সফল ব্যবসায়ী থেকে ফাঁসির মঞ্চে মীর কাসেম আলী। অসংখ্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের জন্মদাতা এবং একজন সফল সংগঠকের জীবনের সমাপ্তি ঘটলো মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০ টা ৩০ মিনিটে ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে।
এদিকে, মীর কাসেম আলীর জীবনী ঘেঁটে জানা যায়, তার জন্ম ১৯৫২ সালে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চালা গ্রামে। তার বাবা তৈয়ব আলী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে চাকরি করতেন। ৪ ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। মীর কাসেমকে এলাকার মানুষ মিন্টু নামেই চেনে। বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন চট্টগ্রামে। ভর্তি হন চট্টগ্রাম কলেজে।
১৯৭০ সালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের ছাত্র থাকাকালে সংযুক্ত হন স্বাধীনতাপূর্ব বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে। ১৯৭১ সালে ছাত্রসংঘের চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি হন তিনি।
তার পরিবারের দেয়া তথ্য মতে, স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় মীর কাসেম আলী চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে আসেন রাজধানী ঢাকায়। জানা যায়, স্বাধীনতার পর ব্যক্তিগত কাজ এবং পড়ালেখার কাজে চলে যান লন্ডনে।
এরপর দীর্ঘসময় থাকেন সৌদি আরবে। সেসময় তিনি যুক্ত হন মুসলিম বিশ্বের আলোচিত দাতব্য প্রতিষ্ঠান রাবেতা আলমে ইসলামীর সাথে। সৌদিতে থাকাকালীন সেখানকার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে তার সুসম্পর্ক হয়।
১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। তিনি হন শিবিরের প্রথম কেন্দ্রীয় সভাপতি। সংগঠন থেকে বিদায় নেয়ার পরে মীর কাসেম আলী ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার কারণে ১৯৮০ সালে তিনি রাবেতা আল ইসলামীর এ দেশীয় পরিচালক হন।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সহায়তায় আস্তে আস্তে গড়ে তোলেন ইসলামী ব্যাংক, ইবনে সিনা ট্রাস্ট ও ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসসহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান।ব্যাংক, চিকিৎসাসেবা, পরিবহণ, টেলিযোগাযোগ, গণমাধ্যম ও শিক্ষা সব খাতেই সাফল্যে পাল্টে যায় মীর কাসেম আলীর জীবনের গতি।
মীর কাসেম আলী মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রাবেতা আল ইসলামীর বাংলাদেশ পরিচালক, ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ভাইস চেয়ারম্যান ও পরিচালক, ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ইবনে সিনা ট্রাস্ট (প্রশাসন) ও ইবনে সিনা ফার্মাসিউটিক্যালসের বোর্ড অব ডিরেক্টরের সদস্যও ছিলেন তিনি।
এই ট্রাস্টের আটটি হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক ও ইমেজিং সেন্টার, একটি মেডিক্যাল কলেজ, একটি নার্সিং কলেজ ও একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি, ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, ইসলামী ব্যাংক স্কুল ও কলেজ এবং দিগন্ত পেপার মিলের উদ্যোক্তা ছিলেন কাসেম আলী।
তিনি ফুয়াদ আল খতিব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রাস্ট (এআইটি) ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান। দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন মীর কাসেম আলী। এর অধীনে রয়েছে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকা আর দিগন্ত টেলিভিশন।
এ ছাড়া মীর কাসেম আলীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কেয়ারী’। তিনি কেয়ারী হাউজিং ও ইডেন শিপিং লাইনসের চেয়ারম্যান ছিলেন। নামের আগে ‘কেয়ারী’ রয়েছে এ রকম ১০টি কোম্পানির পরিচালক ছিলেন মীর কাসেম আলী। এগুলো হলো- কেয়ারী লিমিটেড, কেয়ারী পোলট্রি হ্যাচারি অ্যান্ড প্রসেস, কেয়ারী স্প্রিং, কেয়ারী শান, কেয়ারী ট্যুরস অ্যান্ড সার্ভিসেস, কেয়ারী তাজ, কেয়ারী কালার সেন্টার, কেয়ারী ঝর্ণা, কেয়ারী রিয়েল এস্টেট ও কেয়ারী টেলিকম লিমিটেড।
কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনে যাওয়ার জন্য বিলাসবহুল পাঁচটি প্রমোদতরি কেয়ারী ক্রুইজ, কেয়ারী ডাইন, কেয়ারী সিন্দবাদ, কেয়ারী কর্ণফুলী ও কেয়ারী তরঙ্গেরও উদ্যোক্তা তিনি।
এ ছাড়া কেয়ারী গ্রুপের সহস্রাধিক অ্যাপার্টমেন্ট ও বিপণি বিতান রয়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে।
প্রশঙ্গত, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ১৭ জুন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন বিকেলেই মতিঝিলে দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
২০১৩ সালের ১৬ মে মীর কাসেম আলীন বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগ আদালতে দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। ২৬ মে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-১। এরপর মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়। ৫ সেপ্টেম্বর মীর কাসেম আলীকে ১৪টি ঘটনায় অভিযুক্ত করে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল।
বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০১৪ সালের ০২ নভেম্বর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-২ মীর কাসম আলীকে মৃত্যুদণ্ড দেন। রাষ্ট্রপক্ষের আনা ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধা জসিম ও জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে হত্যার দায়ে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।
২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড থেকে বেকসুর খালাস চেয়ে আপিল করেন মীর কাসেম আলীর আইনজীবীরা। আপিলে তার খালাসের পক্ষে ১৮১টি যুক্তি তুলে ধরা হয়। ১৭ ফেব্রুয়ারি তার পক্ষে প্রাথমিক যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন আইনজীবীরা।
গত ৯, ১০, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি মীর কাসেমের আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গত ৮ মার্চ মুক্তিযোদ্ধা জসিমসহ ৬ জনকে হত্যার দায়ে তার ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখে রায় দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
মীর কাসেমের ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখে ২৪৪ পৃষ্ঠার আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় গত ৬ জুন প্রকাশ করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। গত ১৯ জুন ফাঁসির দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে রিভিউ আবেদন দাখিল করেন মীর কাসেম আলী। মোট ৮৬ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে ১৪টি যুক্তি দেখিয়ে ফাঁসির দণ্ড থেকে খালাস চাওয়া হয়।
গত ২৮ আগস্ট মীর কাসেমের রিভিউ আবেদনের শুনানি শেষ হয়। মীর কাসেমের পক্ষে রিভিউ শুনানিতে অংশ নেন তার প্রধান আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন।
৩০ আগস্ট সকালে জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলীর রিভিউ আবেদন খারিজ করে দিয়ে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। এরপর থাকে শুধু রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার সুযোগ।
মীর কাসেম আলী ২ সেপ্টেম্বর কারা-কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দেন তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন না। প্রাণভিক্ষার বিষয়টি ফয়সালা হয়ে গেলে ফাঁসি কার্য্করের উদ্যোগ নেয় কারা কর্তৃপক্ষ।
সে মোতাবেক মীর কাসেমের সঙ্গে শনিবার বিকেলে পরিবারের সদস্যদের শেষ সাক্ষাতের সুযোগ দেয়া হয়।
অবশেষে সরকারের নির্বাহী আদেশে ৩ সেপ্টেম্বর রাত ১০ টা ৩০ মিনিটে মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। অবশেষে মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে জামায়াতের ক্ষমতাধর ৫ নেতার জীবনের ইতি ঘটলো।
এসএম





