চল বন্ধু চলো যাই কুয়াকাটা ঘুইরা আই সাগর কন্যা কুয়াকাটা চলো ঘুইরা আই’ দরাজ কন্ঠে হৃদয়-কাড়া সুর ছন্দে ছড়িয়ে পড়ছে এখন চারদিকে। কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে ছোট্র একটি চায়ের দোকানে গানের সুরে পর্যটকের ভীড় জমায় সন্ধ্যার পরে।
স্বরচিত গানটির কথা ও সুরে যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে পর্যটকরা। কেউ চা ও ডাবের ওর্ডার দিচ্ছে। কেউ খাচ্ছেন পান। আবার কেউবা সিগারেটের লম্বা টানে হারিয়ে যাচ্ছে গানের মাঝে।
কুয়াকাটা শিল্পী গোষ্ঠীর একাডেমিতে চলে তার শিক্ষকতা কাজ। পরিচিতরা ডাকে ওস্তাদ কিংবা গুরুভাই বলে। সমুদ্র পাড়ের অতি পরিচিত মুখ এখন বাউল রেজাউল করিম শাহ।

আড়াই বছর আগে তিনি মংলা থানার গোয়ালির মেঠ থেকে ভাগ্যান্বেষণে চলে আসেন পর্যটন নগরী সাগর কন্যা কুয়াকাটায়। মিষ্টি ভাষী বাকপটু মানুষটির প্রেমে পড়ে যায় অনেকেই। যারাই তার কাছাকাছি এসেছে বিমুগ্ধ হৃদয়ে অর্জন করেছে তার নিবিড় ঘনিষ্ঠতা। অসাধারণ মেধার অধিকারী লালন ভক্ত এ গুনি শিল্পী একাধারে কন্ঠ শিল্পী, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকার, পাতার বাঁশি বাদক, যাত্রাপালার কুশীলব ও লাঠি খেলোয়ার।
কুয়াকাটা শিল্পী গোষ্ঠী এবং স্থানীয় শুভাকাঙ্খী ভালোবাসায় আপ্লুত হয়ে তার প্রতি বাড়িয়ে দেন আর্থিক সহযোগিতার হাত। মাত্র ২৩০০ টাকা দিয়ে সৈকতে শুরু করেন চায়ের দোকান। দৈনিক বেচাকেনা হয় এক দেড় হাজার টাকা।

পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠানগান গেয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে চলে তার দরিদ্র পরিবার। দুই ছেলে ও এক কন্যা নিয়ে কেটে যাচ্ছে তার ৫৮ বছরের জীবন। বড় ছেলে সবুজ খুলনায় অনার্সে পড়ে। ছোট ছেলে সজিব এসএসসি পরীক্ষার্থী। কন্যা সাথিকে বড় ঘরে বিয়ে দিয়ে তিনি হালকা করেছেন দুশ্চিন্তার ভার।
সন্তানদের সম্পর্কে তিনি বলেন, এখন কঠিন সময় চলছে। শত জনের মধ্যে একজন মানুষ পাওয়া দুরুহ। আমার প্রত্যাশা ওরা যেন মানুষ হয়।
প্রবীন এ গুনি শিল্পী রেজাউল করিম শাহ একজন লালন ভক্ত। লালনের গান গাইতে বেশ স্বাচ্ছন্দ মনে করেন। সৈকতে দোকানে বেচাকেনার ফাঁকে ফাঁকে দরদী কন্ঠে গেয়ে ওঠেন লালনের বিভিন্ন গান।
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা কর্মকর্তারা দোকানে বসে পান করেন তার হাতে বানানো চা। বাড়তি পাওনা হিসেবে তারা উপভোগ করেন ভাবপ্রধান কন্ঠে তার গান। পরিতৃপ্তির রেশটুকু তারা বুকে ধারণ করেন।

পর্যটকদের বিনোদনে তিনি একতারা হাতে গেয়ে যান সাঁইজির গান-‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি, মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপারে তুই মূল হারাবি....কিংবা গেয়ে ওঠেন-‘সমুদ্রের কিনারায় থেকে জল বিনে চাতকী মলো, হায়রে বিধি ওরে বিধি, তোর মনে কি ইহাই ছিল...’ কিংবা ‘ওই চরণে দাসের যোগ্য নই, নইলে মোর দশা কি এমন হয়...’
ওস্তাদ শেখ মোতালেব বাউল’র কাছে ১২/১৩ বছর বয়সে সংগীতে তার হাতেখড়ি। তখন থেকেই তার সংগীত সাধনা চলতে থাকে। এদিকে গান গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করতে শুরু করেন তিনি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লালন সংগীত ও নিজের লেখা গান গেয়ে ভক্তদের মাতিয়ে রাখেন এ বাউল শিল্পী।
তাঁর জীবনের স্মরণীয় অর্জন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সংগীত জীবনে একটি স্মরণীয় ঘটনা মনে পড়ে। ৫/৭ বছর আগে রায়েন্দা নামক স্থানে একটা অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলাম। সেখানে শ্রোতা-দর্শকদের কাছ থেকে ১১টি ফুলের মালা পেয়েছিলাম। বকশিস পেয়েছিলাম ৬ হাজার টাকা। এ সম্মান আমাকে সংগীতের প্রতি অনেক প্রেরণা জুগিয়েছে।
স্বল্প শিক্ষিত রেজাউল করিম শাহ কাজের ফাঁকে লিখে চলছেন শ্রোতা জয় করা অনেক গান। এ যাবৎ নিজের লেখা গানের সংখ্যা প্রায় ৫’শ। তিনি যৌতুক ঠেকাও, প্রগতির পথে ও দিপদ সংকেত নামে তিনটি মঞ্চ নাটকও লিখেছেন। যা মঞ্চস্থ হয়ে দর্শকপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
গানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার গানগুলো ছাপানোর খুব ইচ্ছে। এতে অনেক টাকা প্রয়োজন। আমার স্বল্প আয়ে তা সম্ভব না। কোনো দরদী এগিয়ে এলে আমার এ শ্রম সার্থক হতো।
তিনি আরও বলেন, মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে অনেক সাহেবরা আসেন। গান রেকর্ড করে নিয়ে যান। কিন্তু কোনো টাকা দেন না। তবু আমি খুশি এই ভেবে যে আমার গানগুলো তো কারও কাছে কদর পেয়েছে।
নিজের লেখা একটি গান শুনতে চাইলে তিনি শুরু করেন, ‘আমায় থুইয়া নিঠুর বন্ধু ক্যামনে রইলা বৈদ্যাশে, তোমার লাইগা প্রাণ কাঁদে রইতে নারি ঘরে’ চল বন্ধু চল যাই কুয়াকাটা ঘুইরা আই সাগর কন্যা কুয়াকাটা চল ঘুইরা আই-- -।
রেজাউল করিম শাহ, এমন এক বাউল কবি গান গাওয়াই যার নেশা। গানের মাঝেই যেন খুঁজে পান স্বর্গ সুখ। পর্যটক ও স্থানীয়দের গান শুনিয়ে লাভ করেন আত্মার খোরাক। চা-সিগারেট বিক্রি করে সারা দিন কাটিয়ে দেন সৈকতে। একটু ক্লান্তি আসলেই হাসি মুখে গেয়ে যান গান। এতেই যেন তাঁর তৃপ্তি।
শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে তিনি সুরে সুরে ছড়িয়ে দিলেন সাঁইজির সেই সত্যের বাণী-- -‘সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন, সত্য সুপথ না চিনিলে পাবিনে মানুষের দর্শন।
আমির/এসএম





