আগামী সপ্তাহে বহুল আলোচিত প্রবাসী কল্যাণ সচিব ড.খোন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে রাজউকের প্লট জালিয়াতির ঘটনায় ৩ মামলার চার্জশিট দুদকের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দিচ্ছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি সম্পন্ন করেছেন উপ পরিচালক যতন কুমার রায়।
জানা যায়, সরকারের দুর্নীতিবাজ এ আমলা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক বিশেষ টিশের অনুসন্ধান এবং তদন্তে কয়েক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ড. শওকতে বিরুদ্ধে প্রায় ৮০০ কোটি টাকা লন্ডন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে।
সচিব শওকত হোসেন গণপূর্ত সচিবের দায়িত্বে থাকাকালে মিথ্যা তথ্য দিয়ে নানা কৌশলে নিজে, স্ত্রী ও তার মায়ের নামে রাজউকের ৩টি প্লট বরাদ্দ নেয়ার পর আবার ওই ৩ প্লটের আকার বৃদ্ধি করেন।
ওই জালিয়াতির অভিযোগে গত ২২ এপ্রিল শুধুমাত্র সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেনের বিরুদ্ধে মতিঝিল থানায় ১৯৪৭ সালের প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা ৩টি ( মামলা নং- ৮, ৯, ১০) করে দুদক।
৮ নম্বর মামলার এজাহারে বলা হয়, রাজউকের উত্তরা আবাসিক প্রকল্পের ১৪ নম্বর সেক্টরে ড. খোন্দকার শওকত হোসেনের মা জাকিয়া আমজাদ প্রথমে এক ব্যক্তির লিজপ্রাপ্ত ৩ কাঠার প্লট ক্রয় করেন। পরে ওই প্লট বিমান উড্ডয়ন জোনের অন্তর্ভুক্ত উল্লেখ করে অন্যত্র ৫ কাঠার প্লট বরাদ্দের জন্য জাকিয়া আমজাদ রাজউকে আবেদন করেন। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে সচিব শওকত হোসেনের মাকে ১৩ নম্বর সেক্টরে ৫ কাঠার একটি প্লট দেয়া হয়।
৯ নম্বর মামলার এজাহারে বলা হয়, সচিব ড. খোন্দকার শওকত হোসেন ২০০১ সালে সম্প্রসারিত উত্তরা প্রকল্পে নিজের নামে ৩ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেন। পরে ওই ৩ কাঠার প্লটকে ৫ কাঠায় রূপান্তর করেন। তিনি আবার ওই প্লটের ২ কাঠা জমি বিক্রি করে দেন। কিন্তু ওই প্লটটি ডেভেলপমেন্টের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে ৫ কাঠার আমমোক্তারনামা দেন।
১০ নম্বর মামলার এজাহারে বলা হয়, পূর্বাচল প্রকল্পে ২০০৪ সালে সচিব শওকত হোসেনের স্ত্রী ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ আয়েশা খানমের নামে সাড়ে ৭ কাঠার প্লট বরাদ্দ নেন। পরে ওই প্লটটি প্রথমে ১০ কাঠা এবং পরে আবার সাড়ে ১২ কাঠায় উন্নীত করেন।
অথচ রাজউকের বিধি অনুযায়ী, প্লট পরিবর্তন করে ওপরের স্তরে বরাদ্দ করার এবং প্লটের আয়তন বাড়ানোর কোনো নিয়ম নেই।
জানা যায়, দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিচালক যতন কুমার রায় আসামি সচিব শওকত হোসেনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত ২০ মে তলব করলে তিনি দুদকে না এসে সরাসরি হাইকোর্টে ছুটে যান। গত ১০ জুন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ ভয়ঙ্কর এ জালিয়াত সরকারী আমলা শওকত হোসেনের জামিনের আবেদন শুনানি গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
আর এ ৩ মামরার তদন্তকালে যতন কুমার রায়, আসামি সচিব শওকতের জালিয়াতির ঘটনায় রাজউক সাবেক ও বর্তমান চেয়ারম্যান,বোর্ড সদস্যসহ প্রায় ২০ জন কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন।
এরমধ্যে প্রকৌশলী মো. নূরুল হুদা, বোর্ড সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম সিকদার (অর্থ), আখতার হোসেন ( এস্টেট), এম. মাহবুবুল আলম (উন্নয়ন), সদস্য নাজমুল হাই ( প্রশাসন ও ভূমি), শেখ আব্দুল মান্নান (পরিকল্পনা), সাবেক চেয়ারম্যান শহীদ আলম, সাবেক চেয়ারম্যান মো. আজিজুল হক, সাবেক সদস্য একেএম হারুন, নাসির উদ্দিন, রিয়াজুল করিম, সাবেক সচিব আতাউল হক মোল্লা, সাবেক পরিচালক (এস্টেট) মো. শামছুল আলম, রেজাউল করিম তালুকদার,বর্তমান রাজউকের তত্ত্বাবধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন এবং সহকারি হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা দেবাশীষ দে, রাজউক বোর্ড সদস্য (পরিকল্পনা) শেখ আবদুল মান্নান, পরিচালক (এস্টেট) মোহাম্মদ মুসা।
এদিকে সচিব খোন্দকার শওকত হোসেন ও তার স্বজনদের বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নেমেছে দুদকের সিনিয়র উপপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী।
তিনি গত ২৫ মে দুদকের এ অনুসন্ধানী কার্যক্রমকে সহায়তার জন্য সরকারী একাধিক মন্ত্রণালয়, রাজউক, বিভিন্ন সাব রেজিষ্ট্রি অফিস, বিভিন্ন ব্যাংক, এসিল্যান্ডের অফিস এবং বিআরটিএ (গাড়ির তথ্য ) সহ বিভিন্ন দফতরে চিঠি পাঠিয়ে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, সচিব ড. শওকত হোসেন রাজধানী ঢাকাসহ দেশে বিদেশে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ রয়েছে। তার নিজ নামে প্লট-ফ্লাট, বাড়ি-গাড়ি, জমিা, ব্যাংক ব্যালেন্স ছাড়াও স্ত্রী, শ্যালক ও ভাইদের নামে ৩০টি ট্রাক, শেয়ার ক্রয়সহ নানাভাবে সম্পদ রয়েছে।
ড. শওকতের গুলশান ১২ নম্বর রোডের ২২০ নম্বর ৩ কোটি টাকার একটি বিলাসবহুল ফ্লাট রয়েছে। সাভারের আশুলিয়ায় ৭৫ কোটি টাকা মূল্যের ১২০ বিঘা জমি, গাজীপুরের ভালুকায় ১৬ কোটি টাকা মুল্যের ৪০ বিঘা জমি, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে ৩৬ কোটি টাকা মূল্যের ১৫ বিঘা জমি রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন ব্যাংকে তার এফডিআর রয়েছে ৪০০ কোটি টাকার।
তার স্ত্রী ড. আয়েশা খানমের উত্তরা ৬ নম্বর সেক্টরে ৬ কাঠা জমিতে ৫ তলা ভবন এবং ৩০টি ট্রাক রয়েছে। তার স্ত্রী ও শ্যালকের ৩০০ কোটি টাকার শেয়ার। শওকতের ভাইয়ের মোহাম্মদপুরে ৭ বিঘা এবং চট্টগ্রামের কক্সবাজারে ৩ বিঘা জমি রয়েছে।
ঢাকা, একে, ১৫ আগস্ট, টাইমনিউজবিডি.কম, এআর





