ধুমায়িত কফিতে চুমুক দিতে দিতে আমি পোর্ট্রেটগুলোর দিকে তাকাই।

সারি বেঁধে সেগুলো টাঙানো রয়েছে দেয়ালে। বৃটিশ আমল থেকে আজ পর্যন্ত যারা এ জেলার জেলা প্রশাসক হিসেবে কাজ করেছেন পোর্ট্রেটগুলো তাদের।

ছবির নিচে আলাদা করে উল্লেখ করা আছে তাদের কর্মকাল। সেগুলোতে চোখ বোলাতে বোলাতে আমি প্রবাহমান ইতিহাসের গন্ধ পাই।

এই যেমন প্রথম দিককার পোর্ট্রেটগুলো সব সাদা চামড়ার ইউরোপিয়ানদের। ভঙ্গীও একেকজন থেকে আরেকজন আলাদা। কারো মাথায় ওয়েস্টার্ন হ্যাট, কেউ বা চুরুট মুখে।

পঞ্চাশের দশকের ছবিগুলো দেখলেই বোঝা যায় এরা পাকিস্তানী ; সিন্ধ-পাঞ্জাবের লোক। কারো কারো নামের আগে-পরে আগা ও খান।

মাঝারী সাইজের রুম। উপরে কাঠের সিলিং। সেগুন কাঠের সিলিং বার্নিশ করে তাতে চকচকে সাদা রং এমনভাবে ঢেলে দেওয়া হয়েছে যে বিদ্যুতের আলো প্রতিফলিত হয়ে চোখে ঢাক্কা দেয়; খুব বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না।

পেছনের দেওয়াল ঘেষে ডানদিকে দুটো বইয়ের তাক। তাতে ভারী ভারী বই থরে-থরে সাজানো। পূবের দেওয়াল জুড়ে একটি মাত্র চিত্রকর্ম। দ্য বাংলো অব ডেপুটি কমিশনার ফরবেস।

রিবেক নামক জনৈক ব্রিটিশ ভদ্রলোকের আঁকা। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের চিত্রকর্ম। ছবির নিচে বাম দিকে সাল উল্লেখ করা আছে। এই বাংলোরই আঁকা ছবি। আসল নয়, রিপ্রিন্টেড বলেই মনে হয়।

দেয়াল থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এবার আমি আমার বন্ধুর দিকে নিবন্ধ করি। ফাইলের সমুদ্রে সে হাবুডুবু খাচ্ছে। দুই দিকে উচু ফাইলের পাহাড় । বন্ধুবর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সেগুলি নিঁকুচি করে যাচ্ছে। আর ছুঁড়ে দিচ্ছে ফ্লোরে।

'যেন স্বর্গের মতো'-আমি বলি।

কি?- ফাইল থেকে চোখ না তুলেই বন্ধু আমাকে জিজ্ঞেস করে।

তোর এই বাংলোটা। সত্য কথা বলতে কি, এত সুন্দর বাংলো আমি কমই দেখেছি। তিন দিকে নীল জলের লেক। বারান্দায় বসেই দেখা যায় দু দিকে সারি সারি অবারিত নীল পাহাড়। বাংলোর পাশ ঘেষে ছোট-বড় নৌকাগুলো ঢেউ তুলে চলা ফেরা করে। সাদামাটা চোখেই এর তুলনা মেলা ভার।

বন্ধুবর ফাইল থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকায়।

'এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে সুন্দর বাংলো।'- ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বন্ধু একবাক্যে তার রায় ঘোষণা করে আবার ফাইলে ডুবে যায়।

আবিদ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসমেট, ঘনিষ্ট বন্ধু। আবু আবিদ চৌধুরী। পড়ালেখা শেষ করে ও গেল সিভিল সার্ভিসে আর আমি ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সীতে। বাইরে বাইরেই থাকি। মাস দুয়েকের ছুটিতে দেশে আসতেই আবিদের ফোন; 'দোস্ত রাঙ্গামাটিতে আছি। বেড়াতে আয়।'

হাতে যখন দু-দন্ড সময় আছে, তখন ভাবলাম রথ দেখা আর কলা বেঁচাটা হয়েই যাক। এই সুযোগে আবিদের সাথে দেখা হলো, আবার রাঙ্গামাটি বেড়ানোও হলো।

পোর্ট্রেটগুলোর দিকে আবার চোখ তুলি।

'তোর অন্তত একজন ডিসি আমার চেনা'-আমি বলি।

'কে? এইচ. টি. ইমাম?'

'না। টি. এইচ. লুইন।'

আবিদ বিস্মিত চোখ তুলে। চোখে মুখে জিজ্ঞাসা। তার এই বিস্ময় অস্বাভাবিক নয়। গড়ে পড়তায় বাঙ্গালী পাহাড় সম্পর্কে সামান্যই জ্ঞান রাখে। এ যেন সীমার বাইরে অন্য জগৎ।

যতটুকু জানে তার সিংহভাগ মিথ আর রোমান্টিকতার মিশ্রণ। বাস্তবতার হিস্যা তাই সামান্যই। পাহাড় অনিন্দ্য সুন্দর, তাই এ কেবল বেড়ানোর জায়গা।

আর প্রচলিত মিথ হলো পাহাড়ে সন্ত্রাসের আস্তানা। যারা রাষ্ট্রের সেবায় বড় গলদ করে বসে তাদের ধরে পাহাড়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

যা ব্যাটা, এবার মর সন্ত্রাস আর ম্যালেরিয়ার সাথে যুদ্ধ করে। সুতরাং আমি ভেতো বাঙ্গালী লুইনকে চিনি, এ কথা শুনে তার আশ্চর্য হওয়া বিচিত্র নয়।

বন্ধুর ঝুলে পড়া চোয়াল দেখতে দেখতেই আমি হাঁটে হাঁড়ি ভাঙ্গি।

ছাত্রকালে আমার একবার পাহাড়ী মেয়ের বাদামী সৌন্দর্যের উপর খুব আগ্রহ জন্মেছিল। তোর হয়ত ম্যানিলা চাকমার কথা মনে আছে। সেই যে ইকোনোমিক্সের সেই মেয়েটা, ফার্স্ট ইয়ারে আমাদের সাথে বাংলার সাবসিডিয়ারি ক্লাসে যেতো।

রবীন্দ্রাথ ঠাকুরকে বলত রবীন্ড্রনাত থাকুর। বাংলাটা তখনও তার ভালমতো হয়ে উঠেনি। সেই মেয়েটা। আমি তার প্রেমে পড়লাম। তাই পাহাড় সম্পর্কে জানতে পাবলিক লাইব্রেরি তছনছ করলাম।

তখনই পড়েছিলাম লুইনের 'চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস এন্ড দ্য পিপল দিয়ারইন' বইটা। তাই লুইন মশাই আমার পরিচিত। আমি খুব সিরিয়াস ভঙ্গীতে বলি।

সব গাম্ভীর্য ভুলে আবিদ হো হো করে হেঁসে উঠে। 'হুম, পাহাড়ের বাদামী সৌন্দর্য; বটে! শোন, পাহাড়ে কাজু বাদাম জন্মে; প্রচুর।

কিন্তু সেই বাদাম খাওয়ার উপযোগী করতে হলে প্রসেস করতে হয়। যথাযথ প্রসেস না করে সে বাদাম মুখে দিলে, মুখ পুড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা।'

আমরা দুজনই হাঁসতে থাকি।

পাহাড়ে রাত দ্রুতই গভীর হয়। চারদিকে নিকষ অন্ধকার করে সে রাত গভীরতার জরায়ুতে ঢুকে পড়ে, বের হতে চায় না। তাই পাহাড়ের রাত একই সাথে গভীর আর দীর্ঘ।

রাত কখন গভীর রাতের খাতায় নাম লিখিয়েছে আমরা দুজন কেউই বুঝতে পারি নি। রিজার্ভমুখ সেইন্ট পল চার্চের ঘন্টায় ঢং ঢং করে জানান দিল রাত গভীর হয়েছে। ওর হাতের কাজ ও প্রায় শেষ।

এমন সময় স্পষ্ট শুনতে পেলাম। হাতির ডাক। খুব কাছেই পাগলা হাতি ডাকছে। ঠিক ডাক নয়; এ যেন মায়াকান্না। ইনিয়ে বিনিয়ে যেন হারানো প্রিয়জনকে খুজে ফিরছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের গভীর জঙ্গলে হাতি পাওয়া যায়, এ কথা আমার অজানা নয়। লংগদু বা বাঘাইছড়ির সীমান্ত জঙ্গলে হাতি মূর্তিমান আতঙ্ক। এইতো সেদিন এক পাহাড়ী পরিবারের ছবি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল, হাতির ভয়ে তারা গাছের উপর ঘর বেঁধেছে।

'এই হাতি তোর বাংলোতে চলে আসবে না তো?'- আমি কন্ঠে কপট উদ্বেগ ঢালি।

'হাতি? হাতি আসবে কোথা থেকে?'- ফাইলে নিমগ্ন আবিদ আনমনে চোখ না তুলেই বলে।

ওর উত্তরে আমি দ্বিধান্বিত হই। তবে কি আমি ভুল শুনলাম? কয়েকদিনের ঘুরাঘুরি করার পরিশ্রম আর রাত জাগার কারণে শ্রুতিভ্রম? একেই কি তবে অডিটরি ডিলিউশন বলে? গায়েবী আওয়াজ?

কিন্তু আমিতো স্পষ্টই শুনলাম!

এই শহরে হাতি ঘুরে বেড়াবে সেটা অবিশ্বাস্য। বিশেষ করে বাংলোর এত কাছে। মেইন গেইটে পুলিশ পাহারা আছে, সেটা জানি। তারা নিশ্চয় বন্য হাতি ঢুকতে দেবে না।

তাছাড়া বাংলোর চারপাশেই বিস্তৃত কাপ্তাই লেক। লেকের ওপারে বালুখালীর পাহাড়ে যদি বন্য হাতি নেমেও আসে তার ডাক এতদূর থেকে শুনতে পাওয়ার কথা নয়।

বললাম, 'মনে হয় হাতির ডাক শুনলাম।'

কিন্তু আবিদ আমার কথা শুনতে পায় না। কলমের মাথা খাঁপে গুজতে গুজতে হঠাৎই সে প্রচন্ড ব্যস্ত হয়ে উঠে।

'ইশ, কত রাত হয়ে গেছে ! সরি দোস্ত; তোকে শুধু শুধই এতরাত পর্যন্ত বসিয়ে রাখলাম। চল, শুয়ে পড়বি। ফাইল যা আছে থাক। কাল অফিসে বসে দেখে নেব।'

আমার হঠাৎ কেন জানি মনে হয় সে কিছু একটা এড়িয়ে যেতে চাইছে। বাংলোর পেছনে হাতির ডাক এখনো শোনা যাচ্ছে। এখন মনে হচ্ছে হাতিটা কেবল ডাকছে না; ভাঙছে। একটার পর একটা গাছ উপরে ফেলছে। কিন্তু আবিদ নির্বিকার।

শ্রুতিভ্রমের বিষয়টা মনের কোনে আবার উঁকি দেয়। মনে হয় এ আমারই ভুল। তা না হলে এ জায়গায় হাতির ডাক শোনার কোন মানে হয় না। আবিদ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়।

কিন্তু হঠাৎই আমার উপর কিছু একটা ভর করে।-'হাতির বিষয়টা ফয়সালা না করে আমি এখান থেকে নড়ছি না।' আমি একগুয়ে কন্ঠে বলি।

আমার কন্ঠের গাঢ়তা শুনে আবিদ চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়।

'কোথাও কোন হাতি নেই।'

'নেই?'

'না। আজ পূর্ণিমা।'

'আজ পূর্ণিমা? এর মানে কি?'

আবিদ আমায় হাত দিয়ে ইশারা করে। ওকে অনুসরণ করে আমি পেছনের দরজার দিকে অগ্রসর হই। বাইরে জোৎস্নার বান ডেকেছে। যেন সবকিছু ভেসে যাচ্ছে জোৎস্নায়। আমাদের চোখ ধাঁধিঁয়ে যায়।

হালকা কুয়াশায় চারপাশ আচ্ছন্ন। মাঝ রাত হলেও এরই মধ্যে শিশির গাঢ় সবুজ পাতাগুলোকে ধুয়ে দিয়ে গেছে পরম মমতায়।গনগনে জোৎস্নায় তাই পত্র-পল্লবগুলো চকচক করে।

পাতলা কুয়াশা ভেদ করে আমি দৃষ্টি প্রসারিত করি। পরাণজুরাণী পার হয়ে আমার চোখ লেকের গভীরতা থেকে ঘুরে আসে।

কিন্তু কোথায় হাতি?

কোথায় উপড়ে পড়া গাছপালা?

এইতো বিকেলেই আমি ঘুরে বেড়িয়েছি এই সবুজ লনে। সবুজ চত্বর যে রকম দেখে গেছি সে রকমই আছে, সবকিছু পরিপাটি করে সাজানো। বেগনবলিভিয়ার ঝোঁপ সে রকমই দাড়িয়ে আছে।

ডালিয়ার যে চারাগুলো দেখে গিয়েছিলাম, সে গুলো সে রকমই কোমল ভঙ্গিতে সলজ্জ দাড়িয়ে। চারদিকে বান ডাকা জোৎস্নায় বালুখালির পাহাড় পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায়।

এসবের মানে কি? বিস্ময় কাটে না আমার। এক ভৌতিক অনুভতি আমার শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে যায়, কাঁটা দেয়।

চেয়ারে বসতে বসতে আবিদের দিকে আমি বিহ্বল দৃষ্টি ফেলি, ভয় আর অস্বস্তি লোকানোর কোন চেষ্টাই করি না।

'আমার পেছনের ছাপ্পান্ন নম্বর পোর্ট্রেটটা দেখ। ঐ তো; দ্বিতীয় সারির ছয় নম্বরটা। এল. এইচ. নিবলেটের। সে রাঙ্গামাটির একমাত্র ডেপুটি কমিশনার যে দুই টার্মের জন্য জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন- আবিদ ইশারায় পোর্ট্রেটগুলোর দিকে আমার দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়।

'তো এর সাথে হাতির সম্পর্ক কি?'-আমার কন্ঠ নিজের কানেই অপরিচিত ঠেকে।

সেখানেই আসছি। আবিদ উঠে বুক সেল্ফের কাছে চলে গেল। সেখান থেকে একটা বই তুলে এনে আমার দিকে ঠেলে দিল।

এই অংশটা পড়।

পুরাতন বই। পৃষ্ঠাগুলো মলিন। কোন কোনটা আবার খসে গেছে। সরকারি কোন গেজেটিয়ার হবে হয়তো। বইটা উল্টিয়ে আবার নামটা দেখলাম। ডেপুটি কমিশনারস অব চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস। অধ্যায়ের নাম এল.এইচ.নিবলেট। ইংরেজিতে লেখা-

এল.এইচ. নিবলেট গ্রেট ব্রিটেনের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। অদ্যবধি তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুই মেয়াদে পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলায় জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করিয়াছেন।

তিনি জেলা প্রশাসক হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন অবস্থায় পারস্যদেশীয় বাদশার ভাই প্রিন্স গোলাম রেজা পাহলভী রাঙ্গামাটি আগমন করেন।

তিনি তৎকালে এই দেশে পারস্যদেশীয় রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত ছিলেন। রাজকুমার পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়-পর্বত; বিশেষত ইহার সুগভীর তরু-লতা দেখিয়া বিগলিত হন।

ইহা জানা যায় যে রাজকুমারের ছিল শিকার করিববার প্রতি বিশেষ ঝোক। তিনি যখন জানিতে পারিলেন যে, এই সুগভীর জঙ্গলে বাইসন, নীলগাই, মৃগ, শুকর এবং বন কুক্কটের প্রাচুর্য রহিয়াছে, তৎক্ষনাৎ তাহার আর্যরক্ত শিকারে গমন করিবার জন্য নৃত্ত করিয়া উঠিলো।

তিনি জেলা প্রশাসক নিবলেটের নিকট শিকারে গমন করিতে অভিপ্রায় ব্যক্ত করিলেন। সম্মানিত অতিথি। সুতরাং আনন্দচিত্তে শিকারের তোরজোড় শুরু হইলো।

চাপরাশি-খানসামাগণ নানা রকম আয়োজন করিতে লাগিলো। জেলা প্রশাসক নিবলেট রাজকুমারকে লইয়া চন্দ্রঘোনায় থানা গাড়িলেন। সাব্যস্ত হইলো তাহারা খরস্রোতা কর্নফুলী নদী অতিক্রম করিয়া চিৎমরম জঙ্গলে মৃগয়ায় যাইবেন।

শিকার উপলক্ষে নিবলেটের প্রিয় হস্তী লালবাহাদুরকে সাজানো হইলো। লালবাহাদুর সত্যকার অর্থেই নিবলেটের অত্যন্ত সুপ্রিয় ছিলো।

তিনিই ফারুয়া জঙ্গল হইতে লালবাহাদুরকে সংগ্রহ করিয়াছিলেন বলিয়া জানা যায়। ফারুয়ার বম উপজাতীয় সর্দার জেলা প্রশাসক নিবলেটের প্রতি তাহাদের বন্ধুতার নিদর্শনস্বরুপ হস্তী শাবকটি তোফা প্রদান করিয়াছিলেন।

নিবলেটই তাহাকে লালন পালন করিয়া বড় করিয়া তুলিয়াছিলেন। প্রত্যহ নিজেই হস্তী শাবকটির আহারের তদারকি করিতেন। তৎকালে লালবাহাদুর নামীয় এক মগ বলী খেলায় প্রভূত সুনাম অর্জন করিয়াছিলেন। পূর্বে মিজোরাম, দক্ষিণে আরাকান এবং চাটগাঁ ও তদসংলগ্ন এলাকায় তাহার কোন জুড়ি ছিল না।

নিবলেট আদর করিয়া শাবকটির নাম রাখিয়াছিলেন লালবাহাদুর। সে অবশ্য অনেকদিন আগের কথা। এখন লালবাহাদুর যুবক হইয়াছে। নিবলেটের কিছু অদ্ভূত শখ ছিল।

তিনি পাহাড়ের জোৎস্না খুব ভালবাসিতেন। বিশেষত পূর্ণিমা রাতে তিনি লালবাহাদুরের পৃষ্ঠে আরোহন করিয়া বনে-জঙ্গলে ঘুরিয়া বেড়াইতেন।

নিবলেট ও রাজকুমার লালবাহাদুরের পৃষ্ঠে আরোহন করিয়া গভীর জঙ্গলে প্রবেশ করিবেন বলিয়া ঠিক হইলো। অতপর তাহারা জঙ্গলে প্রবেশ করিলেন। শিকার ভালমতোই অগ্রসর হইতেছিলো।

রাজকুমার তাহার পটুতা দেখাইয়া অল্প সময়েই দুইখানা মায়া হরিণ আর কিছু পক্ষী শিকার করিয়াছিলেন। নিবলেটও শিকারে ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

বিশেষত এখানে আসিয়া তিনি শিকার করিবার অভ্যাস পরিত্যাগ করেন নাই। সুতরাং দুই জবরদস্ত শিকারীর শিকারের পাল্লা ভালো মতোই চলিতেছিল। কিন্তু হঠাৎ এক অনাবশ্যক উৎপাত শিকারে গোল বাঁধাইলো। কোথা হইতে এক দলছুট বন্য হস্তী তাহাদের সন্নিকটে আসিয়া পড়িলো।

এইখানে উল্লেখ্য যে, বন্য হস্তী লইয়া সর্বদাই সাবধানতা অবলম্বন করা আবশ্যক। কেননা এই সকল পূর্বদেশীয় হস্তী সর্বদা যুথবদ্ধ হইয়া চলাফেরা করিয়া থাকে। তাহারা যখন যুথবদ্ধ থাকে, তখন তাহার একজন দলপতির অধীনে নিয়মবদ্ধ হইয়া চলাফেরা করিয়া থাকে।

তাহারা যুথবদ্ধভাবে যে কোন প্রকার প্রকান্ড ধ্বংশলীলা চালাইতে সক্ষম। তবে দলছুট হস্তী আরও বিপদজনক হইয়া থাকে। ইহারা প্রায়ই উন্মত্তের ন্যায় আচরণ করিয়া থাকে এবং মানব বসতী ও ফসলের প্রভূত ক্ষতি সাধন করিয়া থাকে।

নিবলেট এই বিপদ সম্পর্কে রাজকুমারকে অবহিত করিয়া থাকিবেন। হয়তবা তিনি তাহা করিবার অবকাশ পান নাই। ইহাও অসম্ভব নহে যে ,রাজকুমার এই প্রকান্ড জানোয়ারের রুদ্রমূর্তি দেখিয়া বিচলিত হইয়াছিলেন। আবার ইহাও সম্ভব যে, রাজকুমার তাহার বিরত্ব প্রদর্শন করিবার জন্যই কান্ডটি করিয়াছিলেন।

যাহাই হউক, সেই ক্ষনে কি ঘটিয়াছিলো তাহা আজ আর নিশ্চিত করিয়া জানিবার উপায় নাই। বন্য হস্তীটি যখন তাহাদের দিকে অগ্রসর হইয়াছিলো, রাজকুমার তখন লালবাহাদুরের পৃষ্ঠে বসিয়া বন্য হস্তীটিকে লক্ষ্য করিয়া গুলি ছুড়িয়াছিলেন।

রাজকুমারের গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত হইয়া বন্য হস্তী গভীর জঙ্গলে পলায়ন করিলো। সেই দিককার বিপদ কাটিলো বটে তবে নতুন যে বিপদ ঘটিলো তাহা কেহ কুক্ষণেও চিন্তা করে নাই। লালবাহাদুর হঠাৎ চঞ্চল হইয়া উঠিলো। পাগলপ্রায় হইয়া প্রচন্ড আক্রোশে ছুটাছুটি করিতে লাগিলো।

প্রমাদ গুনিলো মাহুত, সে লালবাহাদুরকে নিয়ন্ত্রণ করিতে পারিলো না। নিবলেট হস্তীপৃষ্ঠ হইতে ভূপতিত হইলেন। তৎক্ষনাৎ সেখানে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করিলেন। অতপর তাহাকে জেলা সদরে আনিয়া বাংলোর অদূরে রিজার্ভমুখ নামীয় স্থানে ব্যাপ্টিস্ট ক্রিশ্চান সিমেট্রিতে সমাহিত করা হইলো।

এই বিয়োগান্ত নাটকের এখানেই সমাপ্তি হইতে পারিত। কিন্তু তাহা হইলো না। লালবাহাদুর তাহার প্রিয় প্রভুকে হারাইয়া অনশন শুরু করিলো। বিরহ-কাতর শোকাতুর লাল বাহাদুর কিছু দিনের মধ্যেই অনাহারে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করিয়া লইলো।

পড়া শেষ করে আমি আবিদের দিকে তাকাই।

'কি বুঝলে?'- আবিদ আমার দিকে ঝুকে আসে। কিন্তু তার দৃষ্টি ঋজু।

'অদ্ভূত'- আমি ছোট্ট করে বলি।

প্রাণীদের মধ্যে প্রভুভক্তির এমন নমুনা প্রচুর না হলেও অপ্রতুল নয়। বিশেষ করে কুকুরের মধ্যে প্রভুভক্তি বেশ দেখা যায়। বিষয়টা তাই অদ্ভূত হলেও অসম্ভব নয়।

কিন্তু অসম্ভব বিষয় হচ্ছে লালবাহাদুরের এভাবে ফিরে আসা। অবিশ্বাস্য। আমরা যদি সাধারণ যুক্তিও ব্যবহার করি তবুও কেউ তা বিশ্বাসযোগ্য বলে মানবে না।

বন্ধুবর আবার উঠলো। এবার একটা লকার খুলে বাধানো পার্চমেন্টের বড় রেজিস্ট্রার নিয়ে আসল। এটাকে বলে সাকসেশান নোট। গোপনীয়। একজন জেলা প্রশাসক তার দায়িত্ব পালন শেষে প্রয়োজন মনে করলে গোপন তথ্য এই ফাইলে লিপিবদ্ধ করে তালাবদ্ধ করে রেখে যান।

যাতে উত্তরসূরীর দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত না ঘটে। কেবলমাত্র জেলা প্রশাসকরাই এটা খুলে দেখতে পারেন। কলোনিয়্যাল প্র্যাকটিস, কিন্তু এখনো চলছে বেশ।

কয়েকজন জেলা প্রশাসকই লালবাহাদুরের এভাবে ফিরে আসার বিষয়টি লিপিবদ্ধ করে গেছেন। সর্ব প্রথম লিখেছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল জে. এ. হিউম। তিনি নিবলেটের বছর তিনেক পর জেলা প্রশাসক হয়ে রাঙ্গামাটি আসেন।

আবিদ আমার দিকে ঠেলে দিল।

ভিক্টোরীয় ধাঁচের প্যাঁচানো হাতের লেখা। পড়তে কষ্ট হয়-

এই বাংলোতে অদ্ভূত কিছু বিষয় রহিয়াছে। যাহারা এখানে আসিবেন, তাহাদের জানা আবশ্যক বলিয়া আমি বোধ করিতেছি। আমি যাহা সম্পর্কে লিখিতেছি, তাহা আর যাহাই হউক না কেন, তাহাতে ক্ষতির সম্ভাবনা নাই। সেই বিষয়ে আমি নিশ্চিত হইয়াছি।

এই হিদন-ভূমিতে মনুষ্যকুল যেইরুপ অদ্ভূত, সেইরুপ অদ্ভূত ইহার প্রকৃতি। যাহার ব্যখ্যা খুজিয়া পাওয়া যায় না। এই বাংলোতে প্রচন্ড জোৎস্নারাতে কখনো কখনো হাতির ডাক শুনিতে পাইবে। কিন্তু সেই হাতি অদৃশ্য তাহাকে কখনও দেখিতে পাইবে না।

'এ বিষয়ে আর নয়। এবার ঘুমানো যাক।'- বন্ধুবর লম্বা প্যাসেজ ধরে দ্রুত পা বাড়ায়। গুড নাইট।

'কিন্তু নিবলেট তো মারা গিয়েছিলেন চন্দ্রঘোনায়। এখান থেকে মাইল বিশেক দূরে'- তার সাথে তাল রেখে পা চালাতে চালাতে আমি বলি।

আবিদ ঘুরে দাড়ায়- 'মনে রেখ বন্ধু, নিবলেট এই বাংলোতেই বাস করতেন। আর লালবাহাদুর তার প্রভুকে পিঠে নিয়ে পূর্ণিমাতে এই বাংলোর আশে পাশে, বন-বাদারেই ঘুরে বেড়াত।'

আবিদ আর দাড়ায় না। তার প্রচ্ছায়া অন্ধকার প্যাসেজের বাঁকে মিলিয়ে যায়।

এসএইচ