রাজধানীতে সম্প্রতি দুর্ধর্ষ ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলছে। প্রকাশ্যে দুর্বৃত্তরা গুলি করে, হাত বোমা ফাটিয়ে ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকা। তবে আরও বড় আশঙ্কার কথা হলো ছিনতাইকারীরা নির্বিচারে গুলিচালিয়ে ও বোমা নিক্ষেপ করে ছিনতাই করছেন। এতে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটলেও ছিনতাইকারীরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে নিরাপদ স্থানে গা ঢাকা দিচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে, এসব ঘটনা রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোড়ালো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।ফলে ত্রাসের নগরীতে পরিণত হয়েছে রাজধানী শহর ঢাকা। আর এ অবস্থায় আতঙ্কে আছে নগরবাসী।

খুনের মতো স্পর্শকাতর ঘটনার পর সাময়িক দৌড়ঝাপ শুরু হলেও অধিকাংশ ঘটনায় ছিনতাইকারীকে গ্রেফতার ও ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে ব্যর্থ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।

ভুক্তভোগীরা বলছেন,র‌্যাব সদস্যদের খুবএকটা টহল দিতে দেখা যায় না। পুলিশও নিয়মিত টহল দিচ্ছে না। সর্বসাধারণে নিরাপত্তার স্বার্থে দায়িত্বরত গোয়েন্দা সদস্যদের ব্যর্থতার সুযোগে নিয়মিত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। রাজধানীর অলিগলিতে আগের মতো আর পুলিশি টহল দেখা যায় না। নেই তল্লাশি চৌকিও। বেশির ভাগ তল্লাশি চৌকিতে উল্টো সাধারণ মানুষই হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠছে।

তবে ভুক্তভোগীদের এসব অভিযোগ মানতে নারাজ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পুলিশ কর্মকর্তারাবলছেন,ছিনতাইকারীদের প্রতিরোধ করতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ঢাকা মহানগর পুলিশ(ডিএমপি)। থানা ও ফাঁড়ি পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সদস্যরাও বিভিন্ন ছিনতাই জোনে জোড়ালো নজরদারি রাখছেন। তবে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তারকৃত ছিনতাইকারীরা কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে এসেআবারো ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়ছে বলে এসব অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি রাজধানীতে বেশ কয়েকটি খুনের ঘটনায় এমনি সব তথ্য জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে,বিগত তিন মাসে শতাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোতেঅস্ত্রওবোমাব্যবহার করেছে ছিনতাইকারীরা। এসব ঘটনায় কয়েক কোটি টাকা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে সন্ত্রোসীরা। এমনকি গেল মাস থেকে ছিনতাইকারীরা গুলি চালিয়ে খুন করে অর্থসম্পদ লুণ্ঠন করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যাচ্ছেন। কয়েকটি ঘটনায় র‌্যাব সদস্যরা সফলতার পরিচয় দিলেওএসবঘটনায় পুলিশ লুণ্ঠিত হওয়া টাকা উদ্ধার করতে পারেনি। ধরতে পারেনি কোন ছিনতাইকারী। এমনকি ছিনতাই কাজে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্রও উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ সদস্যরা।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে,রাজধানীতে বেশ কয়েকটি ছিনতাইকারী গ্রুপ রয়েছে। মাঝে মধ্যেই এসব গ্রুপের সদস্যদেরকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে পাঠানো হয়। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও তারা ছিনতাই শুরু করে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ছিনতাইকারীরা সাধারণত এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় গিয়ে ছিনতাই করে। ছিনতাইয়ের পর নিজের এলাকায় চলে যায়। অনেক সময় বড় ধরণের ছিনতাই করে আত্মগোপনে চলে যায় ছিনতাইকারীরা। এ কারণে ছিনতাইকারীদের গ্রেপ্তারে কিছুটা সময় লাগে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (পূর্ব) জাহাঙ্গীর হোসেন মাতুব্বর বলেন,ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশ অধিক গোয়েন্দা নজরদারি করছে। বিভিন্ন এলাকার ছিনতাইকারী গ্রুপগুলোকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের ধরার জন্য গোয়েন্দারা মাঠে কাজ করছে।

তিনি দাবি করে বলেন,ছিনতাই ঠেকাতে সাধারণ মানুষদের মধ্যে সচেতনতা কম। বড় অঙ্কের টাকা বহন করার সময় পুলিশের সহযোগিতা নিতে বলা হলেও অনেকেই তা করছেন না। এ কারণে তাকে ছিনতাইকারীদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়,ছিনতাইকারীদের এখন প্রধান টার্গেট ব্যাংকের গ্রাহক, বিকাশ এজেন্ট এবং ছোট বড় লেনদেনকারী ব্যবসায়ীরা। ব্যাংকের গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা ছিনিয়ে নেয়ার আগে ছিনতাইকারীদের একাধিক সদস্য নির্দিষ্ট একটি ব্যাংককে টার্গেটকরে। কে বেশি পরিমাণ টাকা তুলছে তা জেনে কৌশলে সে বাইরের সহযোগীদের জানিয়ে দেয়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যাংকের অসৎ কর্মচারীরাও ছিনতাইকারীদের তথ্য সরবরাহ করে থাকে।

অপরদিকে বর্তমানে ছিনতাইকারীদের নতুন টার্গেটে পরিণত হয়েছে বিকাশ এজেন্টরা। বিকাশ এজেন্ট প্রতিনিধিরা দিনের অধিকাংশ সময় এলাকায় ঘুরে ঘরে টাকা সংগ্রহ করেন বলে ছিনতাইকারীরা সহজেই তাদের হাতের নাগালে পেয়ে যায়। পরে সুযোগ বুঝে অস্ত্র দেখিয়ে ও বোমা ফাটিয়ে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে যায়।

ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীতে বিগত তিন মাসে শতাধিক ছিনতাইচাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে ক্ষুদ্রাস্ত্র পিস্তল ও রিভলবার। কোনো কোনো ঘটনায় ব্যবহৃত হয়েছে একাধিক অস্ত্রও।

ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত অস্ত্র ও লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধারে ব্যর্থ প্রশাসন: গত ২০ আগস্ট সন্ধ্যায় রাজধানীর কোতয়ালি থানাধীন তাঁতীবাজারের ২৮ নম্বর খোরশেদ গোল্ড স্টোর নামে একটি দোকানে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে ১৫ লাখ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় ওই দোকানের মালিক হাজী খোরশেদ আলম ও এক পথচারী আহত হয়। এ ঘটনায় খোরশেদআলম বাদী একটি মামলাদায়ের করলেও ছিনতাইকৃত টাকা ও অপরাধীদের গ্রেফতার করতে পারেননি।

১৯ আগস্ট নিউ ইস্কাটন এলাকার দিলু রোডে প্রকাশ্যে আকিজ গ্রুপের একটি পরিবেশক প্রতিষ্ঠানের কয়েক কর্মকর্তাকে গুলি করে ও ককটেল ফাটিয়ে ৩১ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এসময় দুর্বৃত্তদের গুলি ও ছুরির আঘাতে ওই প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার হারুন অর রশিদসহ ৭ জন আহত হন। এ ঘটনার ১৫ দিন পর জড়িত সন্দেহে চারজনকে গ্রেফতার করা হলেও ছিনতাইকৃত টাকা ও ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

মগবাজারে গুলি করে ছিনতাইয়ের দু'দিন আগে মিরপুর থানার অদূরে এক জমি ব্যবসায়ীকে গুলি করে ৩০ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় সশস্ত্র ছিনতাইকারীরা। সে ঘটনায়ও ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার হয়নি।

গত ১৪ আগস্ট খিলগাঁওয়ের গোড়ান টেম্পো স্ট্যান্ডে আতিক হোসেন টুটুল নামে এক বিকাশকর্মীর কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।

গত ২০ জুলাই আদাবর থানার কয়েক শ’ গজ দূরে দুর্বৃত্তরা মঞ্জুরুল আলম নামে এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে আড়াই লাখ টাকা নিয়ে যায়। এসব ঘটনায় কেউ গ্রেফতার এমনকি লুণ্ঠিত অর্থও উদ্ধার হয়নি।

গত ২৪ জুন কল্যাণপুর বিআরটিসির ডিপোর কাছে একটি প্রাইভেটকার আটকে পাঁচজনকে গুলি করে ৩০ লাখ টাকা ছিনতাই করে দুর্বৃত্তরা। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই ঘটনার কোন ক্লু উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ।

গত ২৮ আগস্ট মগবাজারের সোনালীবাগে বাসায় ঢুকে নারীসহ তিনজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই হত্যাকাণ্ডে তিনজন গ্রেফতার হলেও অস্ত্র থেকে যায় সন্ত্রাসীদের হাতেই।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে খিলগাঁওয়ে মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীকে গুলিকরেসন্ত্রাসীরা। ওই ঘটনায় নিহত হয়েছেন ছেলে সায়মন। এর ২৪ ঘণ্টা পার না হতেই গত শুক্রবার দুপুরে বাড্ডায় বাসায় ঢুকে গৃহবধূর উপর গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা।

এসব ঘটনায় ঘুরেফিরে ক্ষুদ্র আগ্নেয়াস্ত্রের সেই একই ব্যবহার। তবে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধীদের আটক করার ক্ষেত্রে নির্লিপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ফলে অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রাজধানীজুড়ে।

মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বরত পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের পক্ষ থেকে এক সময় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবাসিক হল, বস্তি, আবাসিক হোটেল এবং সন্ত্রাসীদের সম্ভাব্য বিভিন্ন আস্তানায় বিশেষ অভিযান চালনো হতো। অস্ত্র উদ্ধারে চলত ঝটিকা অভিযানও। গত কয়েক বছরে রাজধানীতে সে ধরনের বিশেষ কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। ফলে অবৈধ অস্ত্র থেকেই যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের হাতে।

এ ব্যাপারে র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, অবৈধ অস্ত্র, বিস্ফোরক ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করা র‌্যাবের একটি মৌলিক দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে র‌্যাবের সাফল্যও রয়েছে।সম্প্রতি সংঘটিত অবৈধ অস্ত্র ব্যবহৃত কয়েকটি ঘটনা র‌্যাব গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযান বাড়ানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান টাইমনিউজবিডি’কে বলেন, সম্প্রতি পরপর কয়েকটি ছিনতাই ও খুনের ঘটনায় অনেকে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তবে অপরাধকর্ম বন্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে জোড়ালো অভিযান চালানো হচ্ছে। অপরাধীদের ধরতে পুলিশের বিশেষ টিম কাজ করছে। খুব শিগগিরি এসব ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

ঢাকা,জেইউ, ৭ সেপ্টেম্বর,টাইমনিউজবিডি.কম, এআর