ভালোবাসা অনেক সুন্দর একটি শব্দ। যেটা একদিকে যেমন লিখতে ভাল লাগে, তেমনি বলতেও ভাল লাগে। আর শুনতে ভাল তো লাগবেই। একটি সুন্দর মন ভালোবাসার পূর্বশর্ত। ভালোবাসা শব্দটি পদ হিসেবে একটি ক্রিয়াপদ। যার অর্থ সহজে যদি বলি কাউকে পছন্দ করা, শ্রদ্ধা করা বা ভক্তি করা।
একটু ইতিহাসে যদি যাই, ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেইটাইন'স নামে একজন খৃষ্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক ছিলেন। ধর্ম প্রচারের অভিযোগে তৎকালীন রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্রাডিয়াস তাঁকে বন্দী করেন। কারণ তখন রোমান সাম্রাজ্যে খৃষ্টান ধর্ম প্রচার নিষিদ্ধ ছিল।
বন্দী অবস্থায় তিনি জনৈক কারারক্ষীর দৃষ্টহীন মেয়েকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলেন। এতে সেন্ট ভ্যালেইটাইনের জনপ্রিয়তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজা তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেই দিন ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি। অতঃপর ৪৯৬ সালে পোপ সেন্ট জেলাসিউও ১ম জুলিয়াস ভ্যালেইটাইন'স স্মরণে ১৪ই ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টাইন দিবস ঘোষণা করেন।
ছবি: এস এ সজিব
তবে, এই দিবসের খবর যতই ছড়িয়ে পড়ে ততই ভালোবাসার নামে নানা অপসংস্কৃতি ও অশ্লীল কার্যকলাপের বিস্তার লাভ করে। এজন্য এই দিবস পালন নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। এমনকি কোনো কোনো দেশে এই দিবস পালন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশের তরুণ-তরুণীদের অনেকেই দিবসটি পালন করে থাকে। তাদের কাছে রয়েছে এই দিবসের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা।
কিভাবে মূল্যায়ন করছে ভালোবাসা দিবসকে বাংলাদেশের তরুন প্রজন্ম তারই খোঁজে গিয়েছিলাম রাজধানীর একটি বিনোদন কেন্দ্রে। কথা হয় ভালবাসা দিবস পালন করতে আসা বেশ কয়েকজন তরুণ-তরুণীর সাথে। জানতে চেয়েছিলাম ভালবাসা দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে তারা কতটুকু জানে। কিন্তু হতবাক হলাম, ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে দিবসটি পালন করলেও এর প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে বলতে গেলে একেবারে বেখবর বেশিরভাগ তরুণ তরুণী।
অবশ্য ইতিহাস জানুক আর না জানুক দিবসটি নানা বিচিত্র উপায়ে ব্যবহার করতে চান তারা। কেউ কেউ মনে করে, মানুষের মাঝে কারো প্রতি রাগ থাকলে সেটা এই বিশেষ দিনে উপহার বিণিময়ের মাধ্যমে কিছুটা শিথিল করা যায়, যদিও বিষয়টা অনেকটা যুবক-যুবতীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
ছবি: এস এ সজিব
বাঙ্গালী সংস্কৃতিতে অনেক কিছু ধার করা কিংবা বিদেশী সংস্কৃতি থেকে আমদানি করা। এর ফলে এসব বিদেশী সংস্কৃতির গুরুত্বও বেড়ে যাচ্ছে সবার কাছে। আর এসবের কারণে বাংলাদেশের অনেক প্রকৃত সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত হারিয়ে যেতে বসছে এমনটাও মনে করছে তারা।
তাদের মাঝে অনেকেই অবশ্য স্বীকার করছে, এখনকার তরুণ-তরুণী ও যুবক-যুবতীদের অনেকেই ভালবাসা দিবসকে পুঁজি করে অশ্লিল কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়ছে। দিনে দিনে এই ভয়াবহ প্রবণতা বেড়েই যাচ্ছে।
কথা হয় আরেক যুগলের সাথে। তাদের অভিমত, ভালবাসা দিবস হয়ত নির্দিষ্ট একটা বিশেষ দিন। তবে ভালবাসা প্রকাশ করার জন্য এসব বিশেষ দিনের কোন প্রয়োজন নেই। ভালবাসা সবসময় ভাল। আর এই ভালবাসা দিয়ে অনেক কিছু জয় করা যায়।
ছবি: এস এ সজিব
পরিশেষে কথা হয় এক নারী ভিক্ষুকের সাথে। তার নাম বিবি খাদিজা (৬০)। কিছুদিন আগে রাস্তা পারাপারের সময় এক্সিডেন্ট করে এখন খুব কষ্টে চলাফেরা করতে হয় তাকে। পরিবারে দেখাশুনা করার মত তেমন কেউ নেই। যার ফলে অনেক অসহায়ভাবে চলছে তার জীবন। এই ভিক্ষুকও চান সবাই সবাইকে মন খুলে ভালোবাসুক। একজনের বিপদে আরেকজন এগিয়ে আসুক। তাহলেই সবাই ভালো থাকবে।
এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভালবাসা দিবসকে উপলক্ষ্য করে প্রায় শত কোটি টাকা ব্যয় করে আমাদের দেশের তরুণ-তরুণীরা। ধার করা এই সংস্কৃতি পালনের পেছনে কোটি কোটি টাকা খরচ করা কি আমাদের মত নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের জন্য আদৌ যুক্তিযুক্ত?
পশ্চিামাদের এসব সংস্কৃতি পালনে এসব টাকা খরচ না করে যদি বছরে অন্তত একটি দিন হলেও খাদিজা বিবিদের মত মানুষদের জন্য ভাবি আর তাদের পাশে দাঁড়াই তাহলে কি এ পৃথিবীতে প্রকৃত ভালবাসা ছড়িয়ে পড়তনা? আর এসব অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে কি একটি প্রকৃত সুন্দর পৃথিবী এবং একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়া যায়না? এমন একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ার প্রত্যাশা আর চর্চাই হোক সবার ব্রত।
এমএনজে/কেবি





