জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা মৃত্যু পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কারাগারে ঈদুল আযহাকে বিদায় জানাবেন। জামায়াতের যেসব নেতা কারাগারের বাইরে আছেন তাদেরও একই অবস্থা বলে জানা গেছে। একেক জনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকার কারণে তারাও পরিবার পরিজন থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করছেন।
ধর্মীয় উৎসবগুলোতেও প্রকাশ্যে এসে আত্মীয়-স্বজন ও দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করতে পারছেন না। সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারছেন না। এক প্রকার কারাগারের মতোই তারা জীবন-যাপন করছেন বলে জানিয়েছেন জামায়াতের একাধিক নেতা।
যাদের মধ্যে দলটির প্রধান ও সাবেক মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী। ফাঁসির দণ্ড নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুর-১ কারাগারের কনডেম সেলে এবারের ঈদ করবেন মতিউর রহমান নিজামী। চলতি বছরের ৩০ জানুয়ারী ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় তাকে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছে চট্টগ্রামের বিচারিক আদালত।
তাছাড়া বর্তমানে তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতা বিরোধী অপরাধের মামলার রায় (৪র্থ বারের মত) অপেক্ষমান রয়েছে। ২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার একটি অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা দায়ের করা হয়।
মাওলানা নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন বলেন, 'সাড়ে চার বছর যাবত আমার বাবাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে তিন বছর বিনা বিচারেই আটক ছিল।' তিনি বলেন, তার বাবা রাষ্ট্রীয় জুলুমের শিকার। শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতেই সরকার তাকে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার করে আটক রেখেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, 'বাবা যেহেতু কারাগারে সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই ঈদের আনন্দ আমাদের পরিবারে থাকার কথা নয়। প্রতিবার ঈদ আসলেই আনন্দের পরিবর্তে আমরা খুব কষ্ট অনুভুব করি।'
বাবাকে জাতীয় নেতা দাবি করে নাজিব মোমেন বলেন, মাওলানা নিজামী একাধিকবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। এলাকার মানুষও ঈদ আসলে তার শূন্যতা অনুভব করেন। জানা গেছে, অনুমতি পেলে ঈদের পরের দিন কারাগারে নিজামীর সঙ্গে পরিবারের সদস্যরা দেখা করবেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের প্রিজন সেলে রয়েছেন জামায়াতের সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযম। গত বছরের ১৫ই জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
গোলাম আযমের ছেলে সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, আমার বাবা অধ্যাপক গোলাম আযম হলেন আমাদের পরিবারের মধ্যমণি। দীর্ঘ দিন যাবত তিনি কারাগারে। অসুস্থতার কারণে তিনি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছেন।
এ বয়সে তার পারিবারিক সেবা দরকার ছিল। কিন্তু তিনি সকল প্রকার সেবা যত্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আযমী প্রশ্ন করে বলেন, পিতার এ অবস্থার মধ্যে কী পরিবারে কোনো আনন্দ থাকতে পারে?
তিনি বলেন, ঈদ আসলেই আমাদের সামনে দুঃখ কষ্ট এসে হাজির হয়। বাবা ঈদ-উল আযহায় তার নামে নিজ হাতে একটি খাসি জবাই দিতেন। এটার গোস্ত রান্না হলে বিকালে আমরা সবাই একসঙ্গে খেতাম। কিন্তু এখন আর তা হয় না। প্রিজন সেলে তার কষ্টের কথা মনে হলে পরিবারের কোনো সদস্যই আর সুস্থ থাকতে পারে না।
কাশিমপুর কারাগারে আটক রয়েছেন দলটির নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০১২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দেন। চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের চুড়ান্ত রায়ে তার আমৃত্যু কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। ইতিপুর্বে মাওলানা সাঈদী কনডম সেলে থাকলেও বর্তমানে তিনি আমৃত্যু সাজাপ্রাপ্তদের সেলে আছেন। ২০১০ সালের ২৯ জুন থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
সাঈদীর ছেলে জিয়ানগর উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী বলেন, আমাদের ঈদের আনন্দ পাঁচ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে। পাঁচ বছর যাবত বাবা কারাগারের চার দেয়ালে বন্দী জীবন-যাপন করছেন। সরকারের এ নির্মম নিপীড়নের মধ্যেই আমার বড় ভাই ও দাদী ইন্তেকাল করেন। এ অবস্থায় বাবা হার্ট এ্যাটাক করেন। যা সবাই জানে। তাকে তিনটি রিং পরানো হয়েছে। কিন্তু সরকার মানবিক কারণেও তাকে মুক্তি দিলো না।
তিনি বলেন, ঈদ আনন্দের বার্তা নিয়ে প্রতিবার আসলেও সেটা আমাদের জন্য নয়। আমাদের সকল দুঃখ কষ্টগুলো এখন আল্লাহর কাছে পেশ করেছি। আমার বাবা যেদিন আমাদের মাঝে ও কোরআনের ময়দানে ফিরে আসবেন সেদিনই আমাদের পরিবারে ঈদের আনন্দ ফিরে আসবে।
পরিবার সূত্র জানিয়েছে, অনুমতি পেলে ঈদের দিন বা এর পরের দিন কারাগারে সাঈদীর সঙ্গে দেখা করবেন পরিবারের সদস্যরা।
নারায়ণগঞ্জ কারাগারের কনডেম সেলে রয়েছেন দলের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। ২০১০ সালের ২৯ জুনে তাকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল। গত বছরের ১৭ জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেয়। জামায়াতের এই নেতার বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বিচার কাজ চলছে।
মুজাহিদের ছেলে আলী আহমদ মাবরুর বলেন, ঈদ বলে যা বুঝায় তা এখন আর আমাদের হয় না। আমার বাবা হলেন পরিবারের মধ্যমণি। ঈদ আসলেই আমরা গ্রামের বাড়ি গিয়ে সকলে একসঙ্গে ঈদ করতাম। বাবা সকল আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ খবর নিতেন। পাঁচটি বছর যাবত ঈদের নামাজ পড়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরতে পারি না। আমাদের এই কষ্ট কাউকে বুঝানোর মতো নয়।
তিনি বলেন, এখন আমাদের ঈদ কাটে কারাগার এলাকায়। নামাজ পড়েই কারাগারের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি বাবাকে এক নজর দেখার জন্য। আগে প্রতি সপ্তাহে একবার দেখা করতে পারতাম, কিন্তু ফাঁসি রায়ের পর এখন মাসে একবার দেখা করতে হয়। অভিভাবক ছাড়া দিনগুলো আমাদের খুবই কষ্টে যাচ্ছে।
ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে কাশিমপুর-২ কারাগারের কনডেম সেলে এবারের ঈদ করছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। ২০১১ সালের ১৩ই জুলাই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেফতার হন তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়। আপিল বিভাগে তার মামলার চুড়ান্ত রায় এখন অপেক্ষামান।
কামারুজ্জামানের ছেলে হাসান ইকবাল বলেন, কারাগারেই আমাদের ঈদ। ঈদের নামাজ পড়ে আমরা কারাগারে চলে যাই। আব্বাকে একটু দেখতে পারলে এটাতেই আমাদের আনন্দ লাগে। ঈদে আমাদের আর কোনো আনন্দ নেই। কারণ, সর্বদা আতঙ্কের মধ্যে আমাদের দিন কাটে। আমার আব্বা রাষ্ট্রীয় জুলুমের শিকার।
তিনি বলেন, যে দরজা দিয়ে ঈদের আনন্দ আসতো সে দরজাটা সরকার বন্ধ করে দিয়েছে। সে কারণে এখন আমাদের পরিবারে ঈদ আসে না।
এছাড়াও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে আটক আছেন জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা আবদুস সুবহান ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম। তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচার কার্যক্রমও অনেকটা শেষ পর্যায়ে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাগারে আটক রয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাশেম আলী। ট্রাইব্যুনাল-২ এ তার মামলার রায় অপেক্ষামান আছে।
এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দন্ড মাথায় নিয়ে কারাগারে ঈদ করবেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী। গত বছরের ১লা অক্টোবর তাকে ফাসিঁর দন্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আটক বাহ্মনবাড়িয়ার আওয়ামীলীগ নেতা মোবারক হোসেন কারাগারে ঈদ করবেন। তার মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায়ের জন্য অপেক্ষমান আছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযুক্ত হবিগঞ্জের জাতীয় পাটির সাবেক প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার কারাগারে ঈদ করবেন। তার মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায়ের জন্য অপেক্ষমান আছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত বাগেরহাটের আব্দুল লতিফ তালুকদার, শেখ সিরাজুল হক ওরফে সিরাজ মাস্টার ও খান আকরাম হোসেনের কারাগারে ঈদ করবেন। তাদের মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১ এ অভিযোগ গঠন প্রক্রিয়ায় আছে।
কেএ





