'আমি কবির স্যারের ব্যক্তিগত গাড়িচালক। আমি কোনো অপকর্মের সাথে জড়িত নই। আমি কিছুই জানি না। এসব ব্যাপারে সব স্যার জানেন। স্যার যখন যেখানে যেতে চান আমি সেখানে নামিয়ে দিয়ে আসি মাত্র। আমারে আপনারা হয়রানি কইরেন না।'
শনিবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের ২১/১১ নম্বরের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালায় র্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগে সেখান থেকে ৬ নারী ও চার পুরুষকে আটক করে র্যাব-২ এর সদস্যরা। এরপরেই গোয়েন্দা ‘পুলিশ’ ও যৌনকর্মীদের যৌথ এই প্রতারণার বিষয় প্রকাশ্যে আসে।
আটকদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) সোলায়মান কবিরের (ওরফে এস কবির) গাড়ী চালক গাড়িচালক মো. হাছান। র্যাবের হাতে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে হাসান এসব কথা বলেন।
তিনি জানান, কবির স্যার এই বাসায় মাঝেমধ্যে আসেন। লোকদের ধরে নিয়ে যান। তবে তাদের কী করেন এ বিষয়টি আমি জানি না।
পরে আবার জানান, 'দেহ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করেন কবির স্যার। উক্ত বাসায় বিভিন্ন লোকজনকে প্রলোভন দেখিয়ে আনার পরে অসামাজিক কর্মকান্ডে তাদের সংশ্লিষ্টতা ফাঁস করে দেয়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হতো'।
তিনি আরও জানান, প্রতি মাসে ১৩ হাজার টাকা বেতনে কবির স্যার আমাকে চাকুরি দেন। নিজেকে এসব অসামাজিক কার্যকলাপের সাথে কোনো ধরণের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন তিনি।
তবে ওই বাসা থেকে উল্লেখিত নাম ও পদবীর ভিজিটিং কার্ড উদ্ধারের পর র্যাব-২ জানায় হাছান এই চক্রটি পরিচালনা করে।
ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অপকর্ম চালানোর অভিযোগে সেন্টু (৩৫) নামে আরেক ব্যক্তিকেও আটক করেছে র্যাব। আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সেন্টু র্যাবকে জানায়, উক্ত ফ্ল্যাটটি ৪ বছর আগে ভাড়া নেন তিনি। এরপর থেকেই এই অনৈতিক ব্যবসা চালু করেন।
পরবর্তিতে সেখানে বাগড়া দেন ডিএমপি'র ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) সোলায়মান কবির। তিনি তার ভাড়া করা হোটেল থেকে খদ্দের উঠিয়ে নিয়ে যেতেন। পরে ব্লাকমেইল করে মোটা অংকের টাকা আদায় করতেন। টাকা দিতে কেউ গড়িমসি করলে বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের জানাতেন। ফলে অনেকে টাকা দিতে বাধ্য হতেন।
সেন্টু র্যাবকে জানান, সোলায়মান কবির ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) বলে আমাদের কাছে পরিচিত। তাকে ব্যবসায়িক বখরাও দিতে হয়েছে।
র্যাব-২ এর একটি সূত্র জানায়, এস কবির ডিবির একজন সদস্য হলেও তিনি চলাফেরা করেন বিলাসবহুল গাড়িতে। হাসানের মতো লোককে রেখেছেন ড্রাইভার হিসেবে। বিলাসবহুল গাড়িটি ব্যবহার করেন খদ্দের ধরে নিয়ে যাবার পর মুক্তিপণ আদায়ের কাজে। সুন্দরী নারীদের দ্বারা তিনি খদ্দের ধরতেন।
এরপর দেহের প্রলোভন দেখিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে যেতেন গোপন স্থানে। সেখানে আটকে রেখে তিনি দেহ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে তাদের মামলার ভয় দেখাতেন। আটকে রেখে পরিবারের কাছে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। এর পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষকে ধরে এনে মামলার ভয় দেখিয়ে আদায় করেন মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ।
সেন্টু অনেকবার বাসাটি ছেড়ে দিতে চাইলেও এস কবিরের কারণে পারেন নি তিনি। তিনি কবিরের ফাঁদে আটকে গিয়েছিলেন। বাধ্য হয়ে তিনি এই দেহব্যবসা চালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সেন্টু র্যাবকে জানায়, খদ্দের ধরে বিভিন্নভাবে ভয় দেখাতেন। আদায় করতেন মোটা অঙ্কের টাকা। এ কাজে প্রধান সহযোগী ছিলেন তার গাড়িচালক মো. হাসান।
র্যাব-২ সূত্র জানায়, মোহাম্মাপুর, ১৬/১৯ বাবর রোড, জনৈকা মোছা. পারভীন (৩৫) এর আগে র্যাবকে অভিযোগ করে জানায়, চলতি মাসের ৭ তারিখে তার স্বামী দুলাল(৪০) কে উক্ত ফ্ল্যাট থেকে আটক করে হাছান ও এসআই এস কবির।
দাবি করেন ৫০ হাজার টাকা। পরবর্তীতে পনেরো হাজার টাকার বিনিময়ে তিনি তার স্বামীকে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের সামনে থেকে ছাড়িয়ে আনেন।
মো. বাবু (৪৫) আরেক র্যাবকে অভিযোগ করে জানিয়েছেন, গত ৭ সেপ্টেম্বর তাকেও উক্ত ফ্ল্যাট থেকে আটক পূর্বক ব্লাকমেইল করে তার কাছে ১ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরবর্তীতে তার কেডিট কার্ড ব্যবহার করে গুলশান-২ এর ব্র্যাক ব্যাংকের বুথ থেকে ৭৭ হাজার তুলে নেয় এস কবির ও তার ড্রাইভার হাছান।
জানা গেছে, সোলায়মান কবির গতবার আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগে যোগদান করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের কনস্টেবল ছিলেন। ওই সময় তিনি মাদক, হোটেলে দেহ ব্যবসা ও স্পা সেন্টার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সোলায়মান কবির (এস কবির) গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগে প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন। গোয়েন্দা পুলিশের কোনো অভিযান দলে তিনি সম্পৃক্ত নন।
এব্যাপারে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (ডিসি) শেখ নাজমুল আলমের সাথে
যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো তথ্যানুসন্ধান না করে কোনো মন্তব্য করবেন না বলে জানান।
র্যাব-২ এর অপারেশন অফিসার এএসপি
মারুফ জানান, ‘মূলত: ভুক্তভোগীদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে আমরা বিষয়টি সম্পর্কে অনুসন্ধান চালাই। অনুসন্ধানে ভিত্তিতে জানতে পারি, একটি চক্র দেহ ব্যবসা করার পাশাপাশি ব্ল্যাকমেইল করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে। সাধারণ মানুষ নারীর প্রলোভনে পরে নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। এরপরেই সেখানে অভিযান চারিয়ে নারীসহ ১০ জনকে আটক করা হয়।
র্যাব-২ এর অধিনায়ক কে এম আজাদ বলেন, হাছান নামে আট্ককৃত একজন জানান, তিনি ডিবির এসআই সোলায়মান কবিরের গাড়ীর ড্রাইভার এবং কবির এই চক্রের সঙ্গে জড়িত।
আটকৃত হাছান এবং কথিত এসআই (এস কবির) সত্যিকার ভাবেই ডিবিতে চাকুরীরত কিনা বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে তথ্য অনুসন্ধান চলছে। ঘটনার সত্যতা পাওয়া সাপেক্ষে ডিবির কথিত এসআই ও ড্রাইভারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হবে। গ্রেফতারকৃত অন্যান্য আসামীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
ঢাকা, জেইউ, ১৪, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর





