চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে ১১.৪০ শতাংশ ।

বিগত ২০১৪ সালের প্রথম ১০ মাসে এই আয় যেখানে ছিল ৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৪,৭২০ কোটি টাকা, সেখানে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে এই আয়ের পরিমান দাঁড়ায় ৪.৮৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৮,৭২০ কোটি টাকা।

অর্থাৎ বিগত এক বছরে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার। প্রতি ডলারের বিপরীতে ৮০ টাকা করে হিসাব করে এই তথ্য বের করা হয়।

সম্প্রতি আমেরিকার কমার্স ডিপার্টমেন্টের (US commerce department) এর অধীন পোশাক খাতে নিয়োজিত টেক্সটাইল এন্ড অ্যাপারেলস (Office of Textiles and Apparels) অফিস থেকে প্রকাশিত এক জরিপ থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়।

তবে, এই রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে পোশাক খাত থেকে। আমেরিকার ওই জরিপে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির পরিমান বেড়েছে ১১.১৪ শতাংশ।

এই সময়ে বাংলাদেশ আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে আয় করেছে ৪.৬৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৭,২৮০ কোটি টাকা। বিগত ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এই আয় ছিল ৪.১৯ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৩৩,৫২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ বিগত ১ বছরে আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাত থেকে বাংলাদেশের আয় বেড়েছে প্রায় ৩,৭৬০ কোটি টাকার।

এখানে লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো আমেরিকায় মূলত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকেরই বাজার রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরে আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করে বাংলাদেশ মোট আয় করেছে ৩৮,৭২০ কোটি টাকা যার মধ্যে শুধুমাত্র পোশাক খাত থেকেই আয় হয়েছে ৩৭,২৮০ কোটি টাকা। বাকি সব পণ্য মিলে আয় হয়েছে মাত্র ১৪৪০ কোটি টাকা। শতকরা হিসাব করলে দেখা যাবে আমেরিকার বাজারে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ যে আয় করে তার ৯৬ ভাগই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে।

রপ্তানিকারকদের মতে, কোটা সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও আমেরিকার বাজারে পরিমান ও মূল্য উভয় দিক দিয়েই তৈরি পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে। আমেরিকার অর্থনীতির ইতিবাচক অগ্রগতির পরিপ্রেক্ষিতেই এমনটি সম্ভব হয়েছে বলে ধারণা তাদের।

বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশী পোশাক রপ্তানির বর্তমান চিত্র সন্তোষজনক হলেও এটা ধরে রাখা কঠিন।

তারা মনে করেন, এরই মধ্যে ভিয়েতনামের সাথে আমেরিকার ব্যবসাসংক্রান্ত টিপিপি (Trans Pacific Partnership) চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ায় দেশটি এই চুক্তির অধীন সুবিধাগুলো গ্রহণ করবে।

এখানে উল্লেখ্য, আমেরিকায় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থান রয়েছে। বাংলাদেশে ওপরে অবস্থান রয়েছে যথাক্রমে চীন এবং ভিয়েতনামের।

আমেরিকার কমার্স ডিপার্টমেন্টের জরিপ অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে আমেরিকার বাজারে ভিয়েতনামের তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৩.৮৬ শতাংশ। অর্থাৎ চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে আমেরিকার বাজারে ভিয়েতনামের তৈরি পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির হার ছিল বাংলাদেশের চেয়ে ২.৭২ শতাংশ বেশি।

জরিপে আরো বলা হয়, উল্লেখিত ১০ মাসে ভিয়েতনাম আমেরিকায় তৈরি পোশাক রপ্তানি করে আয় করেছে ৯.০৩ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৭২,২৪০ কোটি টাকা। বাংলাদেশের চেয়ে এই আয় ৩৪,৯৬০ কোটি টাকা বেশি অর্থাৎ এই খাতে ভিয়েতনামের আয় বাংলাদেশের আয়ের প্রায় দ্বিগুন।

ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, টিপিপি চুক্তি বাস্তবায়নের ফলে আমেরিকায় ভিয়েতনামের পোশাকের বাজার আরো সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে, ব্যবসাপটু চীন পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে এরই মধ্যে পোশাক খাতে ভিয়েতনামে ব্যাপক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে। যাতে ভিয়েতনামের গায়ে ভর করে আমেরিকার বাজারে চীন তার পোশাক খাতকে আরো বিস্তৃত করতে পারে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৭ মাসে আমেরিকায় চীনের পোশাক রপ্তানি ২.৩৭ শতাংশ বেড়েছে। ওই সময়ে চীন ২৬.২৩ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২০৯,৮৪০ কোটি টাকার তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে আমেরিকায়। বিগত ২০১৪ সালে যার পরিমান ছিল ২৫.৬২ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২০৪,৯৬০ কোটি টাকা।

ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এমনই পটভূমিতে বাংলাদেশের জন্য শঙ্কার বিষয় হলো-বিশ্বের বড় বড় অনেক পোশাক শিল্প মালিকদের নজর এখন ভিয়েতনামের দিকে। তারা তাদের জনশক্তি ও বিনিয়োগ বাংলাদেশের পরিবর্তে ভিয়েতনামের দিকে স্থানান্তর করতে পারে।

তবে, সাবধানে অগ্রসর হলে আমেরিকায় বাংলাদেশের পোশাকের বাজার সম্প্রসারণের চলমান গতি কিছুটা কমলেও বাজার হ্রাস পাবে না বলেই মনে করেন শীর্ষ ব্যবসায়ীরা।

ব্যবসায়ীরা অবশ্য এ বিষয়টি নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হতে নারাজ। কারণ বাংলাদেশের পোশাকের ব্যাপক বাজার সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও ব্রাজিলের মতো অনেক দেশেই।

সরকারের প্রতি ব্যবসায়ীদের অনুরোধ, সরকারকে এখনই কমনওয়েলথভূক্ত স্বাধীন দেশগুলোতে শুল্কমুক্ত পোশাকের বাজার সৃষ্টিতে উদ্যোগী হতে হবে। কমনওয়েলথভূক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোতে বর্তমান ৭৫ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ৬০০,০০০ কোটি টাকার বাজারের সুবিধা রয়েছে।

এদিকে, পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের আমেরিকার বাজারে পোশাক রপ্তানির বিষয়ে কমার্স ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে এই রপ্তানি বেড়েছে ৭.৫২ শতাংশ। এই সময়ে ভারত আমেরিকায় ৩.১৬ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৫,২৮০ কোটি টাকার তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। বিগত ২০১৪ সালে এর পরিমান ছিল ২.৯৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২৩,৫২০ কোটি টাকা।

অর্থাৎ আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক খাত থেকে চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের আয় প্রায় ১৩,৭৬০ কোটি টাকা বেশি ছিল। যে কোন মূল্যে ভারত এই খাতে বাংলাদেশকে টপকে উপরে উঠতে চায়। তাই এ বিষয়ে সতর্কতার সাথে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের অগ্রসর হওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

কেবি