নজরকাড়া অর্থনৈতিক উন্নতি সত্বেও ভারতের গ্রামে বসবাসকারী অনেকেই গভীরভাবে কুসংস্কারে আচ্ছন্ন। তারা ভূত-প্রেত-যাদু-টোনায় বিশ্বাস করেন। মুর্খ সমাজ আর দুরন্ধ্রর সমাজপতিরা অসহায় মেয়ে দেখলে তাদেরকে নানা অপবাদ দিয়ে গ্রাম ছাড়া করে সহায় সম্পত্তি লুট করতে চায়। এ জন্য তারা ব্যাবহার করেন উপ্যনাসের কাল্পনিক চরিত্র ‘ডাইনি’কে। বাংলা ভাষায় ডাইনির শব্দরুপ ডাকিনী, কুহকিনী, মায়াবিনী কিংবা জাদুকরী।

উপমহাদেশের অনেক দেশেই নারীদের এই অপবাদ নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন কিংবা মৃত্যু বরণ করতে হচ্ছে। মধ্যযুগীয় কায়দায় এভাবে তথাকথিত ডাইনির শিকার ভারতের ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড়, বিহার, উড়িষ্যা, উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থানের কিছু কিছু এলাকা যেখানে অহরহ চলছে ডাইনি দমনের নামে অসহায় নারীদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের স্টিম রোলার। দেশটিতে ডাইনি অপবাদ দিয়ে প্রতি বছর প্রায় ২০০ নারীকে হত্যা করা হয়।

ভারতের ‘জাতীয় অপরাধ ব্যুরোর’ পরিসংখ্যান মতে, ডাইনি সন্দেহে এবং জাদুবিদ্যা চর্চার অভিযোগে গত এক যুগে (২০০০ থেকে ২০১২ সাল) দেশটিতে ২ হাজার ৯৭ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে কেবল ঝাড়খণ্ড রাজ্যেই খুন হয়েছেন ৩৬৩ জন।

তবে প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। কারণ ভারতে এখনো এমন অনেক গ্রাম আছে যেখানে ডাইনি সন্দেহে নারী হত্যা করলে কাক-পক্ষীও টের পায় না। অনেক সময় প্রশাসনের গাফিলতিও চোখে পড়ে। পুলিশ না জানার ভান করে এফআইআর নিতে অস্বীকার করে।

সবশেষ গত শুক্রবার মধ্যরাতে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ডে পাঁচ মহিলাকে ‘ডাইনি’ অপবাদ দিয়ে পিটিয়ে এবং পাথর ছুঁড়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। রাতের বেলা এই পাঁচজনকে তাদের বিছানা থেকে টেনে বাইরে এনে মারা হয়। রাজ্যের রাজধানী রাঁচি থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরের মান্দার ব্লকের এক গ্রামে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

তাদের ছেড়ে দেয়ার জন্য পরিবারের সদস্যরা অনেক কাকুতি-মিনতি করলেও হামলাকারীরা তাতে সাড়া দেয়নি বলে জানিয়েছে ঝাড়খণ্ডের পুলিশ। ঝাড়খণ্ডে এ রকম ঘটনা নতুন নয়। সেখানে এর আগেও ডাকিনী চর্চার অভিযোগে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড হয়েছে। নিহতদের সবাই ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সী বলে জানিয়েছে রাজ্য পুলিশ।

ঝাড়খণ্ড পুলিশের মুখপাত্র এসএন প্রধান জানিয়েছেন, বসতিতে রোগ-বালাই বয়ে আনা, চাষাবাদ ভালো না হওয়া এবং গ্রামবাসির খারাপ ভাগ্যের জন্য যাদু-টোনা করার অভিযোগে 'ডাইনি' অপবাদ দিয়ে ওই পাঁচ নারীকে হত্যা করা হয়। গ্রামের একজন 'জানগুরু' এসব দুর্ভাগ্যের জন্য দীর্ঘ দিন ধরে তাদেরকে দায়ি করে আসছিলেন।

জানা যায়, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের গ্রাম-গঞ্জে ধর্মীয় প্রধান তথা বৈদ্য, যাকে গ্রাম্য ভাষায় বলা হয় 'জানগুরু', কোনো অঘটন ঘটলেই বলে দেন, অমুক গ্রামের অমুক নারীকে ভর করেছে ডাইনি। ওর কুদৃষ্টির ফলেই এই অঘটন ঘটেছে।

পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ছত্রিশগড় এবং ঝাড়খণ্ডের বিস্তীর্ণ গ্রামে এই 'জানগুরু'কে ইশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করা হয়। 'জানগুরু' গ্রামের লোকেদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে দলিত, নিরক্ষর নারীদের ডাইনি বলে চিহ্নিত করে দেন। গ্রামের লোকেরা গ্রামকে বাঁচাতে সেই নারীর উপর শুরু করে অকথ্য অত্যাচার।

ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী রঘুবীর দাস ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি সমাজের মানুষদের প্রতি বিষয়টি বিবেচনায় নেয়ার আহবান জানিয়েছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এই যুগে এ ধরণের ঘটনা দু:খ্যজনক বলেও মন্তব্য করেছেন রঘুবীর দাস।

এর আগে ২০০৯ সালের ১৮ অক্টোবর ঝাড়খন্ডের দেওঘর জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পাথরঘাটিয়ায় ‘ডাইনি’ সন্দেহে পাঁচজন নারীর ওপর নির্যাতন চালায় গ্রামবাসী। গ্রামবাসী তাদের বিবস্ত্র করে শত শত লোকের সামনে হাঁটতে বাধ্য করে। এ সময় তাদের পেটানো হয়। শুধু তাই নয়, ওই পাঁচজন নারীকে মানুষের মল খেতে বাধ্য করে গ্রামবাসী।

স্থানীয় পুলিশ বলেছে, নির্যাতিত ওই নারীরা মুসলিম বিধবা। স্থানীয় পুরোহিতেরা এসব নারীকে ‘ডাইনি’ বলে ঘোষণা দেয়ার পরপরই তাদের ওপর এই অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। যখন নারীদের বিবস্ত্র করে পেটানো হচ্ছিল, তখন কেউ তাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি বলে জানান, পুলিশের কর্মকর্তা মুরারি লাল মিনা।

আসামের শনিতপুর জেলার একটি আদিবাসী বসতিতে অসুখ ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় পূর্ণি ওরাং নামে ৬৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধার বিরুদ্ধে ডাকিনীবিদ্যা চর্চার অভিযোগ তোলেন গ্রামবাসী। পরে তাকে নগ্ন এবং শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়। চলতি বছরের ২২ জুলাইয়ের ওই ঘটনায় পুলিশ ১৬ জনকে গ্রেফতারও করে।

আসামের পুলিশ জানিয়েছে, গত ছয় বছরে ডাকিনীবিদ্যা চর্চার অভিযোগ তুলে শিরচ্ছেদ, জীবন্ত পুড়িয়ে অথবা ছুরিকাঘাত করে এখানকার অন্তত ৯০ জনকে হত্যা করা হয়েছে। এদের বেশির ভাগই নারী।
গত বছরের অক্টোবরে আসামে ভারতীয় ক্রীড়াবিদ দেবযানী বোড়াকেও ডাইনি আখ্যায়িত করে বেদম মারধর করা হয়।

এসব হত্যা বন্ধে ২০০১ সালে ওই রাজ্যে জাদুবিদ্যা চর্চার বিরুদ্ধে আইন পাস হয়েছিল। তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, লোকজনের মধ্যে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা না হলে শুধু আইন করে সমস্যার সমাধান হবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব হামলার পেছনে কুসংস্কার ও অন্ধ-বিশ্বাস কাজ করে। তবে কখনো কখনো সম্পত্তির জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ডাকিনীবিদ্যা চর্চার অভিযোগ এনে বিধবাদের হত্যা করার মতো ঘটনাও ঘটে।

ঝাড়খণ্ড রাজ্যের একজন পার্লামেন্ট সদস্য অভিযোগ করেছেন, এমনকি অনেক শিক্ষিত তরুণও এ ধরণের ঘটনায় অংশ নিতে উন্মত্ত জনতার সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। অনেকে অবশ্য বলছেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পারিবারিক কোনও ঝামেলা থেকে এক পক্ষকে ‘ডাইনি’ আখ্যা দিয়ে সুবিধা নেয়ার একটা প্রবণতা থাকে।

এদিকে ২০০৯ সালে জাতিসংঘের এক রিপোর্টে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলা হয়েছে, ‘কালো জাদুকর’ সন্দেহে নারী ও শিশুদের হত্যা করার প্রবণতা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানবাধিকার গ্রুপ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নারীদের এ ধরনের অমানবিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে।

সারা বিশ্ব যখন মানবাধিকার বিশেষ করে নারী অধিকার রক্ষায় সোচ্চার তখন ভারতের মতো উদার গণতান্ত্রিক দেশে এভাবে অসহায় নারীদের ওপর চালানো বর্বরতা রোধে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার তড়িৎ পদক্ষেপ নিবে সেটাই কামনা সবার।

এআর, কেবি