‘লাব্বাইক, আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হাম্দা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়ালমুল্ক্’। অর্থাৎ—‘আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত শুধু তোমারই, সব সাম্রাজ্যও তোমার।
পৃথিবীর দিক-দিগন্ত হতে আল্লাহর মেহমান মুসলমানরা হজ্জ করার উদ্দেশ্যে বাইতুল্লাহ শরীফে প্রতিবছর জিলহজ্জ মাসে সমবেত হয়।
হজ (আরবি: حج) ইসলাম ধর্মাবলম্বী অর্থাৎ মুসলমানদের জন্য একটি আবশ্যকীয় ইবাদত। এটি ইসলাম ধর্মের পঞ্চম স্তম্ভ। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য জীবনে একবার হজ সম্পাদন করা ফরজ বা আবশ্যিক।
আরবি জিলহজ মাসের ৮ থেকে ১২ তারিখ হজের জন্য নির্ধরিত সময়। হজ পালনের জন্য বর্তমান সৌদি আরবের মক্কা নগরী এবং সন্নিহিত মিনা, আরাফাত, মুযদালিফা প্রভৃতি স্থানে গমন এবং অবস্থান আবশ্যক। এটি পৃথিবীর বাৎসরিক তীর্থযাত্রা। যিনি হজ সম্পাদনের জন্য গমন করেন তাঁকে বলা হয় হাজী।
বিদায় হজ্জ:
মক্কা বিজয়-এর দ্বিতীয় বছরে ইসলামের নবী মুহম্মাদ তাঁর জীবনের সর্বশেষ হজ্ব পালন করেন। এটি বিদায় হজ্জ নামে মুসলিমদের কাছে পরিচিত। এর পূর্ববর্তী বৎসরে তিনি হজ্ব করেননি। মক্কা বিজয়ের পরবর্তী বছরে ইসলামের প্রথম খলিফা আবুবকর এর নেতৃত্বে হজ্ব সম্পাদিত হয়। পরবর্তী বৎসরে মুহম্মাদ হজ্বের নেতৃত্ব দান করেন। বিদায় হজ্বের মাধ্যমে তিনি মুসলিমদের জন্য আদর্শরূপে হজ্ব পালনের নিয়মাবলী উল্লেখ এবং প্রদর্শন করেন। এই হজ্বের সময় তিনি আরাফাতের ময়দান-এ যে ভাষণ প্রদান করেন তা মুসলিমদের কাছে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
হজ্জের গুরুত্ব,তাৎপর্য ও শিক্ষা
বাইতুল্লাহ বিশ্ব মুসলিমের মিলন কেন্দ্র। জিলহজ্জ মাসেই উদযাপিত হয় পবিত্র হজ্জব্রত, ঈদুল আযহা ও কুরবানী। আল্লাহ তায়ালা সমগ্র মাখলুকাত সৃষ্টি করার পূর্বে প্রথম বাইতুল্লাহ সৃষ্টি করেছেন।
হজ্জ ফরয হওয়ার শর্তসমূহ
(১) মুসলমান হওয়া, (২) বালেগ হওয়া, (৩) সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া, (৪) হজ্জ করার মত দৈহিক ও আর্থিক সামর্থ হওয়া, (৫) যাতায়াতের পথ নিরাপদ হাওয়া (৬) মহিলাদের জন্য মুহরেম সঙ্গী সাথে থাকা।
আল্লাহতায়ালা কত চমৎকার করে হজের গুরুত্ব বর্ণনা করেছেন। এরও প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর পূর্বে মুসলিম জাতির জনক হযরত ইব্রাহিম (আ.)-কে লোকদের মাঝে হজের ঘোষণা দেওয়ার জন্য আল্লাহতায়ালা নির্দেশ প্রদান করেন। যেমন আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর মানুষের মাঝে হজের জন্য ঘোষণা প্রচার করো। তারা দূর-দূরান্ত থেকে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশবায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে তোমার কাছে আসবে।’ (সূরা-হজ : ২৭)।
আল্লাহর প্রিয়তম হাবিব তাঁর বক্তৃতায় বলেন, ‘হে মানবমণ্ডলী, তোমাদের ওপর হজ ফরজ করা হয়েছে, সুতরাং তোমরা সবাই হজ আদায় করো।’ (মিশকাত-২০০৭)।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত : তিনি বলেন, “রাসূল (স.)-কে জিজ্ঞাসা করা হলো, কোন আমল সবচেয়ে উত্তম? তিনি বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ইমান আনা। আবার জিজ্ঞেস করা হলো, এর পর কোন আমলটি? তিনি বললেন, আল্লাহর পথে ‘জিহাদ করা’। পুনরায় জিজ্ঞেস করা হলো, এর পর কোন আমলটি? জবাবে বলেন, ‘হজে মাবরুর’ তথা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হজ।” (বুখারি ও মুসলিম)
সঠিকভাবে ও ইখলাসের সঙ্গে হজ আদায়কারী নিষ্পাপ শিশুর মতো হয়ে যায়। যেমন—হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত : তিনি বলেন, রাসূল (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হজ করল এবং হজ সম্পাদনকালে কোনো প্রকার অশ্লীল কথা ও কাজ কিংবা গোনাহের কাজে লিপ্ত হয়নি, সে সদ্যোজাত নিষ্পাপ শিশুর ন্যায় প্রত্যাবর্তন করল। (বুখারি ও মুসলিম)
অন্য হাদিসে বিশ্বনবী (স.) বলেন, হজে মাবরুর বা কবুল হজের বিনিময় হলো (আল্লাহর) জান্নাত।’। (মিশকাত-২০১০)
হজে গমনকারী ব্যক্তির কতই না খোশ নসিব যে, সে আল্লাহর যাত্রীদলের অন্তর্ভুক্ত। যেমন হাদিস শরিফে এসেছে, প্রিয় নবী (স.) বলেন, ‘তিন শ্রেণির লোক আল্লাহর যাত্রীদল, (তারা হলো) যোদ্ধা, হাজি ও ওমরাহকারী।’ (মিশকাত-২০৩৮)
হজ শুধু পরকালীন কল্যাণই বয়ে আনে না, বরং ইহকালের কল্যাণের বারতাও নিয়ে আসে। যেমন—আমাদের প্রিয় রাসূল (স.) বলেন, তোমরা হজ ও ওমরাহ বিলম্ব না করে পরস্পর সম্পাদন করো। কারণ, এ দুটো ইবাদত দারিদ্র্য ও পাপসমূহকে এমনভাবে দূর করে, যেভাবে হাপর লৌহ ও স্বর্ণ-রৌপ্যের ময়লা দূর করে দেয়। ( মিশকাত-১০২৬)
সত্যিই হজ মুসলিম মিল্লাতের জন্য সৌভাগ্যের পরশ পাথরের ন্যায়। কেননা, রাসূল (স.) বলেছেন, হজ ব্যক্তির পূর্বের গুনাহ ধ্বংস করে দেয়।
তাই রাসূল (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি হজের ইচ্ছা করেছেন, তিনি যেন তাড়াতাড়ি করেন। (মিশকাত-২০১৫)
হজ্জের শিক্ষা : ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ বলে বান্দা হজ বিষয়ে আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে আল্লাহর যে কোনো ডাকে সাড়া দেয়ার ব্যাপারে সদা প্রস্তুত থাকার কথা ঘোষণা দেয়। এবং বাধাবিঘ্ন বিপদ-আপদ কষ্ট-যাতনা পেরিয়ে যে কোনো গন্তব্যে পৌঁছতে সে এক পায়ে দাঁড়িয়ে আছে, এ কথা ব্যক্ত করে।
(1) তলবিয়া পাঠ : আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ ও অহীর ভিত্তিতে জীবন পদ্ধতি পরিচালনায় শপথ হজ্জে লাখো লাখো মুসলিম আল্লাহর আইন অনুযায়ী সমগ্র জীবন পরিচালনার শপথ গ্রহণ করে।
(2) বিশ্ব সংহতি মানব ঐক্য বিশ্ব জনীন সভ্যতার মিলন কেন্দ্র : হজ্জের মহান অনুষ্ঠান মুসলিম উম্মাহর মধ্যে বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব মানব ঐক্য ও অবিচ্ছেদ্য সংহতির এক মহান নিদর্শন।
(3) সাম্য মৈত্রীর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত : হজ্জ দুনিয়ার সাদা কালো, জীর্ণশীর্ণ বিচিত্র ভাষা ও বিচিত্র বর্ণের লোকদের আরাফাতের ও কা'বার চারিপাশে তাওয়াফরত অবস্থায় একত্রিত করে, সম্প্রীতির, মৈত্রীর সৌভ্রাতৃত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও সুমহান শিক্ষা প্রদান করে। ইহা সাম্যের এক অপূর্ব দৃশ্য।
(4) বিশ্বজনীন জাতীয়তার এক বাস্তব নমুনা : হজ্জ মুসলিম উম্মাকে বিশ্বজনীন জাতীয়তা কা'বা কেন্দ্রিক সভ্যতা ও তাওহীদ তথা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ভিত্তিক সার্বজনীন সমাজ ও বিশ্বরাষ্ট্র গঠনের এক বাস্তব নমুনা।
(5) ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে : পি,কে হিট্রি বলেন, ‘যুগ যুগ ধরে হজ্জের বিধান ইসলামের প্রধান ঐক্য সংস্থাপক শক্তি ও বিভিন্ন দেশীয় মুমিনদের মধ্যে অত্যন্ত কার্যকর সূত্র হিসাবে কাজ করে আসছে।
(6) হজ্জ মাগফিরাত ও তাওবার এক মহান সুযোগ : আল্লাহর ঘরের যিয়ারত আরাফাতের তাওবা ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর বান্দাহ মাগফিরাতের এক মহান সুযোগ লাভ করে। প্রিয় নবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘মকবুল হজ্জের প্রতিদান একমাত্র জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নহে। হালাল অর্থ বিনিয়োগে হজ্জ সম্পাদনকারীর গুণাহ মাফের নিশ্চয়তা আল্লাহ রাসূল প্রদান করেছেন।
(7) আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্বদান : হজ্জ মুসলিমদের ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করে বিশ্ব নেতৃত্বের অধীনে আবদ্ধ হওয়ার পথে সীমাহীন প্রেরণা যোগায়।
(8) ইব্রাহীম (আ.) ও ইসমাঈলের স্মৃতি স্মারক : ‘‘হজ্জ হচ্ছে হযরত ইব্রাহীম (আ.) ও তদীয় স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর স্মৃতির স্মারক হাজীদের অন্তরে হজ্জের কার্যাবলী পালনের সময় তাদের কষ্ট কোরবানী ও আত্মত্যাগের চিত্র ভেসে ওঠে।
(9) ইসলামী জাগরণের মহা সাড়া : হজ্জের সময় মুসলিম দেশগুলোতে বা সারাবিশ্বে ইসলামী মহাজাগরণের এক মহা সাড়া সৃষ্টি হয়। এতে হাজীগণসহ প্রত্যেক মুসলমানদের অন্তরে ইসলামী বিপ্লবের কথা স্থান পায়।
(10) জাহান্নামের আযাব থেকে পরিত্রাণ : মহানবী (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা যাকে হজ্জব্রত পালনের সামর্থ দিয়েছেন সে যদি হজ্জ না করে, মৃত্যুবরণ করে, তাহলে সে জাহান্নামের ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক আগুনে পতিত হবে।
মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র হজ্জ পালন এবং মদিনা শরীফ প্রিয় নবীজির রওজা মুবারক যিয়ারতের তাওফিক দান করুন,আমিন।
(লেখক: আদর সোহাগ/আব্দুল কাদের রুহানী, বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ লেখক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।)





