যদি সাগরে ডিঙি নৌকাটি ডুবে যায়! তাহলে হয়ত এই চুল গোছা তার জীবনের জন্যই ভারী হয়ে উঠবে। উপায়হীন হয়ে শেষ পর্যন্ত চুল কাটার কথাই মেনে নিল। তার কী আর চুলের শখ থাকতে আছে! সে যে অসহায় এক আফগান কিশোরি! পাড়ি দিতে হবে ঝুঁকিপূর্ণ এজিয়ান সাগর।

হ্যা, এমনই এক ঘটনা ঘটেছে তুরস্কের এজিয়ান সাগরের পাড়ে। যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের একটি পরিবার জীবনের তাগিদে, একটু সুখের আশায় যেতে চেয়েছিল ইউরোপের পথে। মাঝে একমাত্র বাধা ছিল এই এজিয়ান সাগর। যেতে হবে ছোট ডিঙি নৌকায় করে। কিন্তু যদি ঢেউয়ের তোড়ে সাগরে ডুবে যায় ছোট্ট এই নৌকাখানি! তখন যদি এই চুলগুলো পানিতে ভিজে ভারী হয়ে যায় তাহলে তো ঠিকমতো সাঁতার দেয়া যাবে না; ভারী চুল হয়ত ডুবিয়েই দেবে। কিংবা নৌকাটি যদি ডুবে যায় আর নৌকার গায়ে কোথাও যদি এই লম্বা চুল আটকে যায় তাহলে? তার চেয়ে নিরাপদ- চুলের বেনিটি কেটে ফেলা। ছোট চুল হলে হয়ত আর মরে যেতে হবে না। চুল কেটে ফেললে এসব সমস্যা হতে বাঁচা যাবে। এমনি ভাবনা থেকে শেষ পর্যন্ত ১০ বছরের আফগান কিশোরিটি কেটে ফেলেছে তার লম্বা চুলের বেনি।

এজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে হয়ত আফগান কিশোরিটি গ্রিস হয়ে ইউরোপের পথে চলে গেছে। কিন্তু তার উজ্জ্বল বাদামি রঙের চুলের গোছাটি পড়ে রয়েছে এজিয়ান সাগরের পাড়ে।  
ঘটনাটি ধরা পড়েছে তুরস্কেরই এক সাংবাদিকের চোখে। তিনি তুলে এনেছেন হৃদয়স্পর্শী এ কাহিনী।
গত সোমবার ৭৮ জন উদ্বাস্তুকে নিয়ে একটি ডিঙি নৌকা তুরস্কের সাহিলেরালতি উপকূল থেকে গ্রিসের লেসবস দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবে। তার আগে আফগান কিশোরির পরিবারের সদস্যরা তার লম্বা চুল কাটার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে বিপজ্জনক এই যাত্রায় সাগরে নৌকাডুবি হলে বাড়তি কোনো ওজন তৈরি না হয়। যেন জীবন বাঁচানো সহজ হয়। কেটে ফেলা উজ্জ্বল বাদামি বর্ণের চুলের গোছাটি বাধা ছিল গোলাপি রঙের গার্ডার দিয়ে।
গত মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গে তুরস্কের চুক্তি হওয়ার পর আংকারা সাগর উপকূলের নিরাপত্তা বাড়িয়েছে যাতে ইউরোপের পথে শরণার্থীদের চাপ কমানো যায়। বিনিময়ে তুরস্ক নগদে পেয়েছে ৩০০ কোটি ইউরো। সঙ্গে আরো থাকবে তুর্কি নাগরিকদের সহজ ভিসাপ্রাপ্তির সুবিধা এবং ২৮ জাতির এ জোটে যোগ দেয়ার পথও খোলা যায় কিনা তা নিয়ে আলোচনা হবে।
চুক্তির কারণে তুর্কি উপকূলে নিরাপত্তা জোরদার করায় এখন অপরিচিত ও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ইজমির বাদেমলি ও সাহিলেরালতি উপকূল দিয়ে বিপজ্জনক সাগর পথে গ্রিস হয়ে ইউরোপের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে উদ্বাস্তুরা। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ উদ্বাস্তু একটু নিরাপদ জীবনের আশায় অনিরাপদ ডিঙি নৌকায় করে এজিয়ান সাগর পাড়ি দেয়ার চেষ্টা করে। কেউ সফল হয়, কেউ হয় না; কেউবা মারা যায় সাগরের পানিতে ডুবে। 
চলতি বছর রেকর্ড পরিমাণ ৫,০০,০০০ সিরিয় নাগরিক যুদ্ধকবলিত মাতৃভূমি ছেড়ে তুরস্ক হয়ে অত্যন্ত বিপদসঙ্কুল পথে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে পাড়ি জমিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০০ মানুষ মারা গেছে এজিয়ান সাগরে পড়ে। এ হিসাব দিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা বা আইওএম।
এই সাগরেই নৌকাডুবিতে মারা গিয়েছিল আয়লান কুর্দি নামে তিন বছরের এক শিশু, যার ছবি সারা বিশ্বে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। ওই ঘটনার পর বিশ্বের কথিত মানবতাবাদীরা একটু নড়েচড়ে বসেছিল। ইউরোপের বিভিন্ন তখন উদ্বাস্তু গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছিল। পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে তুরস্কের সঙ্গে এবং এক অর্থে তুরস্ককে ৩০০ কোটি ইউরো ঘুষ দিয়ে শরণার্থী আসা বন্ধ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অর্থ নিয়ে তুরস্ক সেই অনুযায়ী কাজও শুরু করেছে।
এরপরেও নিরুপায় যেসব মানুষ ইউরোপের পথে ছুটে যাচ্ছে একটু নিরাপদ জীবনের আশায় তাদের মধ্যে অনেক নারী-কিশোরিকে হতে হচ্ছে যৌন নির্যাতনের শিকার। অন্য অনেকে কারাভোগসহ নানামুখী নির্যাতন-নিপীড়নের মুখে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো শরণার্থী যাতে আমেরিকায় ঢুকতে না পারে সেজন্য মার্কিন কংগ্রেস তো বিলই পাস করেছে।
প্রশ্ন হচ্ছে- আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া কিংবা লিবিয়া থেকে যেসব উদ্বাস্তু ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে যাওয়ার চেষ্টা করছে তারা কী কোনো অন্যায় করছে? এইসব দেশ কী আমেরিকা, ইউরোপ আর তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের ভয়াবহ থাবার অহায় শিকার নয়? যুদ্ধের কবলে পড়ার আগে কী তারা কখনো ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোতে এভাবে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেছিল? সবাই তো সুখেই ছিল।
কথিত সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে এইসব দেশকে নরকে পরিণত করা হয় নি? কারা এজন্য দায়ী? এজন্য কী ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা আর তাদের প্রধান গুরু আমেরিকা দায়ী নয়? এরাই কী নিজেদের খেয়াল-খুশি আর হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে এইসব দেশকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে নি? তেলের জন্য, কৌশলগত অবস্থান জোরদার করার জন্য কিংবা নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ধরে রাখার জন্য এইসব দেশে যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় নি পাশ্চাত্য?
এই তো সেদিন আমরা দেখলাম- ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার সামান্য স্যরি বলে ইরাক যুদ্ধে ভুলের কথা স্বীকার করেছেন। কী চমৎকার! যেখানে লাখ লাখ মানুষের প্রাণ গেছে, আস্ত জনপদগুলো ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া হয়েছে; কোনো কোনো জাতিকে জেনেটিক্যালি পাল্টে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে সেখানে সামান্য স্যরিই কী যথেষ্ট?
সাম্রাজ্যবাদীদের এই যে বিশাল সর্বনাশা চক্রান্ত তার খেসারত দিতে হচ্ছে আজ লাখ লাখ আদম সন্তানকে। আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া কিংবা লিবিয়া থেকে উদ্বাস্ত হতে হচ্ছে অগণিত মানুষকে। উদ্বাস্তু হয়ে প্রথমে তুরস্ক; পরে তাও পেছনে ফেলে পশ্চিমের দুনিয়ায় চলে যেতে চায় ওরা। তেমনিভাবেই যেতে চেয়েছে নাম না আফগান এ কিশোরি।
কিন্তু শুধু পেছনে পড়ে থাকে নি আফগানিস্তান; পেছনে রয়ে গেছে উজ্জ্বল বাদামি রঙের চুলের বেনিটি। সাংবাদিকের কল্যাণে হয়ত দুনিয়ার বহু মানুষ জানবে আফগান কিশোরির জীবনের এ গল্প কিন্তু মেয়েটির জীবনে এবং তার  মানসপটে যে স্মৃতি রচিত হলো তা কী আর কখনো মুছে যাবে? এজিয়ান সাগরের তীরে যে চুলের বেনি ফেলে গেল তার মূল্য কত? কখনো কী তা আর ফিরে পাবে আফগান ওই কিশোরি!