখন যদি লাভের টাকা না উঠাতি পারি তাহলে তো আমার মরণ ছাড়া কোন পথ থাকবে না। তারপর আবার শুনতিছি ভারত থেকে গরু আসতিছে।”
একই এলাকা থেকে এসেছেন মোস্তফা শেখ। পেশাদার ব্যবসায়ী না হলেও মাত্র একটি গরু এনেছেন সামান্য লাভের আশায়। যা থেকে তার মেয়েকে বিয়ে দিবেন। ঢাকায় আনতে তার খরচ হয়েছে ১৮’শ টাকা, হাট খরচ তিন হাজার টাকা আর গরুটা লালন-পালন করতে খরচ প্রায় ৯০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তিনি দাম হাকিয়েছেন এক লাখ ত্রিশ হাজার টাকা।
অভিমানী দৃষ্টিতে তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলছিলেন, “ভারত থেকে গরু আসলে আমাদের চরম ক্ষতি হয়। লাভ হয় সরকারের আর বড় লোকদের। ভারতের গরু বিক্রি হয়ে যায়, আর আমাদের গরু বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যাতি হয়। এই যে সব কাম-কাজ ছাইড়ে দিয়ে এই একটা গরুর ভরসায় আছি। এখন লাভের থলে যদি ভারতে যায় তাহলে আর অমাদের গরু পুষে লাভ কি?”
মোস্তফা শেখের মতো অনেকেই সকল কাজ-কর্ম ছেড়ে একমাত্র সম্বল গরু নিয়ে ঢাকায় এসেছেন সামান্য লাভের আশায়। কিন্তু সেই লাভের খাতা নিয়ে এখন তারা খুবই চিন্তিত।
পশুর খামার করতে অনেকেই বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থা থেকে ঋন নিয়েছেন। এবার খামারিদের বেশি খরচ করতে হয়েছে কারণ সবকিছুর দাম বেশি। তবে ভারতীয় গরু আমদানি না হলে ভালো দাম পাওয়ার আশা ব্যবসায়ীদের।
অবশ্য এরইমধ্যে ভারত থেকে গরু আসার খবর তাদের অনেকেরই জানা হয়ে গেছে। তবুও ঋণ পরিশোধের আশায় গরু নিয়ে এসেছেন রাজধানীর বুকে।
কথা হচ্ছিলো গাবতলী হাটে কুষ্টিয়া সদর থেকে গরু নিয়ে আসা ব্যবসায়ী মো. আজমত আলী মন্ডলের সাথে। তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, “গত বছর ভারত থেকে গরু আসার কারণে আমাগে অনেক ক্ষতি হইছিলো।
সেই ক্ষতি সহ্য করতি না পাইরে আমাগের গ্রামের শহিদ ব্যাপারি গলায় দড়ি দিলো। অনেক ঋণ নেওয়া ছিলো তার। শোধ করতি না পাইরে মরে গেল। এবারও ভারত থেকে গরু আসলি আমাগো গলায় দড়ি দিতি হবে। তা না হলি ভিটে-মাটি ছাড়তি হবে।”

দেশে আরো কিছু ডাকাত, সন্ত্রাসী জন্ম নিবে
“আমাগে এলাকার ৯৫ ভাগ গরু কৃষি ব্যাংকসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থার কাছ থেকে লোন নিয়ে পালন করা। যদি লাভ না হয় ঋণ তো শোধ করতি পারবো না। অন্য পথ বাছে নিতি হবে। দেশে আরো কিছু ডাকাত, সন্ত্রাসী জন্ম নিবে। এটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য একটি লজ্জাজনক অধ্যায়।” বলছিলেন তিনি।
গাবতলীর হাটে যত গরু আছে তার অর্ধেক ভারতের গরু বলে খুব বিশ্বাসের সাথে বললেন আঠরো বছর ধরে গরুর ব্যবসা করা জহরুল বেপারী। এটার ব্যাখ্যাও তিনি ঠিক ঠাক ভাবে দিলেন।
টাইমনিউজবিডিকে তিনি বললেন, আমাদের দেশের যত গরু আছে তার বেশির ভাগ ভারতের। কারণ গরু ওই দেশে জন্ম নেয় আমাদের দেশে পালন হয়। আমরা ছোট গরু কিনে বড় করে বিক্রি করি। এক কথায় পশ্চিমে জন্ম নেয় আর পূর্বে মৃত্যু হয়।”
“গরু যখন ছোট থাকে তখন আমরা ভারত থেকে গরু কিনি। তারপর খাওয়াই দাওয়াই বড় করি। আর কোরবানির সময় ভারত থেকে গরু আসলে আমাগে একুলও যায় ওকুলও যায়।
আমরা খুশি হবো যদি সরকার ঈদের সময় গরু না আইনে ঈদের পরে গরু আনে। আর সরকার গরুর উপর লোন নেওয়া সহজ করে দিক। তাহলে আমাগে দেশের লাভ” বলছিলেন জহরুল বেপারী।
তেমনই বলছিলেন ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম, “কৃষকের টাকা দিয়েই সরকার দেশ চালায়। আর সেই কৃষকদের দিকে সরকারের কোন নজর নেই। কোরবানি আসলে কৃষক একটু লাভ করবে তা আর হতি দেবে না। সব ভারতীয় গরু আইসে ভরে যায়। তাও আবার ভাইরাস গরু।”
তিনি বলেন, “একটা ট্যাবলেট আছে যেটা গরুর খাওয়াই দিলি তিন সপ্তাহ (২১দিন) না খাইয়ে থাকলিউ কিচ্ছু হয় না। দেখেন না দামড়া দামড়া গরুর গায়ে শুধু হাড় থাকে গোস্ত পাওয়া যায় না।”
সংসারের অভাব ঘোচাতে অনেকেই ব্যাংক বা বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে গো-খামার গড়ে তুলেছেন। গো-খামার করে অনেক নারী-পুরুষ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাই দেশের গরু খামারিদের প্রতি সরকার নজর দিক এবং সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হলে তারা আরও বেশি লাভবান হবেন বলে দাবি করেন ব্যবসায়ীরা।
ভাইরাস আক্রান্ত ভারতীয় গরু
বৃষ্টির দিন হওয়ার কারণে ক্রেতার আনাগোনা ছিলো খুবই কম। তারপরও কয়েকজন ক্রেতার সাথে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।
দুই ভাই এবং এক ছেলেকে নিয়ে গরু কিনতে আসছিলেন মো. আনোয়ার ইশতিয়াক।
তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, “ভারত থেকে গরু আসলে লাভ এবং লস দুটাই আছে। একদিকে কৃষকের ক্ষতি অন্য দিকে আমরা যারা ক্রেতা আছি তাদের লাভ হয়।”
তবে কোরবানির আগ মূহুর্তে গরু আসাটা তিনি পছন্দ করেন না দাবি করে বলেন, “কোরবানির সময় ভারত থেকে যে গরু আসে তার অধিকাংশ থাকে ভাইরাসে আক্রান্ত। আমরা এটা না বুঝলেও এটা খুবই ক্ষতিকর।”
গরু কিনতে আসা সাইদুর রহমান শোনালেন ভিন্ন কথা। তিনি টাইমনিউজবিডিকে বলেন, “ভারত থেকে গরু না আসলে দাম বেড়ে যাবে। যেটা আমাদের জন্য সমস্যা। ভারত থেকে গরু না আসলে হবে না। তবে ভাইরাস গরুর ব্যাপারে তিনি সম্পূর্ণ বিরুদ্ধে।”
এ ব্যাপারে র্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটালিয়ন (র্যাব) সদর দপ্তরের লিগাল এন্ড মিডিয়া উইং এর পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান টাইমনিউজবিডিকে বলেন, “গরুর কোন রোগ হলো কিনা, গরু পুষ্ট এবং অসুখ আছে কিনা এটা দেখার দ্বায়িত্ব র্যাবের না। সরকারের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য মন্ত্রনালয় আছে, তারা এ বিষয়টি দেখবে। গরুর খোঁড়া রোগ আছে কিনা এটা দেখার দ্বায়িত্ব আমাদের না।”
সূত্র জানায়, এবারের ঈদে কোরবানির জন্য ৪০ লাখ গরুর প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে দেশে ৩০ লাখ গরু-মহিষ, ৬৯ লাখ ছাগল রয়েছে।
দেশে কোরবানির পশুর কতো চাহিদা রয়েছে তার কোনো সঠিক তথ্য উপাত্ত না থাকলেও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত বছর দেশে কোরবানি হয়েছিল ৩৬ লাখ গরু। এবার দেশে ৪০ লাখ গরু কোরবানি হতে পারে।
দেশে বর্তমানে গরু আছে ২ কোটি ৩৬ লাখ। এর একটি বড় অংশ গাভি ও কম বয়সী। তবে প্রায় ৩০ লাখ জবাই উপযোগী। এছাড়া কোরবানির জন্য ১০ লাখ গরুর ঘাটতি রয়েছে। তা পূরণে চারটি দেশ থেকে গরু আসছে।
ভারতীয় পত্রিকা টাইম অব ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিবছর বৈধ-অবৈধ পথে যে ভারতীয় গরু অনুপ্রবেশ করে তাতে বাংলাদেশ থেকে ৩৯ হাজার কোটি টাকা ভারতে চলে যায়। দেশীয় খামারিরা এই গরুর চাহিদা মেটাতে পারলে বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশেই থেকে যেত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক খামার সৃষ্টির মাধ্যমে পশু পালন ও উৎপাদন করা গেলে দেশের বাজারে পশু ঘাটতির কোন আশঙ্কা থাকবে না। এতে করে ভারত-মিয়ানমার থেকে পশু আমদানিরও প্রয়োজন হবে না।
এমআর, কেবি





