অভাবী মানুষের ঘরেও আজ ঈদের আনন্দ উপচে পড়ার মতো। অথচ ভিন্ন কষ্টের রঙে নিজেদের অনাগত, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ রাজধানীর আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসে।
সোমবার ঈদুল আযহার দিনে আগারগাঁওয়ের প্রবীণ নিবাসে এ কষ্টের কথা জানান প্রবীণরা।সকালে প্রবীণ নিবাসের নিচে একটা গরু জবাই হয়েছে। তা দেখেও বোঝার উপায় নেই এখানে ঈদের কোনো আনন্দ আছে।
প্রবীণরা জানান, প্রায় সবারই আত্মীয়-স্বজন ও সন্তান থাকলেও তারা আজ একা। ঈদের দিন সকাল থেকে ফোনে অনেকে খোঁজ নিলেও দুপুর পর্যন্ত কেউ তাদের দেখতে আসেনি।
পয়ষষ্ট্রি বছরের কুষ্টিয়ার নিবাসী একজন নারীর সংসারে কেউ নেই। তার কষ্ট যেনো আরও ভিন্ন। কষ্টের সব কথা বললেও নিজের নাম-পরিচয় বলতে চান না। বেশ আধুনিক হলেও ছবি তুলতে আপত্তি রয়েছে তার। সমাজের এক কোনো নিজেকে গুছিয়ে রাখতে চান আপন মহিমায়।
ছাপান্ন বছর বয়সী মিরা চৌধুরীর ছবি তুলতে কোনো আপত্তি নেই। তবে অসুস্থতার জন্য সব কথা বলতে পারছেন না। কয়েকদিন আগে প্রবীণ নিবাসের সিঁড়িতে পড়ে পা ভেঙেছে তার।
প্রবীণ না হয়েও মিরা চৌধুরী প্রবীণ নিবাসে এসেছেন বাধ্য হয়ে। স্বামী জোসেফ চৌধুরী ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশনে (আইএলও) চাকরি করতেন। মারা গেছেন অসময়ে। তারপর থেকে একা। একমাত্র ছেলে অপূর্ব হাসান চৌধুরী স্কালারশিপে লেখাপড়ার জন্য সুদূর আমেরিকায় রয়েছেন। তাই ঈদের দিন একাই কাটছে তার।
মিরা চৌধুরী আরও জানান, ঢাকায় আত্মীয়-স্বজনরা থাকেন। কলকাতার জাকারিয়া স্ট্রিটে আত্মীয়-স্বজন রয়েছেন। দার্জিলিংয়ে জন্মের পর ঢাকার টিকাটুলি কামরুন্নেছা স্কুলে ভর্তি। ইডেনে ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর অর্থনীতিতে অনার্স-মাস্টার্স করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর খুলনায় একটি গার্লস কলেজে শিক্ষকতা করেন চার বছর। স্বামীর কথায় চাকরি ছেড়ে ঢাকায় আসেন। আইএলওতে চাকরিজীবী স্বামীর মৃত্যু হলে সন্তান নিয়ে একা। তারপর একমাত্র ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজীতে অনার্স শেষ করে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশুনার জন্য আমেরিকায় চলে যায়।
প্রবীণ নিবাসে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সাদা কালো একটি ছবি রেখেছেন। স্বামীর ছবিও রয়েছে। খুব ছোটবেলার যৌথ ছবি আটকানো রয়েছে ছেলের। এগুলো দেখে পুরনো স্মৃতি মনে করেন। বিশেষ দিনগুলোতে স্বামী-সন্তানের সঙ্গে কাটানোর স্মৃতি মনে পড়ে তার। স্বপ্ন দেখেন ছেলে আমেরিকা থেকে ফিরে এলে যেখানেই হোক একসঙ্গে থাকা হবে তার।
দুপুরে মিরা চৌধুরীর রুমে সাথী নামের একজন পরিচারিকা দু’বেলার খাবার এক সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। দুপুরে এক সঙ্গে দু’বেলার খাবার দেওয়ায় মন খারাপ। ঠান্ডা খবার খেতে অসুবিধা না হলেও রাতে আর কেউ থাকবে না তার পাশে। এ কষ্ট যেনো আরও বেশি। তাই মন খারাপ করে সাথীর সঙ্গে অভিমান করে বেশি কথাই বলতে চাইছেন না মিরা চৌধুরী।
হাইড্রো ইলেট্রিক থার্মাল পাওয়া নিয়ে পড়াশোনা করা প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন লিবিয়ায় চাকরি করতেন। ১০ বছর পরে দেশে ফিরে আসেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কনসালটেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর একা। চার মেয়েরই বিয়ে হয়েছে। তিন মেয়ে মগবাজারে থাকেন। মিরপুরে নিজের বাড়িতে একা থাকেন না। মেয়েদের সংসারে অশান্তির কারণ না হওয়ার জন্যই ৬৫ বছর বয়সী এ ব্যক্তি থাকেন প্রবীণ নিবাসে।
কুষ্টিয়ার চিরকুমারী জানান, প্রবীণ নিবাসের বয়সও কম হয়নি। ১৯৬০ সালে এ প্রবীণ নিবাস প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠাকাল অর্ধশতকের বেশি হলেও তেমন কিছুই উন্নয়ন হয়নি। একজন প্রবীণ মানুষের পুরো ভার বহন করার সামর্থ্যও তৈরি হয়নি এ প্রতিষ্ঠানের।
প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন জানান, রুম ভাড়া দেই তিন হাজার, দুই হাজার টাকা খাবার বিল। অন্যান খরচ আরও দুই হাজার টাকা। আমার চেয়েও অনেক বেশি কষ্ট নিয়ে এখানে আছেন আরও প্রায় ৪০ জন নারী-পুরুষ। সবার কষ্টই একাকিত্ব।
কেএ





