প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন কারণে দেশে বহু মানুষ আত্মহত্যা করছেন। আত্মহত্যার ঘটনায় থানায় অপমৃত্যুর মামলা হওয়ায় এসব মামলা তদন্তে পুলিশের আগ্রহ সাধারণত কম থাকে। আলোচিত ঘটনা ছাড়া অনেক পরিবারও এসব ঘটনা নিয়ে সামনে এগোতে চায় না। ফলে অধিকাংশ আত্মহত্যার রহস্য অজানাই থেকে যায়।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) খন্দকার লাবণীর ঝুলন্ত লাশ বুধবার উদ্ধার করা হয়েছে তার গ্রামের বাড়ি থেকে। পরদিন সকালে মাগুরা পুলিশ লাইনস থেকে গুলীবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয় কনস্টেবল মাহমুদুল হাসানের। এডিসি লাবণী ও কনস্টেবল মাহমুদুল হাসানের মৃত্যু পৃথক ঘটনা হলেও দু’টি ঘটনাই রহস্যজনক বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলেছেন- দেশে আশঙ্কাজনকহারে বেড়েছে আত্মহত্যা। সমাজে অবমূল্যায়ন, ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়া, পারিবারিক কলহ চাকরি চলে যাওয়া, বেতন কমে যাওয়া, পরিবারের ভরণ পোষণের খরচ যোগাড় ও মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতায় হতাশা ও বিষন্নতার কারণে আত্মহত্যা বেড়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। সমাজ বিজ্ঞানীরা বলছেন, আত্মহত্যা ঠেকাতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের একসাথে কাজ করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সবার সম্মিলিত চেষ্টাতেই আত্মহত্যার মতো জটিল সিদ্ধান্ত থেকে বাঁচিয়ে তোলা যাবে যে কাউকে।
গত এক বছরে সারাদেশে ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ ভাগ বেশি। আবার এই সময়ে এ তালিকায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েরই ১০১ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। এসব আত্মহত্যার প্রধান কারণ পারিবারিক, সম্পর্কজনিত, আর্থিক, পড়াশুনা ও চাকরিজনিত। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আত্মহত্যার মত সিদ্ধান্ত নেয়া একধরনের মানসিক রোগ। আর সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সমাজ, পরিবার ও রাষ্ট্রের বড় দায়িত্ব রয়েছে এ প্রবণতা রোধে।
বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ইউনিটের কো লিডার সাফাক সাবা ওয়াহিদি তাদের পতিবেদনে বলেছেন, সুইসাইডের কারণ অনেক বের হয়েছে। যেমন, সম্পর্কের অবনতির কারণ, পারিবারিক কারণ, অর্থনৈতিক কারণ, শিক্ষায় ব্যর্থতা, মেন্টাল হেলথ ক্রাইসিস ও ড্রাগ অ্যাবিউজ, যা কিছুটা কম পেয়েছি। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যাকারী ১০১ জনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
যা মোট ঘটনার ৬১ দশমিক ৩৯ ভাগ আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২২ দশমিক ৭৭ ভাগ। বাকিদের মধ্যে মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ দশমিক ৮৮ ভাগ। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবার এরমধ্যে পুরুষ ৬৫ আর নারী ৩৬ জন। ফেসবুক লাইভে এসে চিত্রনায়ক রিয়াজের শ্বশুর ব্যবসায়ী মহসিন নিজ মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। তার প্রধান কারণ ছিলো একাকীত্ব। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, মোট আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে পারিবারিক এমন নানা কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটছে সবচেয়ে বেশি, যা মোট ঘটনার ৩৫ ভাগ। আর সম্পর্কজনিত কারণে আত্মহত্যার ঘটনা ২৪ ভাগ। দেখা গেছে, ২০ থেকে ৩৫ বছর বয়সী মানুষই বেশি আত্মহত্যা করছে যা মোট আত্মহত্যার ৪৯ ভাগ। সবচেয়ে কম আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে ৪৬ থেকে ৮৩ বছর বয়সীদের মধ্যে। আবার মোট আত্মহত্যাকারী এই সংখ্যার মধ্যে ৫৭ ভাগ নারী ও ৪৩ ভাগ পুরুষ।
২০২০ সালের ৮ মার্চ থেকে ২০২১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩টি জাতীয় পত্রিকা, ১৯টি স্থানীয় পত্রিকা, হাসপাতাল ও থানা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে আঁচল ফাউন্ডেশন এক প্রতিবেদনে জানায়, ওই প্রতিবেদন তৈরিতে ৩২২টি আত্মহত্যার ঘটনাকে বেছে নেওয়া হয়। আঁচল ফাউন্ডেশন দাবি করছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে আত্মহত্যা ৪৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০১৯ সালে সারা দেশে আত্মহত্যা করেছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ। এই এক বছরের ব্যবধানে আত্মহত্যার পরিমাণ বাড়াটা অশনিসংকেত।
ছদ্মনামে রাজধানীর একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে ইংরেজি সাহিত্যে শেষ করা এক শিক্ষার্থী দাবি করেন, নিজের পায়ে দাঁড়াতে গিয়ে নানা জটিলতায় মানসিক চাপে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ওই ছাত্রী বলেন, আমি প্রচ- হতাশায় চলে যাই। পড়াশোনা করলেও আশানুরূপ ফলাফল হয়নি। আমি বিসিএস প্রিলিতে বাদ পড়ি। সে সময় হতাশায় পড়ে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি যে সুইসাইড করবো। পরে আমার রুমমেট আমাকে সেভ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনে পড়া একও নানা জটিলতায় পড়ে বার বার ভেঙে পড়েন। তিনি জানান, ডিপ্রেশন এমন একটা পর্যায়ে চলে যায় যে মনে হয় সুইসাইডই হচ্ছে একমাত্র উপায়। এখন আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে আত্মহত্যা কোন সমাধান না। আঁচল ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষনে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
কয়েকটি ঘটনা: নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে অভাব-অনটনের তাড়নায় হেলাল উদ্দিন (৩৮) নামে এক কৃষক গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ৩০ জুন রাতে উপজেলার চরএলাহী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। হেলাল ওই এলাকার নতুন বাড়ির মৃত ফজল হকের ছেলে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. বাহার উদ্দিন বলেন, হেলাল প্রায় নিঃস্ব হয়ে গিয়েছিলেন। আগে তার গরু-মহিষ ছিল। কিন্তু নদী ভাঙনের কবলে পড়ে সব শেষ। নতুন বাড়ি করলেও সংসারে অভাব-অনটন লেগেই থাকতো। এদিকে অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা করেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) টেক্সটাইল বিভাগের শিক্ষার্থী অন্তু রায় (২০)।
গত ৪ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ইউনিয়নের নিজ বাড়ি থেকে তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। জানা গেছে, অন্তু খুবই মেধাবী ছাত্র ছিল। তবে তার পরিবারে আর্থিক অনটন ছিল। পাশাপাশি কুয়েটের ড. এম এ রশিদ হলেও তার অনেক টাকা বকেয়া হয়ে গিয়েছিল। কয়েকদিন আগে অন্তু তার পরিবারের কাছে টাকা চায়। এ সময় তার মা তাকে ৩ হাজার টাকা দিয়েছিল। এরপর সকালে তার বাবা দেবব্রত রায় ও তার মা মাঠে যায় কাজ করতে। অন্যদিকে চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণে পারিবারিক কলোহের জের ধরে ফজলু মিয়া (৬০) নামে এক বৃদ্ধ বিষপান করে আত্মহত্যা করেন।
গত ১৭ জুলাই সকাল ১১ টায় চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নেয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। পারিবারিক অশান্তি ও ধার দেনাসহ বিভিন্ন চিন্তায় হতাশাগ্রস্থ হয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে দাবি স্বজন ও এলাকাবাসীর। নিহত ফজলু মিয়া নারায়ণপুর পূর্ব বাজারে স্যানেটারি মালামালের ব্যবসা করতেন।
এছাড়া বগুড়ার শেরপুরে ‘ঋণের টাকা পরিশোধ করতে না পেরে’ গ্যাস ট্যাবলেট খেয়ে আব্দুল করিম নামের এক কৃষক ‘আত্মহত্যা’ করেন বলে জানিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। গত ৯ জুন সকালের দিকে বগুড়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তিনি উপজেলার বিশালপুর ইউনিয়নের সগুনিয়া গ্রামের জুরান আলীর ছেলে।
সব চেয়ে আলোচিত ছিল চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ফেসবুক লাইভে এসে চিত্রনায়ক রিয়াজের শ্বশুর ব্যবসায়ী আবু মহসিন খানের (৫৮) পিস্তল দিয়ে মাথায় গুলি চালিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা। এ ঘটনা তখন চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। ধানমন্ডি ৭ নম্বর রোডের ২৫ নম্বর বাড়ির একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন আবু মহসিন খান। রাত ৯টার দিকে নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন তিনি।





