বন্ধ হয়ে আছে জালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনায় দায়ের করা অসংখ্য মামলার তদন্ত। ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর দুদক আইন সংশোধনের পর প্রতারণা ও জালিয়াতি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় দুর্নীতি দমন কমিশন। তবে ব্যক্তি পর্যায়ের জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলাগুলো তদন্ত করা তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত তদন্ত কর্মকর্তাই নিয়োগ দিতে পারেনি দুদক। ফলে লাল ফিতার বাঁধনে ফাইলবন্দি হয়ে আছে অসংখ্য মামলা।
জালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনায় গ্রেফতারের পর সংশ্লিষ্ট থানাগুলো মামলা দায়ের করলেও এর তদন্তের জন্য চিঠি ইস্যূ করতে হয় দুদক বরাবর। কিন্তু এব্যাপারে দুদকের কোনো সাড়া না মিললে গ্রেফতারকৃতদের ৫৪ ধারায় চালান করে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। এই সুযোগে অপরাধীরা সহজেই আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসছে এবং একই অপরাধে ফের জড়িয়ে পড়ছে।
এসব ঘটনায় থানাগুলোতে নতুন করে জালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনায় মামলা নিতে চাচ্ছে না পুলিশ। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে মামলার জট অপরদিকে সুবিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থীরা। আবার মামলা হলেও তদন্ত না হওয়ায় আদালতও নতুন মামলা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর প্রতারণা, ঘুষ লেনদেন এবং জমি জাল-জালিয়াতিসহ এ ধরনের বিভিন্ন অপরাধ দুদক আইন, ২০০৪-এ তফসিলভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তাই প্রতারণা, ঘুষ, জমি জাল-জালিয়াতি-এ ধরনের অভিযোগ এখন জানাতে হবে দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক)।
মূলত মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ দুদক আইনে তফসিলভুক্ত করার কারণেই ওই সব অপরাধ দুদকের আওতায় চলে গেছে। একারণে এসব অভিযোগ ও মামলা নিয়ে তৈরি হয়েছে এই অচলাবস্থা।
যেসব ধারা দুদক আইনের তফসিলভুক্ত করা হয়েছে, সেগুলো হলো: সরকারি কর্মচারী হয়ে ঘুষ নেওয়া, ঘুষ নিয়ে প্রভাব সৃষ্টি, বেআইনিভাবে নিলাম ডাকা-সংক্রান্ত অপরাধ (দণ্ডবিধির ১৬১ থেকে ১৬৯ পর্যন্ত ধারা), কাউকে বাঁচাতে সরকারি কর্মচারীদের আইন ভঙ্গ বা ভুয়া দলিল প্রণয়ন করা (২১৭ ও ২১৮ ধারা), সরকারি কর্মচারীদের বিশ্বাস ভঙ্গ (৪০৮ ও ৪০৯ ধারা), ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অবহেলা, প্রতারণার মাধ্যমে দলিল জাল করা, তা ব্যবহার (৪২০, ৪৬২-এ, ৪৬২-বি, ৪৬৬-৪৬৯, ৪৭১ ও ৪৭৭-এ ধারা)।
বিপাকে পুলিশ
প্রতারণা ও জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলা নিয়ে ভুক্তভোগীদের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সংস্থাও পড়েছে বিপাকে। প্রতারণা মামলা নেয়ার ক্ষেত্রে দুদকের অনুমতি নিতে হয়। দায়ের হওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ মামলাগুলো দুদক কার্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়। কিন্তু দুদক কর্তৃপক্ষ তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ না করায় মামলাগুলোর তদন্ত পেন্ডিং হয়ে আছে। ভুক্তভোগীরা এসব প্রক্রিয়া না বুঝে পুলিশের কাছে এসে ধর্ণা দেয় কেন মামলা তদন্ত হচ্ছে না।
অপরদিকে আদালত থেকে কৌশলে জামিন নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে প্রতারক চক্রের সদস্যরা। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর এলাকায় জাল-জালিয়াতি ও প্রতারক চক্রকে নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। কারণ জামিনে বেরিয়ে এসে একই প্রতারণায় নামছে প্রতারক চক্র। দুদক আইন সংশোধন করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
ডিএমপিতে হাজার মামলা দায়ের,তদন্ত নেই
ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় অন্তত হাজারখানেক মামলা ফালিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তার অভাবে এসব মামলার তদন্তই শুরু হয়নি। ডিএমপি’র বিমানবন্দর থানায় গত ২০নভেম্বর থেকে জুন মাস পর্যন্ত ৪৩৭টি জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলা দায়ের হয়েছে। মামলা দায়েরের পরপরই মামলার নথি দুদক কার্যালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করেনি দুদক। ফলে তদন্ত ছাড়া মামলাগুলো ফাইলবন্দি থেকে যাচ্ছে।
তদন্তের দায়িত্ব হস্তান্তরে পুলিশের মতামত ছিল না
১৮৬০ সালের তৈরি পেনাল কোডের এই ধারা এতদিন পর পুলিশের কাছ থেকে অন্য একটি সংস্থাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়ার আগে পুলিশের কাছ থেকে কোনো মতামত জানতে চাওয়া হয়নি। ১৯৪৩ সালের পুলিশ রেগুলেশন অব বেঙ্গলে (পিআরবি) বলা আছে, প্রতারণা ও জালিয়াতির মামলার তদন্ত করবে সিআইডি। তাদের কাছে এসব জালিয়াত চক্রকে শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও আছে।
পুলিশের দাবি, প্রতিবছর মেট্রোপলিটন এলাকাসহ সারা দেশের থানায় যে সংখ্যক মামলা দায়ের হয়, তার এক-তৃতীয়াংশ মামলাই হয় জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণা সংক্রান্ত। এসব মামলার তদন্ত পেন্ডিং থাকায় সাধারণ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে।
পুলিশের প্রসিকিউশন বিভাগের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, কেউ প্রতারণা করলে তার সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে অপহরণ, চুরি, মলম পার্টিসহ অন্যান্য অপরাধও জড়িত থাকে। বর্তমানে এসব ধারা দুদকের তফসিলভুক্ত হওয়ায় এ-সংক্রান্ত মামলাও দুদককে দেখতে হবে। মামলা জট কমানো ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিষয়টির অতিসত্বর সমাধান করা উচিত।
৫৪ ধারায় চালান করায় জামিন পাচ্ছে অপরাধীরা
মামলা দায়ের করার পর দুদক তদন্ত শুরু করতে না পারায় পুলিশ আসামীদের আটকে রাখতে পারে না। এ কারণে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠালে সহজে জামিনে বেরিয়ে যাচ্ছে আসামীরা।
গত মার্চের শেষ সোমবার চোরাই স্বর্ণসহ তিন পুলিশ সদস্যসহ চারজনকে গ্রেফতারের পর মামলা করতে দুদকের কাছে লিখিত অনুমতি চায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। কিন্তু অনুমতি না পাওয়ায় ৫৪ ধরায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাদের আদালতে পাঠানো হয়।
গত ১২ মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত জালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনায় বিমানবন্দর থেকে শতাধিক অপরাধীকে কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়। কিন্তু দুদক তদন্ত না করায় অধিকাংশ আসামি জামিন নিয়ে বেরিয়ে গেছে।
গত ১৯শে এপ্রিল রাজধানীর কদমতলী থানা এলাকা ও টঙ্গীর আরিচপুর থেকে ৫৩ হাজার জাল জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আমিনুল ইসলাম ওরফে মামুন ও তৌফিক ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলা দায়েরের পর তা তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়। কিন্তু দুদক কোন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ না করায় প্রতারণা মামলার দুই আসামি আদালত থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে গেছে।
গত ২০শে জুন রাজধানীর মিরপুর ২ নম্বর এলাকা থেকে দলিল লেখক মেহেদী হাসান, টুকু মিয়া ও ওবায়দুর রহমানকে আটক করে। মেহেদীর বাসা থেকে ১৪টি বালাম বই ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের দুই শতাধিক নকল সিল উদ্ধার করা হয়।
এরপর তেজগাঁও রেজিস্ট্রি অফিসের পিয়ন আলী আহমেদ কেটু, দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কর্মরত আবদুস সোবহানসহ আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় রাজধানীর মিরপুর থানায় দু’টি মামলা দায়ের করা হয়। জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার মূল মামলাটি স্থানান্তর করা হয় দুদকে। দুদক তদন্ত না করার কারণে সব আসামি জামিন নিয়ে বেরিয়ে গেছে।
বিপাকে দুদকও
দুদক আইন সংশোধনের ফলে জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার সব মামলা দুদকের ওপর তদন্তের দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু লোকবলের অভাবে দুদককে পড়তে হচ্ছে বিপাকে। তাই মামলা তদন্ত করতে আগ্রহী নয় দুদক। এসব মামলার তদন্ত আগের মতো পুলিশকে দিয়ে করানোর জন্য দুদক সুপারিশ করেছে।
সারাদেশে প্রতিবছর পুলিশের কাছে যে সংখ্যক মামলা হয়, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জালিয়াতি ও প্রতারণা-সংক্রান্ত ধারায়। এসব মামলার তদন্তের ভার দুদকের ওপর ন্যস্ত হওয়ায় এটি প্রতিষ্ঠানটির কাজের গতিও কমে যাচ্ছে। দেশের সব এলাকায় দুদকের নেটওয়ার্ক নেই। তাই এসব ধারায় মামলা নিয়ে গ্রামের বাসিন্দারা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে গেলেও তারাই আইনি বাধ্যবাধকতায় এসব ঘটনার কোনো সুরাহা করতে পারছেন না।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, আইন মন্ত্রণালয় থেকে ধারা সংশোধনের জন্য একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। কিন্তু সেই প্রস্তাব কয়েক মাস ধরে পড়ে আছে সচিবের দপ্তরে। ফলে প্রতারণা ও জালিয়াতি সংক্রান্ত মামলাগুলোর তদন্ত তবে কে করবে সে সমাধান শিগগিরই হচ্ছে না।
এব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার শাহাবুদ্দিন টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, আমাদের হাতে এত জনবল নেই যে, ব্যক্তি পর্যায়ের সকল জালিয়াতি ও প্রতারণা মামলা আমরা তদন্ত করবো। আমরা শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণার মামলাগুলো তদন্ত করছি। ব্যক্তি পর্যায়ের জাল-জালিয়াতি ও প্রতারণা সংক্রান্ত মামলাগুলো পুলিশ তদন্ত করবে। আমরা এবিষয়ে ‘রিকমান্ড’করেছি।
ঢাকা, জেইউ, ১৪ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর





