শীতকাল আমাদের দেশে পর্যটনের সবচেয়ে ভালো সময়। এ সময় আমাদের পর্যটন স্পটগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকে ভরপুর হয়ে পড়ে। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবে আমাদের সম্ভাবনাময় এই খাতটিকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না যথাযথভাবে।

'এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।' বাংলাদেশ পুরোটাকেই পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। কেননা, এই দেশের গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হেঁটে গেলেও যে প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করা যায়, তা অনেক দেশে বহু পথ মাড়িয়েও পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে একটি বদ্বীপের দেশ। এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিদেশি পর্যটকদের এতটাই মুগ্ধ করে যে, তারা অতীতে ইবনে বতুতার সময় অথবা তারও আগে থেকে এ দেশের গুণগান করে তাদের ভাষায় ইতিহাস রচনা করেছেন। সত্যিকার অর্থেই এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে আমরা গর্ববোধ করতে পারি। অথচ, এমন দেশের পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে আমাদের ব্যর্থতার শেষ নেই।

বিশ্বের এমন বহু দেশ রয়েছে যাদের জাতীয় আয়ের সিংহভাগ আসে পর্যটন থেকে। বহু দেশ তাদের দেশের দর্শনীয় স্থানসমূহের সদ্ব্যবহার করে পর্যটকদের কাছ থেকে আয় করছে কাড়ি কাড়ি টাকা। দেশের স্বার্থে কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে ঐসব দেশের মানুষ ও সরকার সম্মিলিতভাবে কাজ করে। পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে কোনো দেশ কিভাবে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয় মালদ্বীপ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পর্যটনশিল্পের আরেকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের এশিয়ারই দেশ সিঙ্গাপুর। আমরাও কী হতে পারি না এই দেশগুলোর মতো? কী কী সমস্যা রয়েছে আমাদের পর্যটনশিল্পের উন্নতির পথে, আর সম্ভাবনাসমূহ কী এবং এর সমাধানের পথই বা কী তা দেখা যাক এবার।

বাংলাদেশে পর্যটন খাতের সমস্যাসমূহ:

১.  বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। বেশিরভাগ পর্যটন স্পটেই পর্যাপ্ত ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সংকট রয়েছে। এ ছাড়া উন্নত যানবাহনের অভাব রয়েছে।

২. আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে পর্যটন স্পটগুলোতে থাকা-খাওয়ার অব্যবস্থাপনা, অনুন্নত হোটেল-মোটেল ও খাদ্য ব্যবস্থাপনা। এ ছাড়া বিদ্যুৎ, পানি ও পয়োনিষ্কাশনের অব্যবস্থাপনা তো রয়েছেই।

৩. আরেকটি সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তা ও প্রতারণা নিয়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা উদ্বিগ্ন থাকেন। বিভিন্ন পর্যটন স্পটে পর্যটকরা ছিনতাইসহ নানা রকমের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। বিশেষত নারী ও বিদেশি পর্যটকরা বেশি সমস্যায় পরেন। দিনের বেলায় ফেরিওয়ালাদের উৎপাত ছাড়াও পর্যটন স্পটে জিনিসপত্রের অগ্নিমূল্যের কারণে পর্যটকেরা অনুৎসাহিত হন।

৪.   অপরিচ্ছন্নতা ও নোংরা পরিবেশও পর্যটন স্পটগুলোর অন্যতম এক সমস্যা।

৫. এ ছাড়া পর্যটন শিল্পের প্রচারণা এবং প্রসারের জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগের অভাব রয়েছে।

৬. পর্যাপ্ত এবং দক্ষ গাইডের অভাবও রয়েছে পর্যটন স্পটগুলোতে। এতে করে বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকেরা ঝামেলায় পড়েন।

৭. পর্যাপ্ত নজরদারি এবং মনিটরিংয়ের অভাব রয়েছে। সরকারের পর্যাপ্ত মনোযোগের ঘাটতি রয়েছে এ খাতে। এটি বুঝা যায় পর্যটন স্পটগুলোতে বেড়াতে গেলে। সরকার যেন এ ব্যাপারে উদাস হয়ে বসে আছে।

৮. পর্যটন স্পটগুলোতে বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। নেই খেলাধূলা বা সময় কাটানোর মতো যথেষ্ট বিনোদন সরঞ্জামের ব্যবস্থা। পর্যটকদেরকে ধরে রাখার মতো বা আকৃষ্ট করার মতো পর্যাপ্ত ব্যব্স্থা নেই।

 

বাংলাদেশের পর্যটনের সম্ভাবনাসমূহ:

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে ভ্রমণকারীরা মুগ্ধ হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে এ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা অপরিসীম। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ পুরো দেশটিকেই পর্যটনকেন্দ্র বানিয়ে তোলা যায়। নতুন করে কৌশল ঠিক করে সম্ভাবনার সবটুকুকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পর্যটনে মডেল হতে পারে।

পর্যটন শিল্পের বিকাশের ওপর বাংলাদেশের অনেকখানি সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করছে। দেশে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে কর্মসংস্থান ঘটবে ও দারিদ্র্য বিমোচন সফল হবে। পর্যটন হলো একটি বহুমাত্রিক শ্রমঘন শিল্প। এ শিল্পের বহুমাত্রিকতার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের যে সম্ভাবনাময় পর্যটন খাত রয়েছে একে সুষ্ঠুভাবে বিকশিত করতে পারলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের অন্যতম পর্যটনবান্ধব

বাংলাদেশে পর্যটন খাত যে কতটা সম্ভাবনাময় তা বুঝা যাবে ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল এন্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (ডব্লিউটিটিসি)-এর প্রতিবেদন থেকে। ২০১৩ সালে তৈরি করা এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, বাংলাদেশে ২০১২ সালে পর্যটন খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন প্রায় ১২ লাখ ৮১ হাজার ৫০০ জন কর্মজীবি মানুষ; যা ওই বছরে দেশের মোট কর্মসংস্থানের এক দশমিক আট শতাংশ। আর প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মিলিয়ে পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন প্রায় ২৭ লাখ ১৪ হাজার ৫০০ জন; যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের তিন দশমিক সাত শতাংশ। ডব্লিউটিটিসি আরও জানিয়েছে, ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে পর্যটন খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবেন প্রায় ১৭ লাখ ৮৫ হাজার জন। আর প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ মিলে সর্বমোট ৩৮ লাখ ৯১ হাজার জন এই খাতের সঙ্গে যুক্ত হবেন; যা হবে দেশের মোট কর্মসংস্থানের চার দশমিক দুই শতাংশ। কর্মসংস্থানের এই হার প্রতি বছর দুই দশমিক নয় শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলেও জানিয়েছে আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটি।

আমাদের দেশের উন্নয়নে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত হতে পারে আশীর্বাদ। আমাদের মনে রাখা দরকার যে, পৃথিবীর বৃহত্তর প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার বাংলাদেশে অবস্থিত। তদুপরি রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন। মালদ্বীপের ন্যায় পর্যটন শিল্পের বিকাশ আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা পাল্টে দিতে পারে।

সুন্দরবন ও কক্সবাজার পর্যটন শিল্প বিকাশের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। অপার নৈসর্গিক সৌন্দর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনসমৃদ্ধ বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের প্রচুর পর্যটন আকর্ষণ রয়েছে। ফলে এখান থেকে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করতে পারে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো পর্যটন শিল্পের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে জায়গা করে নেয়াসহ ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে।

 

সমস্যা কাটিয়ে এসব সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য যা করা যেতে পারে:

১. বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যটন শিল্পের বিকাশে কাজ করতে পারে। পর্যটন খাতকে গুরুত্ব দেয়ার জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করা যেতে পারে।

২. পর্যটন স্পটগুলোতে যাতায়াতের জন্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা করতে হবে উন্নত। এজন্য সড়ক, নৌ, রেল ও আকাশপথে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। যানবাহন হতে হবে মানসম্পন্ন এবং যারা পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তাদেরকে সেবার মানসিকতা নিয়ে ব্যবসা করতে হবে।

২. বাংলাদেশের পর্যটন স্পটগুলোকে অবস্থান বা বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। এরপর একেকটি পর্যটন অঞ্চলের জন্যে একেক ধরনের ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে অঞ্চলভিত্তিতে প্রত্যেকটি বিভাগকে একেকটি পর্যটন ইউনিট করা যেতে পারে। এরপর প্রত্যেকটি বিভাগ অনুযায়ী আলাদাভাবে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে।

৩. প্রত্যেকটি পর্যটন স্পটে সরকারি ও বেসরকারি বা সরকারি-বেসরকারি যৌথ মালিকানায় প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে উন্নতমানের হোটেল-মোটেল ও রেঁস্তোরা। এসব হোটেল-রেঁস্তোরায় উন্নতমানের খাবারের পাশাপাশি অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা উন্নতমানের হতে হবে।

৪. পর্যটন স্পটগুলোতে থাকতে হবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা; যাতে চুরি-ছিনতাই বা যেকোন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা থেকে নিরাপদ থাকতে পারেন পর্যটকেরা। এজন্য আলাদাভাবে পর্যটন স্পটগুলোতে থানা বা পুলিশ ফাঁড়ি প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

৫. উন্নত চিকিৎসা সুবিধাও থাকতে হবে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে।

৬. এ ছাড়া প্রত্যেকটি পর্যটন স্পটে থাকতে হবে দক্ষ ও পেশাদারী গাইড।

৭. বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন দেশে এবং বিদেশে প্রচার-প্রচারণাও চালাতে পারে বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রসমূহ আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, প্রিন্ট মিডিয়া পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দেশি-বিদেশি ও ট্যুর অপারেটরদের সাথে সম্পর্ক জোরদার করে বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণ সমূহের দ্বার প্রতিনিয়ত উন্মোচন করার দিকটি ভাবতে হবে। এ ছাড়া বিদেশে যেসব দেশে বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেট অফিস রয়েছে সেখান থেকেও প্রচারণা চালাতে হবে।

৮. পর্যটন খাতে বিনিয়োগের জন্য বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে হবে। এজন্য সরকারিভাবে ব্যব্স্থা নিতে হবে। পর্যটন খাতকে লাভজনক করার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে করে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে সেখানে আকৃষ্ট করা যায়।

৯. দেশি এবং বিদেশি উভয় পর্যটককেই আকৃষ্ট করতে হবে ভ্রমণের ক্ষেত্রে। এতে করে অর্থ প্রবাহ হবে। এই অর্থ প্রবাহ সামগ্রিক অর্থনীতিকেই সচল করতে কাজে লাগবে। কেননা, পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত রয়েছে পরিবহন ব্যবসা, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যবসা এবং আরো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ব্যবসা।

১০. সরকারি অনুদান ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় সাধন করার পাশাপাশি উন্নত অবকাঠামো, সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীল অবস্থা দরকার পর্যটনের জন্য। পর্যটন শিল্পের উপাদান ও ক্ষেত্রগুলো দেশে ও বিদেশে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে পর্যটন শিল্পের অধিকতর বিকাশ ঘটানো সম্ভব।

পর্যটন শিল্পকে আরো আকর্ষণীয়, প্রাণবন্ত করে গড়ে তুলতে সরকারকে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে বেসরকারি বিনিয়োগকারী সংস্থার সাথে অংশীদারিত্বের সমঝোতা করে পর্যটনশিল্প গড়ে তুলতে হবে। পর্যটন কেন্দ্রগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে হবে। তাহলে আমরা যেমন আমাদের অর্থনীতিকে সচল রতে পারবো তেমনি আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকার তরুণ খুঁজে পাবে কর্মসংস্থান। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করে এ শিল্প বাংলাদেশের জন্য বয়ে আনবে কাড়ি কাড়ি বৈদেশিক মুদ্রা। পর্যটনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে আসা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং বেশি বেশি বিনিয়োগ করবেন। এ দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করতে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, গাইড লাইন ও তদারকি। অর্থনীতির চাকা বেগবান হলে নানাভাবে আয় বাড়বে মানুষের, ঘুচে যাবে দারিদ্র্যের অভিশাপ, খুলে যাবে ভাগ্যের অপার সম্ভাবনার দ্বার। গড়ে উঠবে সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ।

এমএ