‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে’ অপরাধী গ্রেফতারে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই আশ্বাসের পর এখন পর্যন্ত তদন্তের জন্য সময় নেয়া হয়েছে ৯৫ বার। এতটি বছরেও কেউ জানে না কারা খুন করেছে কিংবা কেন করেছে। তদন্ত থমকে আছে একই বৃত্তে। শুধু প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পরিবর্তন ছাড়া দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
মামলাটি তদন্ত করছে র্যাপিড আ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সম্প্রতি আদালতের নির্দেশে মামলার তদন্তের অগ্রগতির বিষয় একটি প্রতিবেদন জমা দেয় র্যাব। এরপর আর কোনো অগ্রগতির প্রতিবেদনও দেয়া হয়নি। এরআগে গত চার জানুয়ারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ৯৫ বারের মতো পিছিয়েছে। এবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৫ মার্চ দিন ঠিক করেছেন আদালত। চার জানুয়ারি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ছিল। কিন্তু র্যাব প্রতিবেদন দাখিল না করায় ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাশেদুল আলম প্রতিবেদন দাখিলের জন্য নতুন দিন ঠিক করেন।
চাঞ্চল্যকর এই হত্যার ঘটনার অনুসন্ধান করা সাংবাদিকদের অনেকে মনে করেন, তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গত কয়েকবছর নীরবতা পালন করায় তদন্ত আরো বেশি ব্যাহত হচ্ছে। এই ঘটনা নিয়ে সেসময় সাংবাদিক সংগঠনগুলো ব্যাপক আন্দোলন করলেও কিছুদিনের মধ্যেই তা স্তিমিত হয়ে যায়। এই ইস্যু নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর কার্যকরভাবে চাপ প্রয়োগ করা যায়নি। এ নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিগগিরই তদন্তের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি: সাগর-রুনি খুনের মামলার তদন্তে বিলম্বের বিষয়ে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি সোহেল হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘এই ১১ বছর আমাদের সাংবাদিক সমাজের সঙ্গে খেলাধুলা হয়েছে রাষ্ট্রের দিক থেকে, যেভাবে বিব্রত ও বিভ্রান্ত করা হয়েছে, আমি হতাশ। আমার মতো সাংবাদিক ভাইরাও কিন্তু হতাশায় নিমজ্জিত। তারা ধরেই নিয়েছেন, আমরা যতই আন্দোলন করি, এর কোনো সুরাহা হবে না; খুনিরা ধরা পড়বে না। রাষ্ট্র যেদিকে চলছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেদিকে চলছে। সেদিকেই যাবে। শেষ পর্যন্ত ফল শূন্য হবে। তবে রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বলতে চাই, সাগর-রুনি হত্যাকান্ড নিয়ে কোনো ধরনের গল্প ফাঁদার চেষ্টা করবেন না।’
র্যাবের উদ্দেশে সাংবাদিক সোহেল হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘র্যাব কর্তৃপক্ষকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছি, প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করে কোনো ধরনের গল্প ফেঁদে যদি এই ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে র্যাবের বিরুদ্ধে সাংবাদিক সমাজের লড়াই শুরু হবে। আপনারা যদি এলিট ফোর্সই হয়ে থাকেন, তাহলে কি এলিট ফোর্স একটি ঘটনার তদন্ত করতে ৯৫ বার সময় নেয়। কেউ কি এটা বিশ্বাস করবেন, আপনারা এটি করতে পারছেন না। সবাই ধরে নিয়েছেন, আপনাদের এটি তদন্ত করার সদিচ্ছা নেই। রাষ্ট্র ধরে নিচ্ছে, সাংবাদিক হত্যা হলে আর কী হবে; সাংবাদিকই তো।’ সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া অধিকাংশ সাংবাদিক নেতা অভিযোগ করেন, সাগর-রুনির খুনের বিচার না হওয়ার কারণে আরও অনেক সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন।
সমাবেশে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি মুরসালিন নোমানী বলেন, ‘আমরা আর কতকাল সাগর-রুনির হত্যাকান্ডের বিচারের জন্য অপেক্ষা করব। আর কতকাল সময় দেব? যেকোনো হত্যাকান্ডের বিচার হয়, হচ্ছেÍআমরা দেখেছি। কিন্তু সাংবাদিকদের হত্যাকান্ডের মামলাগুলোর বিচার হচ্ছে না।’ সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের বিচার চেয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে মুরসালিন নোমানী বলেন, ‘অতীতেও আমরা সাংবাদিক সমাজ এক হয়ে বিচারের দাবিতে আন্দোলন করেছি। এখনো আন্দোলন করছি। যত দিন এই খুনের তদন্ত ও বিচার শেষ না হবে, তত দিন আন্দোলন চালিয়ে যাবে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি।’ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলাম আজাদ বলেন, ‘১১ বছরে র্যাব তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য ৯৫ বার সময় নিয়েছে। বিচার তো অনেক দূরের কথা। সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মেঘকে সান্তনা দেওয়ার কোনো ভাষা নেই। সাংবাদিক হত্যাকান্ডের বিচার হয় না। আমি জানি না, সাংবাদিক খুনের মিছিল কত বড় হবে, কবে সাগর-রুনি হত্যার বিচার হবে।’
প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া সাংবাদিক নেতারা অভিযোগ করেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে প্রতিনিয়ত সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হচ্ছে, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সাংবাদিক নেতারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি জানান। প্রতিবাদ সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ডিআরইউর সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল, ডিআরইউর সহসভাপতি দিপু সারোয়ার, যুগ্ম সম্পাদক মঈনুল হাসান, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য কিরন শেখ, চ্যানেল আইয়ের বিশেষ প্রতিনিধি মাজহারুল হক মান্না, বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কাজী বোরহান উদ্দিন প্রমুখ।
যা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়েছেন, সাংবাদিক সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকান্ডের বিষয়ে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিতে র্যাবকে নির্দেশনা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমরাও চাই এ হত্যার রহস্য দ্রুত উন্মোচিত হোক। বৃহস্পতিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রীর কক্ষে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার দ্রুত বিচার দাবিতে ডিআরইউর পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি বলেন, সাগর-রুনি হত্যার বিচারের দাবিতে ডিআরইউ আমাকে স্মারকলিপি দিয়েছে। বিচার তো আমরা করতে পারব না, আমরা তদন্ত রিপোর্ট দিতে পারব। আমরা চেষ্টা করছি, অনেক বছর হয়ে গেছে।
আমরাও চাই এ রহস্য উন্মোচিত হোক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, উদীয়মান এই দুই সাংবাদিক, যাদের অনেক প্রতিভা ছিল, তারা দেশকে অনেক কিছু দিতে পারত। তারা আমাদের মধ্য থেকে চলে গেছেন। আমরাও চাই কেন এই হত্যকান্ড হয়েছে, সেটি উদঘাটন করতে। ডিআরইউর স্মারকলিপি আমি র্যাবের ডিজিকে এখনই পাঠিয়ে দিচ্ছি। যেন তাড়াতাড়ি একটা কিছু জানায়, সেই নির্দেশনা তাদের দেবো। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি রহস্য উদঘাটনের। সাংবাদিক নেতাদেরও বলেছি, আপনাদের কাছে যদি কোনও তথ্য থাকে সেগুলো আমাদের জানালে, আমরা সেটিও দেখব।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি। বেডরুম থেকে ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় বাসায় ছিল তাদের একমাত্র সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘ। ঘটনাস্থলে গিয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ‘৪৮ ঘণ্টার’ মধ্যে খুনিদের গ্রেফতার করা হবে। দুই দিন পর তৎকালীন পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেছিলেন, ‘প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে। তখন গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) দুই মাস তদন্তের পর ‘ব্যর্থতা’ জানালে আদালত র্যাবকে তদন্তভার দেন। তারা সাত বছর ১০ মাস ধরে তদন্ত করছে। এই খুনের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো ডিএনএ নমুনার পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেলে মামলার রহস্য উদঘাটন হবে বলে এর আগে র্যাবের কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেছিলেন।
তবে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করেন ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন হাতে পেলেই যে অপরাধী শনাক্ত করা সম্ভব হবে - তেমনটি নাও হতে পারে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, র্যাবের ৬৯টি অগ্রগতি প্রতিবেদনেই ‘গুরুত্বসহকারে তদন্ত চলছে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ২০০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করার কথাও বলা হয়েছে। সন্দিগ্ধ আসামীদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের নাম ও ঠিকানা যাচাই এবং পূর্ব ইতিহাস জানার জন্য গতিবিধি, চাল-চলন গভীর ও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের কথা বলা হয়। ডিএনএ প্রতিবেদন পাওয়ার কথা বলা হলেও চুরি যাওয়া ল্যাপটপ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাঁট, সাগর-রুনির পরনের কাপড়, সাগরের হাত-পা যে কাপড় দিয়ে বাঁধা হয়েছিল সেই কাপড় ও রুনির পরনের টি-শার্ট পাঠানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবরেটরিতে।
২০১৫ সালের ২ ফেব্রæয়ারি দাখিল করা এক প্রতিবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগার থেকে ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) পরীক্ষার রিপোর্টগুলো পাওয়া গেছে। সে রিপোর্ট ও অপরাধচিত্রের প্রতিবেদন (ক্রাইম সিন রিপোর্ট) পর্যালোচনায় দুজন পুরুষের ডিএনএর পূর্ণাঙ্গ প্রফাইল পাওয়া গেছে।
গ্রেফতারকৃত আট আসামি, নিহত দুজন এবং স্বজন মিলে ২১ জনের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল।
এসব পরীক্ষায় সন্দেহভাজন খুনি শনাক্ত হয়নি। এই মামলায় গ্রেফতারকৃত আটজনের মধ্যে পাঁচজন- ফিকুল, বকুল, সাইদ, মিন্টু ও কামরুল হাসান ওরফে অরুণ মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণচন্দ্র রায় হত্যাকান্ডে সঙ্গে জড়িত। গ্রেফতার দেখানো হয় পারিবারিক বন্ধু তানভীর এবং বাসার নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল ও হুমায়ূন কবীরকে। এদের মধ্যে তানভীর, মিন্টু ও পলাশ হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছে। বাকিরা এখনো কারাগারে আছে। মামলার বাদী ও রুনির ভাই নওশের আলম রোমান জানান, এখন কী তদন্ত হচ্ছে তাও আমাদের জানা নেই।





