রাজধানীতে ফরমালিন বিরোধী অভিযানে পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্য করার অভিযোগ উঠেছে। চেকপোস্টগুলোতে দায়িত্বরত ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অসাধু সদস্যরা ফলবাহী ট্রাক চেক না করে ছেড়ে দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ফল ব্যবসায়ীরা।

পুলিশের ফরমালিন বিরোধী অভিযানে ভুল যন্ত্র ব্যবহারের কারণে সৎ ফল ব্যবসায়ীরাও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।

তাদের অভিযোগ,'পুলিশ প্রশাসনের নাগ গলানোর একটা সীমা থাকা দরকার। ডিম আগে না মুরগি আগে? ফলে ফরমালিন আগে নাপুলিশে ফরমালিন আগে?'পুলিশের মধ্যেই তো ফরমালিন।

সমগ্র পুলিশ ফরমালিনে সয়লাভ হয়ে গেছে। সেখানে কোনো শুদ্ধাচার না চালিয়ে ফলমূলে ফরমালিন খুঁজতে আসা স্ববিরোধী বলেও দাবি করছেন অনেক ব্যবসায়ী। এমনই বক্তব্য অসংখ্য ব্যবসায়ীর।

জুয়েল নামে এক যুবক ব্যবসায়ী চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘরে ঘরে চাকুরি দেবার কথা বলে সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। ইউনিভার্সিটি থেকে পড়ে এসে বেকার বসে আছি। চাকুরি তো পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে নিজ বাগানের আম নিয়ে লাভের আশায় ব্যবসা শুরু করেছি। এখন তো দেখছি লাভ তো দূরের কথা মূলধনও উদ্ধার করতে পারবো না।

তার দাবি, নিজের বাগানের আম তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বিক্রি করেন। কোনো ধরণের ফরমালিনের বালাই নেই। তবুও পুলিশের ফরমালিন বিরোধী অভিযানে তার আম ফরমালিনযুক্ত বলে ধরা পড়েছে।

ভুল যন্ত্র ব্যবহার করে অনেক ব্যবসায়ীকে এভাবেই সর্বশান্ত করা হচ্ছে। তেমনী অনেক অসাধু পুলিশ সদস্যের কারণে অসাধু ব্যবসায়ীরা পার পেয়ে যাচ্ছেন যারা ফলমূলে ফরমালিন ব্যবহার করছেন।

পুলিশের সঠিক নজরদারীর অভাবে অসংখ্য সৎ ফল ব্যবসায়ী অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর আটটি পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে ফলের ফরমালিন শনাক্ত করছে পুলিশ। এসব চেকপোষ্টে ভুল যন্ত্র দিয়েফরমালিন পরীক্ষা করা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ ব্যবসায়ীরা করেছেন, তা অস্বীকার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।

গত শুক্রবার ফল ব্যবসায়ীরা সংবাদ সম্মেলন ডেকে অভিযোগ করেছেন, ফরমালিন শনাক্তের সঠিক যন্ত্র ব্যবহার না করে বাতাসে ‘ফরমালডিহাইডের বাষ্প পরিমাপের যন্ত্র’ দিয়ে ফরমালিন পরীক্ষা করা হচ্ছে।

গত এক সপ্তাহে ৩২ লাখ ৩১ হাজার ৪৬০ মণ ফল ধ্বংস করেছে পুলিশ। ব্যবসায়ীদের দাবি এই পরিমাণ ফলের দুই-তৃতীয়াংশই ফরমালিনমুক্ত। কিন্তু পুলিশ তা ফরমালিন বলে চালিয়ে দিয়ে ঘুষ বাণিজ্য করছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুলিশ ফলে ফরমালিন পরীক্ষার জন্য ফরমালডিহাইড-৩০০ নামে একটি যন্ত্র ব্যবহার করছে, যা আসলে তৈরি করা হয়েছে, বাতাসে ফরমালডিহাইডের বাষ্প পরিমাপের জন্য। এটি তাজা ফলে ফরমালিনের উপস্থিতি নির্ণয়ের জন্য নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্টাল সেন্সর নামে একটি কোম্পানি ফরমালডিহাইড-৩০০ মডেলের যন্ত্রটির প্রস্তুতকারক। বাংলাদেশে যন্ত্রটি আমদানি করেছে ট্রেসার ইলেক্ট্রকম। প্রতিটি যন্ত্রের বাজার মূল্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা।

যন্ত্রটির কার্যকারিতা সম্পর্কে বাংলাদেশে আমাদানিকারক প্রতিষ্ঠান ট্রেসার ইলেক্ট্রকমের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, ফরমালডিহাইড-৩০০ মডেলের এই যন্ত্র শুধুমাত্র বাতাসে ভাসমান ফরমালিন শনাক্ত করতে পারে। তবে ফলমূল, মাছ, মাংসসহ অন্যান্য সবজির ফরমালিন শনাক্ত করতে সক্ষম কিনা সে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় নি।

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ, যন্ত্রটি একই আম বোটাসহ পরীক্ষা করে কোনো ফরমালিনের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু, বোটা ফেলে পরীক্ষা করলে তাতে উচ্চ হারে ফরমালিনের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, পুলিশ ব্যবহৃত এই যন্ত্র ব্যবহারে ফলমূলে ফরমালিন ধরা পড়ছে, কিন্তু একই পদ্ধতিতে বিসিএসআইআর, বুয়েট ও ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হলে ফরমালিনের উপস্থিতি টের পাওয়া যাচ্ছে না।

গত বৃহস্পতিবার ডিএমপির হেড কোয়ার্টার্সে ডিএমপির কমিশনার বেনজীর আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, যৌক্তিক পরিণতির দিকে না আসা পর্যন্ত ফরমালিনবিরোধী অভিযান চলবে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অনুযায়ী ফরমালিন পরীক্ষার যন্ত্রটি আদৌ ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্র কিনা আর হলে অভিযান চলবে নাকি নতুন যন্ত্র এনে ফলের ফরমালিন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে সে সম্পর্কে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় নি ডিএমপি মিডিয়ার পক্ষ থেকে।

ওয়াইজঘাট ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস হাওলাদার অভিযোগ করে বলেন, নয়াবাজার ব্রিজের সামনে পুলিশ চেকপোস্টে লিচুবাহী তার একটি ট্রাক পুলিশ ৫ হাজার টাকার বিনিময়ে ফরমালিন টেস্ট না করেই ছেড়ে দেয়। এরকম অনেক ফল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই পুলিশ এভাবে বাণিজ্য করছে বলে জানান তিনি।

ডিএমপির ফরমালিন বিরোধী অভিযানে শুধু রাজধানীতেই কমপক্ষে ১০০ কোটি টাকার ফল ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি আব্দুল কুদ্দুসের।

এব্যাপারে ঢাকা মহানগর ফল আমদানি-রফতানিকারক ও আড়ৎদার বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল ইসলাম জানান, ব্যবসায়ীরা ফলমূলে ফরমালিন দেওয়ার পক্ষে নয়।

তবে বিএসটিআইয়ের যে কাজটি করার কথা সে কাজটি পুলিশ করলে দৃষ্টি কটু দেখায়। যে যন্ত্রটি দিয়ে ফলের ফরমালিন পরীক্ষা করা হচ্ছে তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি আছে বলেও জানান তিনি।

যেসব অসাধু ব্যবসায়ী কার্বাইড মিশিয়ে ফল পাকাচ্ছেন তাদের আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দাবিও করেন তিনি।

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটউটের (বিএসটিআই) ডেপুটি ডিরেক্টর সাইফুল ইসলাম জানান, বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তাদের নিয়েই ডিএমপি ফরমালিন পরীক্ষা করছে। তবে বিএসটিআই ফলে ফরমালিন টেস্ট করতে এ যন্ত্র ও পদ্ধতির কোনোটিই ব্যবহার করে না। বিএসটিআইয়ের নিজস্ব যন্ত্র ও মেথড দিয়ে এসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।

ঢাকা, ২৩ জুন (টাইমনিউজবিডি.কম)// এসআর // কেবি